সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার করলেন একজন বাঙালি!

ইতিহাস চেতনার প্রসারে নজির গড়ছে মুর্শিদাবাদ

ইতিহাসের চর্চা নয় কোনো অবসরের বিনোদন, কিংবা অ্যাকাডেমিক কচকচির মধ্যেই তার প্রয়োজনীয়তা সীমাবদ্ধ, সেরকম ভাবারও কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদে যতটা প্রয়োজন খাবার, জামাকাপড়, বাড়িঘর কিংবা চিকিৎসার, তেমনই শিক্ষা এবং সচেতনতা ছাড়া মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা নিরর্থক। ইতিহাস মানুষকে সেই সচেতনার পাঠ দিয়ে থাকে। বিজ্ঞান যেমন প্রকৃতিকে চেনায়, তেমনই ইতিহাস চেনায় মানুষের সমাজকে, সমাজের বৈচিত্র্যকে, সময়ে সময়ে সমাজের পাল্টে যাওয়াকে। বিদ্যায়তনের চার দেওয়ালের বাইরে তাই দরকার ইতিহাসচর্চাকে আরও উৎসাহ দেওয়া। তিন বছর ধরে মুর্শিদাবাদ জেলা ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র এই কাজটি খুব সাফল্যের সঙ্গেই করে চলেছে। তাদেরই আয়োজনে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রবিবার থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হল তৃতীয় বর্ষের মুর্শিদাবাদ ইতিহাস উৎসব।

বহরমপুর কালেক্টরেট ক্লাব হলের মঞ্চে ইতিহাস উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গত বছর উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যের সেরা, এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অনার্সের পড়ুয়া গ্রন্থন সেনগুপ্ত। মুর্শিদাবাদের বিগত দুশো বছরের ১২০ জন মণীষীর ওপর তথ্যচিত্রে দেখানো হয় সেদিন। ওই মঞ্চ থেকেই প্রকাশিত হয় মুর্শিদাবাদ জেলার ইতিহাস নিয়ে গবেষণাভিত্তিক প্রায় চারশ পাতার প্রবন্ধ সংকলন, ‘মুর্শিদাবাদ অনুসন্ধান’ বইটির তৃতীয় খন্ড। সতেরটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধে মোট দুশোর বেশি ছবি সংকলিত হয়েছে সেখানে। বইটি যৌথভাবে প্রকাশ করলেন মুর্শিদাবাদ জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক সুদীপ্ত পোড়েল, জেলার প্রাক্তন অতিরিক্ত জেলাশাসক অজয় ঘোষ এবং মুর্শিদাবাদ জেলা গ্রন্থাগার আধিকারিক মনোঞ্জয় রায়। ইতিহাস চেতনার প্রসারে বিশেষ অবদানের জন্য মুর্শিদাবাদ জেলার তিনটি স্কুল – হিকমপুর উচ্চ বিদ্যালয়, নওপুকুরিয়া জানকীনাথ যদুনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, শচীনন্দন গার্লস হাইস্কুলকে এবারেই প্রথম দেওয়া হল 'মুর্শিদাবাদ ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিদ্যায়তন সম্মান'। জেলার তিনটি পত্রিকা, ‘ঝড়’, ‘অঙ্গাঙ্গী’ ও ‘বাসভূমি’-কে সম্মাননা প্রদান করা হয় আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য। শারদীয়া উৎসবেকে ফোকাসে রেখে ইতিহাসচর্চায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জেলার সেরা ঐতিহাসিক থিমের জন্য 'মুর্শিদাবাদ ইতিহাস ও সংস্কৃতি শারদ সম্মান ২০১৮' তুলে দেওয়া হল ডোমকল স্পোর্টিং ক্লাবকে। প্রথম দিনের অধিবেশনে আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব, প্রসার ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করলেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. বিজয় কুমার সরকার ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজর্ষি চক্রবর্তী । 

উদ্বোধন পর্বের শেষে খুলে দেওয়া হয় ইতিহাস বইমেলা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, মুর্শিদাবাদ জেলা সংগ্রহশালা ও বহরমপুর গার্লস কলেজ প্রদর্শনী স্টল ছাড়াও সেখানে মুর্শিদাবাদ প্যাভেলিয়ন নামে একটা বইয়ের স্টল ছিল। কালেক্টরেট ক্লাব হলের দোতলায় প্রদর্শিত হয় মৌর্য, গুপ্ত, কুষাণ ও মুঘল আমলের মুদ্রা। সেই সঙ্গে মুর্শিদাবাদ টাঁকশালের ঐতিহাসিক মুদ্রা এবং আজাদ হিন্দ বাহিনীর ডাক টিকিটের পুরো সেটও ছিল সেই প্রদর্শনে। দ্বিতীয় দিনে ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে বিষয় রেখে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা ছিল। সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার করেছেন এমন দাবি কে সামনে রেখে শেষ দিনে দেড় ঘণ্টার সেমিনারে বক্তব্য রাখেন পেশায় ডেপুটি লেবার কমিশনার রজত পাল। তিনটে দিনই জেলার মোট ২৫টি স্কুল কলেজের পড়ুয়ারা ঐতিহাসিক থিমের উপর সমবেত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। ইতিহাস চেতনা তো বটেই, তার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ইতিহাস সক্রিয়তাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে এভাবেই শেষ হল তৃতীয় বছরের মুর্শিদাবাদ ইতিহাস উৎসব।

Developed by DXDasia