আমেরিকায় বাঙালি সংগীতশিল্পীদের হেনস্থার নির্লজ্জ চেহারা

মিলল একজোট হয়ে প্রতিবাদের সুফল

৫ জুলাই, বুধবার। সামাজিক মাধ্যমে একজোট হয়ে দিনভর প্রতিবাদে সোচ্চার হতে দেখা গেল বাংলার একের পর এক খ্যাতনামা সংগীতশিল্পীদের। প্রতিবাদ এই জন্যেই, যে প্রবাসে আমন্ত্রিত হয়ে অভ্যর্থনার বদলে চরম হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁদের। চূড়ান্ত অব্যবস্থার মধ্যে তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়েছে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মতো বিশ্ববন্দিত প্রবীণ সংগীত-ব্যক্তিত্বকেও। এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, প্রবাসে স্বজাতির কাছেই নিরাপদ নয় বাঙালি।

প্রতিবারের মতো এবারও আমেরিকার CAB (Cultural Association of Bengal) আয়োজিত বঙ্গ সম্মেলন, ৪৩তম নর্থ আমেরিকা বেঙ্গল কনফারেন্স (NABC)-এর আসরে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বাংলার বিশিষ্ট সংগীতশিল্পীরা। ৩০ জুন থেকে ২ জুলাই অবধি নিউ জার্সি-তে সেই অনুষ্ঠান চলার কথা ছিল। সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, জয়তী চক্রবর্তী সহ আরও অনেকে। কিন্তু, তাঁরা ভাবতেই পারেননি, অভ্যর্থনার বদলে তাঁদের প্রাপ্তি হবে দুর্ভোগ এবং দুর্ব্যবহার। এই ঘটনার পর, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর একটি মেইল, যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন কতটা খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। মেইলে তিনি লেখেন, ‘আমি অত্যন্ত অপমানিত বোধ করছি। যবে থেকে আমি আমেরিকায় পৌঁছেছি তবে থেকেই অত্যন্ত অসম্মানের মুখোমুখি হয়েছি। আমি জানি না ৭১ বছরে এসে কেন এই অনুষ্ঠানের জন্য রাজি হলাম। অভীক দাশগুপ্ত যিনি আমাকে এই অনুষ্ঠানে আনার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন, আমি এখানে আসার পর একবার দেখা করার প্রয়োজন বোধ করেননি। ভুলভাল সময়জ্ঞানের কথা  তো ছেড়েই দিলাম আমি ভাবিনি সেখানে আমাদের জন্য কোনও গাড়ির ব্যবস্থা থাকবে না, দুপুরের খাবার আসবে বিকেলে তাও আমরা বাইরে থেকে খাবার কেনার পর! হোটেলের ঘরে পর্যন্ত ঢুকতে পারিনি আমরা। বাইরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমি আমার প্রাপ্য পারিশ্রমিকও পাইনি।’

পাশাপাশি লাইভে এসে ক্ষোভ উগরে দেন সংগীতশিল্পী জয়তী চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘প্রথমে ২৯ জুন মিট অ্যান্ড গ্রিটে যাই। সেখানে ডিনার ছিল কিন্তু আমরা গিয়ে দেখলাম ডিনার শেষ। কিছু সহৃদয় ব্যক্তি আমাদের ডিনারের ব্যবস্থা করেন। শুক্রবার যে হল পাওয়ার কথা ছিল, সেই হল NABC পায়নি। আমরা সেটা অ্যাডজাস্ট করেছি। আমার, রাঘবদার, অনিন্দ্যদার দুটো অনুষ্ঠান ছিল। সেটা কমিয়ে একদিন করা হয়, তারপর জানা গেল তার সময়সীমাও কমাতে হবে। এরপর পেলাম অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার। কিছু মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছেন কিন্তু যাঁর আমন্ত্রণে এসেছিলাম তাঁর থেকে ভীষণ খারাপ ব্যবহার পেয়েছি। তিনি কোনও শিল্পীকে শিল্পী বলেই ভাবেন না। তিনি ভাবেন, আমরা NABC-তে আসার জন্য, টাকা পেয়ে ধন্য, স্টেজ পাওয়ার জন্য লালায়িত। বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। আমরাও মানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেল যখন আমরা স্টেজে উঠছি। একটা মিনিমাম সাউউন্ড চেকেরও টাইম দেওয়া হয়নি। বহু শিল্পী এনএবিসি শেষ হওয়ার পরেই পেমেন্ট পাননি। গুরুজি পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মতো মানুষও পেমেন্ট পাননি। এটা কী ধরনের ভদ্রতা, কোন ধরনের সভ্যতা? এনএবিসিকে এর জবাব দিতে হবে। পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, যাঁর দুটো অনুষ্ঠান করার কথা ছিল, তিনি একটাও অনুষ্ঠানের সুযোগ পাননি। হাতে চোট নিয়েও তিনি এসেছেন। তাঁকে ৩ ঘণ্টা লবিতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর তাঁকে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠান হবে না। কেউ একবারও তাঁর কাছে ক্ষমা চাননি! …আমি এই লাইভে জানিয়ে দিলাম, আমি NABC বয়কট করলাম। আমি আর কোনওদিন এই কনফারেন্সে আসব না।’ 

‘অবাঙালি’ শিল্পীরা আমায় বুঝিয়েছিলেন, রবীন্দ্রসংগীতের প্রকৃত মহিমা

তবে, এই ঘটনা না ঘটলে জনসাধারণ হয়তো কখনও জানতেই পারতো না, নর্থ আমেরিকা বেঙ্গল কনফারেন্সে শিল্পীদের এহেন অভিজ্ঞতা এই প্রথম নয়, বিগত বছরগুলোয় কমবেশি হেনস্থা, অব্যবস্থা মুখ বুজে মানিয়ে নিতে হতই। অতীতে যে যে সংগীতশিল্পীরা এই সম্মেলনে যুক্ত হয়ে বা যোগ দিতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। সংগীতশিল্পী সাহানা বাজপেয়ী তাঁর দেওয়ালে লেখেন, ‘অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে শিল্পীদের প্রতি অপরিসীম খারাপ ব্যবহার এই প্রথম হয়নি। আর তার জন্যে আমেরিকায়ও যেতে হবে না। নিজের দেশে, নিজের রাজ্যেই এই সমস্ত চূড়ান্ত অপমানজনক ঘটনা প্রায়শই ঘটে। …জাতি সাগরপারে গেলেও বদলায় না, এই সার বোঝা বুঝেছি। বরঞ্চ আরেকটু দুঃসাহসী হয়ে ওঠে – বিলেত/বিদেশ বলে কথা। যে সমস্ত শিল্পীকে চরম অপমানের মধ্যে দিয়ে যেতে হলো, সঙ্গে ন্যূনতম সহযোগিতা করা হলো না, খাবার দেওয়া হলো না যথাসময়ে, হোটেল থেকে নির্দিষ্ট দিনের আগেই বের করে দেওয়া হলো, প্রাপ্য সাম্মানিক থেকে বঞ্চিত করা হলো, অনুষ্ঠানের সময় কমিয়ে দেওয়া হলো, তাঁদের সহমর্মী হলাম। বিদেশ গিয়ে গান-বাজনা করা অনেকের কাছেই “স্বপ্নপূরণ”, তাই এই সমস্ত অঘটনের প্রতিবাদ করা থেকে অনেকেই বিরত থাকেন, এ-ও সকলের জানা। আর সেই কারণেই কিছু কিছু দুর্বিনীত আয়োজকদের সাহস বাড়তে থাকে। এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর সুযোগ যাতে না পায় লোকজন তার ব্যবস্থা করতে হবে – শিল্পীদের একজোট হতে হবে।’

সাহানা বাজপেয়ী ছাড়াও লোপামুদ্রা মিত্র, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, রূপসা দাশগুপ্ত, পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বরাও ঘটনার তীব্র নিন্দা করে তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। কমবেশি সকলেরই ওই একই অভিযোগ, কেউ  যোগ্য পারিশ্রমিক না পেয়ে দুর্ব্যবহার পেয়েছেন, আবার কাউকে অতিরিক্ত কাজ করিয়ে পারিশ্রমিক না দিয়ে ‘বিদেশে এনে উদ্ধার করে দিয়েছি’ ধরনের কথা শোনানো হয়েছে। 

বুধবার সারাদিন ধরে এতকিছু চলার পর, প্রতিবাদের ঢেউ এত দূর অবধি গড়ায় যে ইতিমধ্যেই লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন রণদেব সরকার, CAB-এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্য, বিগত ৪৩ বছর ধরে অনেক ঘাত প্রতিঘাত এর মধ্যে দিয়ে তাঁদের এই বঙ্গসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে হয়ত কিছু সময় অবাঞ্ছিত ভুলভ্রান্তিও ঘটেছে। যে সমস্ত প্রখ্যাত আমন্ত্রিত শিল্পী নিজেদের ব্যস্ত কর্মসূচি ছেড়ে ৩০ ঘণ্টা জার্নি করে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে প্রতি বছর আসে ভালোবাসার টানে, তাঁদেরকে সম্মানের সঙ্গে সব রকম ভাবে সহযোগিতা করা এবং দেখাশোনা করাটা তাঁদের প্রধান কর্তব্য। সমগ্র উত্তর আমেরিকার বাঙালি সারা বছর বসে থাকেন এই ৩টি দিনের জন্য তাই, সকলের হতাশা, যন্ত্রণার জন্য তাঁরা গভীরভাবে দুঃখিত। রণদেব লিখিত অফিশিয়াল বিবৃতির মাধ্যমে জানান, ‘আমি রণদেব সরকার, CAB -এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট, সদ্য সমাপ্ত বঙ্গ সম্মেলন আজ আমাদের এমন এক কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন করেছে যে নিজেদের এই মহাযজ্ঞের আয়োজক সমিতির সদস্য হিসাবে ভাবতে আমরা অত্যন্ত লজ্জিত এবং মর্মাহত হচ্ছি! কোন একক ব্যক্তি হিসেবে নয়, কোন কর্মকর্তা বা সভাপতি হিসেবে নয়, CAB-এর সমস্ত সদস্যদের তরফ থেকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সকলের অবগতির জন্য এই বক্তব্য সবার সামনে উপস্থিত করছি এবং CAB-এর পক্ষ থেকে একটি অফিশিয়াল বিবৃতি তৈরি করার জন্য আপনাদের সকলের সাহায্য চাইছি।’

CAB-এর লিখিত অফিশিয়াল বিবৃতিঃ

:
Developed by DXDasia