ক্যানসার থামিয়ে দিতে পারেনি যার স্বপ্ন

নৃত্যকেই পাখির চোখ করে এগিয়ে চলেছে ষোলো বছরের অঞ্জলি

আশি-নব্বই-এর দশকে সুধা চন্দ্রন মানুষের কাছে জীবন সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছিলেন। এক পায়ে নাচ করে বিশ্বের কাছে বার্তা দিয়েছিলেন – দৈহিক অসম্পূর্ণতা কখনও স্বপ্নকে আটকাতে পারে না। কলকাতার অঞ্জলি রায়ও সুধা চন্দ্রনের মতোই শহরের বুকে নজির তৈরি করলেন এই বছরের পয়লা বৈশাখে। ষোলো বছর বয়সি অঞ্জলি নতুন বছরকে উদযাপন করলেন নতুন আলোয়।

অঞ্জলি ছোট থেকেই একজন নৃত্যশিল্পী হিসাবে নিজের জীবন এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইত। সে-কারণে শৈশবেই শুরু হয় তার নৃত্যশিক্ষা। কিন্তু হঠাৎই, মাত্র এগারো বছর বয়সে সে জানতে পারে তার অস্টিওসার্কোমা হয়েছে। অস্টিওসার্কোমা একধরনের ক্যানসার। এইধরণের ক্যানসারের সূত্রপাত মানুষের হাড়ে। ধীরে ধীরে দেহের সমস্ত হাড়কে নষ্ট করে দেয়। অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এর প্রবণতা। ২০১৩ সালে ক্যানসার রির্সাচ ইনস্টিটিউটের ডাঃ সুরজ গুপ্তা অঞ্জলির জীবন বাঁচাতে আক্রান্ত পা বাদ দেওয়ার কথা বলেন। এবং সেইবছরই অপারেশন হয়। কিন্তু অঞ্জলির জীবনীশক্তি এতে কমে যায়নি। এত বড় অপারেশনের একবছর পরে আবার অঞ্জলি তার স্বপ্নের দিকে অগ্রসর হয়। একপায়ে বেঁধে নেয় ঘুংরু। অঞ্জলির কথায় – ‘আমি এই শক্তি পেয়েছি সুধা চন্দ্রনকে দেখে। আমি যখন প্রথম শুনি ডাক্তার আমার একটি পা বাদ দিতে বলেছেন, তখন রীতিমত ভেঙে পড়ি।

এরপর আমি একদিন ‘নাচ ময়ূরী’ সিনেমায় সুধা চন্দ্রনের নাচ দেখে তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি। তিনিও একটি দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা হারিয়েছিলেন। কিন্তু হার মানেনি। আমিও স্থির করি, আমার একটি পা নেই তো কী হয়েছে, নাচ বন্ধ করব না। পয়লা বৈশাখের এই উপস্থাপনা আমার জীবনের নতুন দিকের সূচনা করেছে। আমি চাই আমার মত যারা দৈহিক ও মানসিক নানা অসম্পূর্ণতা নিয়ে আছেন তাঁরা যেন জীবনে কখনও হার না মানেন, বরং এগিয়ে যান।’

অঞ্জলির এই সংগ্রামের সঙ্গী হয়েছেন তার বাবা-মা। কখনই মেয়েকে আর্থিক অনটনের ব্যাপারে বুঝতে দেননি তাঁরা। বাবা একটি সামান্য কাপড়ের কারখানায় কাজ করেন। খুবই অল্প আয়ে মেয়ের অপারশন করানো সম্ভব ছিল না তাঁর। কিন্তু তাঁকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। অপারেশনের পর মেয়ে যেহেতু বেশি দূরে গিয়ে নাচ শিখতে পারবে না, তার জন্য বাড়িতেই শিক্ষক রেখেছিলেন। অঞ্জলির বাবা-মার কথায় – ‘মেয়েই আমাদের সব। ওর স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তি আমাদেরও অনুপ্রেরণা জাগায়। অঞ্জলির এই প্রচেষ্টা মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা।’ 

Developed by DXDasia