‘নাচঘর’ ম্যাগাজিন ও বাংলায় বিশ্ব চলচ্চিত্র চর্চার আদিযুগ

উমাশশী থেকে বিবি ড্যানিয়েল, মেট্রো গোল্ড উইন পিকচার্স থেকে ম্যাডান কভার করত ‘নাচঘর’

কলকাতা। বিশ শতকের গোড়ার দিক। থিয়েটার ও অন্যান্য বিনোদনের পাশাপাশি সবে সবে নিজেকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে চলচ্চিত্র। মাধ্যম হিসেবে নতুন হলেও তার শৈল্পিক সম্ভাবনা, কারিগরি বুনন ও প্রযুক্তিগত অভিনবত্ব নিয়ে বাংলার বুধমণ্ডলীর আলাপ-আলোচনা-আগ্রহ তুঙ্গে। শিল্পী-সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত ‘ভারতবর্ষ’, ‘ভারতী’-র মতো পত্রিকাতেও বেরোতে শুরু করেছে নতুন এই মাধ্যমের সামাজিক ইতিহাস ও নান্দনিক/বাণিজ্যিক গুরুত্ব নিয়ে লেখাপত্র। এরই মধ্যে সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং নাট্যমোদী হেমেন্দ্রকুমার রায় ও প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মনে হল কেমন হয়, যদি চলচ্চিত্রের এই চর্চাকে বাংলা সাময়িক পত্রে আরও ভালোভাবে জায়গা করে দেওয়া যায়! 

কলকাতার ২২ নম্বর সুকিয়া স্স্ট্রিটের ‘ভারতী’-র অফিস তখন খ্যাত ছিল ‘মণিলালের আসর’ বলে; স্বর্ণকুমারী দেবী ভারতী’র সম্পাদনার ভার ত্যাগ করায় সেই ভার ন্যস্ত হয়েছে হেমেন্দ্রকুমারের বন্ধুপ্রতিম মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের উপর। সেই অফিসের কান্তিক প্রেস থেকেই মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘সবুজপত্র’-ও বেরোচ্ছে। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ২৬ বৈশাখ এই ঠিকানা থেকেই হেমেন্দ্রকুমার রায় ও প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর  সম্পাদনায় ‘নাচঘর’-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হল। প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় ঘোষণা ছিলঃ “নাচঘরে প্রধানত বাংলার রঙ্গমঞ্চ ও বায়োস্কোপ এবং বিভিন্ন আমোদ-প্রমোদ, নৃত্যগীত ও ললিত কলা বিষয়ক লেখা ও ছবি প্রকাশিত হইবে-ইহাতে কোন রূপ রাজনৈতিক আলোচনা থাকিবে না।”

বিশ শতকের প্রথম দশক থেকেই থিয়েটার, চিত্রশিল্প ও নৃত্যগীত নিয়ে বেশ কিছু বাংলা পত্র-পত্রিকা নিয়মিত  ছিল, কিন্তু সিনেমাকে (সমসময়ের পরিচিতিতে বায়স্কোপ) এতখানি গুরুত্ব দিয়ে এরকম সুচিন্তিত এবং বিষয় বৈচিত্র্যে নজরকাড়া পত্রিকা আর একটিও ছিল না। তাই অচিরেই ‘নাচঘর’ হয়ে উঠল এই সময়ের বাংলার চলচ্চিত্রমোদী পাঠক সমাজের কাছে একটি জনপ্রিয় নাম- সিনেমাকে ঘিরে নানা আশা-আকাঙ্ক্ষার মুদ্রণ-প্রতিফলন। বাংলা চলচ্চিত্র ও মুদ্রণ সংস্কৃতির সম্পর্কের নিরিখে ‘নাচঘর’ ঐতিহাসিক এক নির্মাণ। এবং একথা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, ‘নাচঘর’ সমসময়ের পাঠক, লেখক ও সম্পাদক সমাজের কাছে ফিল্ম পত্রিকার এক ধারণা এনে দিয়েছিল, যেই উত্তরাধিকার নিয়ে তিরিশের দশকে ‘দীপালী’ বা ‘চিত্রপঞ্জী’ বা ‘চিত্রলেখা’ চলচ্চিত্র পত্রিকা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বা আরও পরে ‘রূপমঞ্চ’, ‘প্রসাদ’, ‘উল্টোরথ’ ও অন্যান্যরা।  কিন্তু কেমন সেই ধারণা? আর কীভাবেই বা তা বিস্তৃত হয়েছিল নাচঘরের পরপর সংখ্যায়?
    
প্রথমত সমসাময়িক বাংলা নাটকের পত্রিকাগুলো যেভাবে থিয়েটার পাড়ার ‘ঘরের খবর’ দেওয়ার একটা ভঙ্গিমা নিয়ে এসেছিল, নাচঘরে তা বিস্তৃত হয়েছিল ‘সিনেমা পাড়া’র খবর দেওয়ায়। প্রায়ই প্রতিবেদনগুলো শুরু হত ‘আমরা খবর পেয়েছি’, ‘শোনা গিয়েছে’, ‘শুনছি নাকি’ এইভাবে। এই ভঙ্গিতে মনে হত যেন ঘরোয়াভাবে কেউ গল্প করছে এই পাশের পাড়ার কথা। আর চলচ্চিত্র মানে তো শুধু বড়ো পর্দায় বলা একটা গল্প মাত্র নয়, তার বাইরেও তাকে ঘিরে জনমানসে, জন সংস্কৃতিতে, গণমাধ্যমে আরও কত কিছু। এসব  নিয়েই তো সিনেম্যাটিক এক দুনিয়া, আর কত রকমেরই না কাণ্ড কারখানা! নাচঘরের পাতার পর পাতা জুড়ে এই জগতেরই বর্ণণা। ১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে খবর পাওয়া গেল, কলকাতার সিনেমা হলে (বিশেষত ম্যাডান কোম্পানির বায়স্কোপের) ব্যাপকভাবে টিকিট ব্ল্যাকের। নাচঘরে বিস্তৃত প্রতিবেদন বেরল তার, সঙ্গে থিয়েটার মালিকদের অনুরোধ তাঁরা যেন এর প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেন।

   

চলচ্চিত্র পত্রিকা ও গসিপ সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে আগ্রহীরা নাচঘরের সংখ্যাগুলো নেড়ে চেড়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন হেমেন্দ্র কুমার রায়, নলিনী মোহন রায় চৌধুরী ও অন্যান্যরা কীভাবে বাংলা ভাষায় ফিল্মি গসিপের একটা ছাঁচ নিয়ে আসছেন। ১৩৩২-এর ১১ অগ্রহায়ণ সংখ্যায় অভিনেতা রুডলফ ভ্যালেনটিনো সঙ্গে অভিনেত্রী ভিলমা বাঙ্কির ‘নৈকট্য’র সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদক প্রশ্ন ছুড়েছেন, ‘ইঙ্গিত কীসের?’ বা ১৯ চৈত্র, ১৩৩২-এ নাচঘরের ‘রঙ্গরেণু’  বিভাগ জানাচ্ছে, গাড়ি থেকে পড়ে অভিনেত্রী বিবি ড্যানিয়েলের আহত হওয়ার কথা। নাচঘরের পাতায় এভাবেই উমাশশী থেকে বিবি ড্যানিয়েল, মেট্রো গোল্ড উইন পিকচার্স থেকে ম্যাডান – অনানুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে সিনেমা পাড়ার ঘরের কথা। শুধু তারকা জীবনের খুঁটিনাটিই নয়, বিদেশের ছবির সমালোচনাও প্রকাশিত হত নাচঘরে।  

এই যে স্থানীয় বা দেশীয় চলচ্চিত্র বাইরেও সজাগ এক দৃষ্টি বহির্বিশ্বের প্রতি, এই উত্তরাধিকারই পরের দশকগুলোয় অন্য আঙ্গিকে পাওয়া যাবে বাংলায় চলচ্চিত্র নিয়ে চর্চায়। এই দৃষ্টি আবার কোনো কোনো সময় বিশেষ বিশেষ অবস্থানও নিয়ে আসছে- ছবি দেখার, ছবি নিয়ে কথা  বলবার। যদি খুব সংক্ষেপে নাচঘরের এই অবস্থানগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই, তার একটা প্রধান দিক বিদেশি বা বলা ভালো উত্তর আমেরিকান- সোভিয়েত-জার্মান চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মাপকাঠিতে স্বদেশি চলচ্চিত্রের স্বরূপ নির্ণয়। মনে রাখা দরকার এই সময় আমেরিকার স্টুডিওগুলো হলিউড নামক এক ছবির ধারণা ও বিশ্বব্যাপী তার এক বাজার তৈরি করছিল আর এইসব ছবির গড়ন ও গঠন নির্মাণ করেছিল ‘ক্লাসিকাল হলিউড সিনেমা’র আদলে ছবিতে গল্প বলার এক মডেল। উল্টোদিকে সোভিয়েত-জার্মান চলচ্চিত্রের আধুনিকতাবাদী আন্দোলন নিয়ে আসছিল হলিউডের এক বিকল্প চলচ্চিত্র বোধ। এই আপাত বিরোধী চলচ্চিত্র বোধ ও ব্যাকরণে জারণ-বিজারণ হচ্ছিল বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র চর্চার। সৌজন্যে ‘নাচঘর’।   

বিদেশি চলচ্চিত্রের পাঠের পাশাপাশি নাচঘর প্রথম বর্ষ থেকেই মনোযোগী ছিল বাংলার বা দেশীয় চলচ্চিত্রের উন্নতি সাধনে আর কিছু লেখালেখিতেও ছিল সংস্কার-‘সংশোধন’বাদী এক ঝোঁক। তার এক বিশেষ দিক হচ্ছে দেশীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় আর বিশেষ করে অভিনেত্রীদের নিয়ে আলোচনা। নাচঘরে প্রকাশিত “চাই রূপসী   অভিনেত্রী” বা “অভিনেত্রীর অঙ্গসৌষ্ঠব”-এর মতো প্রবন্ধ পড়লে বোঝা যায় কীভাবে এক ‘আদর্শ’ পুরুষ দর্শকের চোখ দিয়ে সিনেমা দেখার কথা বলা হচ্ছে আর মূলধারার লিঙ্গ রাজনীতির নিরিখে নির্মিত হচ্ছে অভিনেত্রীর ব্যক্তিত্ব। তবে এটাও বলার এই নাচঘরই আবার পরবর্তীকালে বাংলার চলচ্চিত্র অভিনেত্রীদের কাছে লেখা চাইছেন, প্রকাশ করছেন তাঁদের চোখ দিয়ে দেখা বাংলার চলচ্চিত্র জগতের বিবরণ। ১৯৩০-এর দশকে যখন ‘ভদ্রঘরের মহিলারা’ ‘দুষ্ট আবহাওয়া পূর্ণ’ চলচ্চিত্র জগতে যোগ দেবেন কিনা এই নিয়ে বাংলা সংবাদ পত্র-পত্রিকারা মুখর, জরুরি একটি লেখা প্রকাশ করে ‘নাচঘর’ – প্রতিভা ঘোষের “কেন প্রয়োজন”। প্রতিভা লেখেন, “বহুদিন সস্তা সম্ভ্রমের একটা মিথ্যে বেষ্টনী” দিয়ে নারী সমাজকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে, এবার সময় এই মিথ্যে বেষ্টনীই ছেড়ে বের হওয়ার। সমসময়ের প্রেক্ষিতে খুব খুব জরুরি উচ্চারণ!
   

এই ছোটো পরিসরে যে কথা আলোচনা করা গেল না তা হল, থিয়েটার পত্রিকা হিসেবেও বেশ সুনাম অর্জন করেছিল নাচঘর। আর থিয়েটার নিয়ে আলোচনা হোক বা সিনেমা, লিখন ও চিত্রণ-এর চিত্তাকর্ষক বিন্যাসের পরিচয় পাওয়া যায় নাচঘরের পাতায়। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বাংলা মুদ্রণ সংস্কৃতি কীভাবে এক অন্তরঙ্গ সংলাপে রত হয়েছিল চলচ্চিত্রের সঙ্গে, সেই ইতিহাসে আগ্রহী হলে নাচঘর এক উল্লেখযোগ্য সূচনা বিন্দু। বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নাচঘর, যার মনোযোগী পাঠ আমাদের মনে করাবে চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে মুদ্রণ সংস্কৃতির বিভিন্ন বৌদ্ধিক নির্মাণ। বাংলার গণমাধ্যমের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে এগুলো খুব জরুরি তো বটেই, বাংলার জনপরিসর আর আধুনিকতার আখ্যান বুঝতেও নাচঘরে প্রকাশিত নিবন্ধ, সম্পাদকীয় বা পিকচার প্লেটগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।     

 

তথ্যঋণঃ
নাচঘর 
বৈশাখী, দুষ্প্রাপ্য হেমেন্দ্রকুমার রায় সংখ্যা, ২০১৮-২০১৯ 

 

Developed by DXDasia