‘এখনকার কিছু বিষয় নিয়ে আমি খুবই আহত’

বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে সহেলী মিত্রের মুখোমুখি বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী সাহানা বাজপেয়ী

• আপনি বর্তমানে কী ধরনের গান গাইতে বেশি পছন্দ করেন? রবীন্দ্রসঙ্গীত না লোকসঙ্গীত?

রবীন্দ্রসঙ্গীত ও লোকসঙ্গীত দুইধরনের গানই গাইতে ভালোবাসি। প্রতুল মুখোপাধ্যায়, মৌসুমী ভৌমিক, শচীনদেব বর্মন ছাড়াও বাংলা গানের বিখ্যাত সব মানুষের গান গাইতে ভালোবাসি। কিন্তু অনুকরণ করে নয়। মহান সঙ্গীতকারেরা যেভাবে গানটিকে অনুভব করেছিলেন ঠিক সেই ভাবে অনুভব করে গান করতে ভালোবাসি।

 

• আপনি কি শান্তিনিকেতন-কে মিস করেন?

শান্তিনিকেশন আমার হোমটাউন। ১৭ বছর হয়ে গেল আমি আমার নিজের শহর ছেড়ে দূরদেশে আছি। আমি ৮ বছর বাংলাদেশে বসবাস করেছি আর লন্ডনে আছি বিগত ৯ বছর ধরে। প্রতিমুহূর্তে শান্তিনিকেতনকে আমি মিস করি। প্রতি দুবছর অন্তর অন্তর আমি শান্তিনিকেতনে যাই। সেই সময় দিনগুলি যে কীভাবে কেটে যায় তা বুঝতেই পারি না। আমার ২৫ বছরের পুরনো সাইকেলে চেপে কোপাই-এর তীরে ঘুরে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, শিক্ষকদের বাড়ি যাওয়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া, ফুচকা খাওয়া আরও কত কী…

• ঢাকার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী ধরনের?

আমি ৮ বছর ঢাকাতে ছিলাম। ঢাকার সঙ্গে আমার সম্পর্কে তৈরির ক্ষেত্র বললে খুব ভালো হয়। অনেক ভালোবাসা, ফ্যানদের উত্তেজনা, আর্শীবাদ পেয়েছি আমি। পেয়েছি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী, ছাত্র-ছাত্রীদের অনেক ভালোবাসা। আমার জীবনে প্রথম অ্যালবাম ‘নতুন করে পাবো বলে’ প্রকাশিত হয় বাংলাদেশে থেকেই। আর এই ভালোবাসার জন্যই ২০১৮-তেই আমি বাংলাদেশ যাচ্ছি অনুষ্ঠান করতে। 

 

• বর্তমানে বাংলা লোকসঙ্গীত যেভাবে গাওয়া হয় সেই বিষয়ে তোমার কী বক্তব্য? বর্তমানে গাওয়া লোকগীতি কী পুরোনো লোকসঙ্গীতের তুলনায় বেশি জনপ্রিয়? 

আসলে বাংলা লোকসঙ্গীত সূচনার দিনগুলি থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। প্রয়াত কালীদাস দাশগুপ্ত বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে অনেক হারিয়ে যাওয়া গানকে তুলে আনতেন। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমরা শুনেছি নির্মলেন্দু চৌধুরী, স্বপন বসু, পূর্ণদাস বাউলের গান রেকর্ডে শুনে। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন আমাদের সোজাসুজি যোগাযোগ ঘটত বাউলদের সঙ্গে। ১৯৯৬-৯৭ সালে পাঠভবনের আমার সঙ্গে আলাপ হয় বাংলাদেশ প্রবাসী অর্ণবের সঙ্গে। বর্তমানে অর্ণব বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী। সেই সময় আমরা একটা বাংলা গানের ব্যান্ড তৈরি করেছিলাম। যার নাম দিয়েছিলাম ‘বাংলা’। আমরা বাউল ফকিরদের গান ছাড়াও নানাধরনের লোকসঙ্গীত গাইতাম। গানে ফোক ইনস্ট্রুমেন্ট ছাড়াও ব্যবহার করতাম ইলেকট্রিক গিটার, অর্কেষ্ট্রা, বেস গিটার এবং ড্রাম। সেই সময় আমাদের ব্যান্ডের সেই সব গান সবাই কাছে খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আমাদের সেই ব্যান্ড এখন তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিগত ২০ বছর ধরে। এখন ব্যান্ডের দায়িত্বে আছেন প্রধান গায়ক অনুসূয়া আদিল।        

কিন্তু এখনকার কিছু বিষয় নিয়ে আমি খুবই আহত। বেশ কিছু জনপ্রিয় সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে লোকসঙ্গীত আরও মানুষের কাছে পৌছে যাচ্ছে। যেমন প্রয়াত কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের পরিচালিত হওয়া একটি অনুষ্ঠান। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল অনেক সময় লোকসঙ্গীত গাওয়ার ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয় – যেমন ‘একটু ফোক হয়ে যাক’ বা ‘একটু ফোকের সঙ্গে নাচ হয়ে যাক’ – এমন সব শব্দচয়ন খুবই আপত্তিকর। কারণ লোকগানের পিছনে লুকিয়ে থাকে এক বৃহৎ চেতনা, মাহাত্ম্য, যা এইসব নিম্নমানের শব্দ ব্যবহার উপযুক্ত নয়। সুতরাং আমার মনে হয় মানুষকে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে লোকসঙ্গীত চয়ন এবং উপস্থাপনের সময়।

• এখন আপনি কোথায় থাকেন? এখনকার সম্পর্কে দু-এক কথা বলুন?

আমি বিগত ৯ বছর ধরে লন্ডনে আছি। সাউথ এশিয়ান স্টাডির উপর আমার এমফিলের পড়াশুনা শেষ করেছি। এক্ষেত্রে আমার প্রধান বিষয় ছিল ‘কার্লচারাল ইভিলিউশন অফ মর্ডান বেঙ্গল’। আমার হাজবেন্ড রির্চাড কেমব্রিজের অধিবাসী। আমাদের ৫ বছরে মিষ্টি মেয়ে আছে যার নাম রোহিনী এলিজাবেথ। আমি ইংল্যান্ড, ইউরোপ এবং আমেরিকা জুড়ে গান গেয়ে চলেছি।

 

• আপনি তো বিশ্বের নানা দেশে যান গান করতে, সেখানে তো ভিন্ন ভাষার মানুষ থাকে; আপনি কীভাবে তাদের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও লোকসঙ্গীতকে পৌঁছে দেন?

আসলে আমাদের গান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিদেশে অনেক মানুষই অবগত। আমি সবসময় চাই অনেক বেশি সংখ্যক মানুষদের কাছে গানকে পৌছে দিতে। কিন্তু একটা কথা সত্যি যে, রবীন্দ্রসঙ্গীত বা লোকসঙ্গীতকে বুঝতে হলে তার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়, তার অর্থকে আত্মস্থ করতে হয়। তাই অনেক সময় আমি বিদেশী ভাষায় গানকে ট্রান্সলেট করে গাই। এই কাজটা খুবই কঠিন, অনেকটা সিনেমার নীচে দেওয়া সাবটাইটেলের মত। কিন্তু আমার মনে হয় শিল্পীর সময় সময় এই রকম কিছু গঠনমূলক কাজ করা উচিত, যা জীবনকে প্রসারিত করে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর আমি পোল্যান্ড যাব গান গাইতে। সেখানে বেশিরভাগ মানুষই বাংলা বোঝেন না। তাই আমি সেখানে বাংলা গান গাইব সেই দেশের ভাষায়।

• আপনার কোনও অ্যালবাম বের হবে এই বছর? কোথায় কোথায় যাচ্ছেন অনুষ্ঠান করতে? 

এই বছর আমি লন্ডন, দিল্লী, কোপেনহেগেন, স্কটল্যান্ড, জুরিক, মিউনিক, নিউওয়াক, ওশিংটন ডিসি অনুষ্ঠান করেছি। শেষ অনুষ্ঠানটি করব পোল্যান্ডে। কোনো অ্যালবাম করছি না। এবছর আমি তিনটি গান রেকর্ড করেছি। রবীন্দ্রসঙ্গীত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও লালন ফকিরের গান – এই তিনটি গান রেকর্ড করেছে এসভিএস মিউজিক এবং সঙ্গীত বাংলা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মলয় বাতাসে’ গানটি বের হয় এই বছর পুজোতে। খুব ভালো রেসপন্স। আমি এ-ব্যাপারটাকে উল্লেখযোগ্য মনে করি, কারণ এখনকার দিনে বেশিরভাগ লোকই শুধুমাত্র সিনেমার গান শোনে; নন-ফিল্মি ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিউজিক ব্যাকফুটে চলে গেছে। ইন্ডিপেন্ডেট শিল্পীদের স্বার্থে লড়াই করতে হবে আমাদের। পশ্চিমের দেশগুলি কিন্তু সুন্দরভাবে করে থাকে এই কাজ। আমি এটাই আশা করি যে, আমাদের পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করার প্রবণতাটা এক্ষেত্রেও দেখা যাবে এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিউজিক-এর ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হবে।

Developed by DXDasia