
পাশের হার বাড়া মানেই কি শিক্ষিতের হার বেড়ে যাওয়া?
২০১৮-র উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট প্রকাশিত। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের কলা বিভাগের ছাত্র গ্রন্থন সেনগুপ্ত রাজ্যের প্রথম স্থানাধিকারী। প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৬। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বছর বছর মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে পাশের হার বাড়ছে। এই সংবাদ বাংলার মানুষের কাছে গর্বের। পাশের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রাপ্ত নম্বরও। তবে এতদিন উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রে যা শোনা যেত বিজ্ঞান বিভাগের, আজ তা-ই করে দেখাল কলা বিভাগ।
১৯৭৪ সালে কলাবিভাগেই বড়িশা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হয়েছিলেন আনন্দবাজারের বর্তমান সম্পাদক অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়। তারপর ২০১৮-তে গ্রন্থন। গ্রন্থন বাংলায় পেয়েছে ৯৯, ভূগোলে ১০০। যে দুটি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে এবং পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে ছাত্রছাত্রী হিমশিম খায়, যেখানে বলা হয় মৌলিকতার ছাপ স্পষ্ট রাখতে, সেই বিষয়গুলিতেই গ্রন্থন ছক্কা মেরেছে।
আম বাঙালির চক্ষু চড়কগাছ। আর এখানেই প্রশ্ন। সাহিত্যে এত নম্বর অথবা ভূগোলের মতো বিষয়ে পুরো নম্বর! কীভাবে! গ্রন্থন মেধাবী ছাত্র। সে দিনে দশ থেকে বারো ঘণ্টা পড়াশোনা করেছে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে গ্রন্থন বলেছে, নাটক করতে সে ভালোবাসে। আর উচ্চমাধ্যমিকের জন্য প্রচুর কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে তাকে। থিয়েটার নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে চায়। এমন কথা খুব কম মেধাবীই বলে। অদূর ভবিষ্যতে সে থিয়েটারের স্বপ্ন দেখতে পারবে কী না, তার পড়াশোনা ছাড়াও অন্যান্য কাজগুলির মাঝে কতটা সময় দিতে পারবে সেসব সময়ই বলবে। এখন বরং একটা অন্য উদাহরণ দেওয়া যাক।
আরও পড়ুন
ক্যানসার থামিয়ে দিতে পারেনি যার স্বপ্ন
গত কয়েকদিন যাবৎ একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি বাংলাদেশের। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে এক শিক্ষক বোর্ডের খাতা দেখছেন বাসে তাঁর পাশে বসা প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে গল্প করতে করতে। সেখানে এও দেখা যাচ্ছে তিনি খাতাটি না পড়েই টিক দিয়ে দিয়ে নম্বর বসিয়ে দিচ্ছেন। অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। যার হাতে একজন ছাত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, যে ছাত্র ঘন্টা খানেক পরীক্ষা দিয়ে ওই উত্তরপত্রটি তৈরি করছে, তার মূল্য দিচ্ছেন একজন শিক্ষক পাবলিক ট্রান্সপোর্টের মধ্যে খাতা দেখাতে। যিনি বা যারা দায়িত্ব নিয়ে দেশ গড়ার কাজে ব্রতী হয়েছেন, রাজ্য/দেশের প্রতিটা কোণায় শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চাইছেন তাঁরাই যখন এমন ঘটনা ঘটান তখন তাকে কী নামে অভিহিত করা হবে, তার ভাষা এই মুহূর্তে নেই। আমাদের ভাগ্য ভালো এইরকম কোন চিত্র এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়নি। অথবা কী কী ঘটে চলেছে তা প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে!
আসলে পাশের হার বাড়ানোর জন্য বা পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার যে যে ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এযাবৎ প্রচুর হয়েছে। আমাদের এটাও ভেবে রাখা দরকার, পাশের হার বাড়া মানেই শিক্ষিতের হার বেড়ে যাওয়া নয়। শিক্ষাক্ষেত্রের এই জয় কতটা বাড়ি বাড়ি চাকরি দিতে সক্ষম সে নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। এই সংশয় শহর মফঃস্বল ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের অধিকাংশ ছেলে-মেয়ের মধ্যেই ক্রমবর্ধমান। সাম্প্রতিক কালে গড় নম্বরের প্রচলন কি মেধাবীদেরই পিছিয়ে দিচ্ছে না? পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্টের উদ্দেশ্য আসলে ভালো একটা চাকরির ব্যবস্থা করা। একথা একমুখীন হলেও ভীষণভাবে বাস্তব। একপ্রকার সচ্ছল জীবনযাপন। সরকারি চাকরি পেলে ভালোই। চিন্তা ভাবনা কম। এবার যারা গড় নম্বর পেল, মানে ওই সত্তর থেকে আশি শতাংশের মধ্যে যারা থাকল তাদের ভূমিকা শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ছে জনসংখ্যার হার, বাড়ছে পাশের হার— এই কারণেই কি চাকরি কম! সরকার ঘোষণা করেছেন পাশের হার বাড়াতে হবে। এ ভালো কথা। তবে এটাও ভেবে দেখা দরকার এই পাশের হারের ভবিষ্যত কোথায়। নতুন কোনও আলোর দিকে চলেছি কি আমরা! নাকি লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী এক জায়গায় পড়ে থাকতে বাধ্য হবে! উত্তর যেমন দিতে হবে শিক্ষাকর্মীদের, ছাত্রদের, তেমনই শিক্ষাব্যবস্থাকেও। মেধাবীদের প্রাপ্য সম্মানটুকু জানিয়ে এই শিক্ষাব্যবস্থাকেই মনে রাখতে হবে উচ্চমাধ্যমিকের আরেক ছাত্রী মাধবী প্রামাণিকের কথাও। শহর কলকাতার বস্তিতে বাস তার। ঘর বাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে নোট-পত্রও। তার আক্ষেপ যেন জয়ের স্বপ্ন দেখতে পারে একদিন। তার সংগ্রামের পড়াশোনাটুকু বেঁচে থাকুক। আর এভাবেই শিকল ভাঙার গান আছড়ে পড়ুক সমাজের স্তরে স্তরে। যাবতীয় আলো আমাদের স্বপ্ন দেখাক। আমরা পিছিয়ে নেই। মর্যাদাটুকু পাবই, পেতে হবেই।
