ফিল্মস্টারের চোখে গ্রামবাংলা আদতে কেমন, নাটকে দেখালেন সৌমিত্র-কন্যা পৌলমী চট্টোপাধ্যায়

মুখোমুখি-র নতুন প্রযোজনা ‘জন্মান্তর’

“আধখানা মুখ বাইরে রেখো, আধখানা মুখ অন্ধকারে,/ দূর থেকে যেন সবাই তোমায় দেখতে পারে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা থিয়েটার সবসময় এইরকম একটা আধাআধি ফ্রেমের মধ্যে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে। তিনি যেমন সম্পূর্ণভাবে হয়ে উঠতে পারেননি পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা, অন্যদিকে গ্রুপ থিয়েটারও তাঁকে সম্পূর্ণ আপন করে নেয়নি কখনও। তবে মানুষটা যদি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হন, তাহলে নটচোঞ্চুরা তাঁকে কোন তকমায় দাগিয়ে দিচ্ছেন সেটা হয়তো তাঁর কাছে খুব একটা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াত না। সার্বিকভাবে বাঙালি মনীষার চূড়ায় বসবাস করতেন মানুষটি। মূলত তাঁর নাটকের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে আছে অনুবাদ। ব্রেখট, কামু, ওডেটস, শন ও’ কেসি, জন ম্যালিংটন সিং প্রমুখ নাটককারকে বারবার বাঙালি দর্শকের সামনে নিয়ে এসেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তবে তিনি মৌলিক নাটকের ক্ষেত্রেও কতটা স্বতন্ত্র এবং বিশিষ্ট সেটি খুব ভালোভাবে বোঝা যায় মুখোমুখি নাট্যদলের নতুন প্রযোজনা জন্মান্তর থেকে।

বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের ৭৫ বছর উপলক্ষ্যে ‘মুখোমুখি’ এবছর একের পর এক উদ্যোগ নিয়ে চলেছে। পয়লা বৈশাখের সময় এক অভিনব নাট্য-উৎসবে আট জন বিশিষ্ট নাট্যপরিচালকের নতুন আটটি নাটক একসঙ্গে মঞ্চস্থ করে ‘মুখোমুখি’ একটি অভিনব ঘটনা ঘটায়। এই আটটি নবতম প্রযোজনার মধ্যে একটি মুখোমুখি-র নিজস্ব প্রযোজনা ‘জন্মান্তর’, নাটক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, নির্দেশনা পৌলমী চট্টোপাধ্যায়। সৌমিত্রবাবু এই নাটকটি লিখেছিলেন আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে, বলাই বাহুল্য তখনও পশ্চিমবঙ্গে শাসন করছে বামফ্রন্ট সরকার। সৌমিত্রবাবু সরাসরি বামফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তিনি যে বামমনস্ক ছিলেন এ কথা অনেকেই জানেন। তবে তিনি যখন নিজের শিল্পীসত্ত্বা নিয়ে নাটকের মধ্যে প্রবেশ করছেন, তিনি আর কোনো দিক থেকেই বায়াসড থাকছেন না। আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে সৌমিত্রবাবু যে গ্রামজীবনের চিত্র এই জন্মান্তর নাটকের মধ্যে তুলে ধরেছেন, তা এই ২০২৩-এ দাঁড়িয়ে পঞ্চায়েত ভোটের আগে যেন আবার প্রচণ্ডভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে এসেও ভারতের গ্রামজীবন যে খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি, তা আরও বেশি করে প্রমাণ করে এই নাটক।

কলকাতাবাসী অভিনেতা নিজের আগামী ছবির প্লটের জন্য একটি গ্রাম ঘুরে দেখতে যান এবং তারপরে গ্রামের বিভিন্ন ক্রাইসিস নিয়েই নাটকের আখ্যান এগোতে থাকে। এই নাটক যেন ঘণ্টা দুয়েকে গ্রামজীবনের কিছু টুকরো ছবির কোলাজ। বাল্যবিবাহ, একাকী মহিলাকে ডাইনি সন্দেহে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া, গাছপালার সঙ্গে নিজেকে ক্যামোফ্লেজ করে পাখি ধরতে যাওয়া, এই ধরনের চিত্র যেমন আছে, তেমনই আছে বর্গাদারী ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বেনামে (অনেক ক্ষেত্রে পোষ্যর নামে) জমি ধরে রাখার ঘটনার কথা। অতদিন আগে লেখা একটি নাটকের সঙ্গে আজকের পরিস্থিতি কী অমোঘভাবে মিলে যায়। নাটকে আরও অনেক রকম দ্বন্দ্বের কথা ফুটে উঠতে থাকে, তবে সকল দ্বন্দ্বের মূলেই থাকে উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের দ্বারা নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের উপর হেজিমনি আরোপের চেষ্টা। যে সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ নেই; ক্ষমতা, নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কী অশ্লীলভাবে সেই সমাজের মধ্যেও ধর্মীয় বিভেদ ঢুকিয়ে দিতে পারে, তা এই নাটক প্রতিমুহূর্তে প্রমাণ করে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা থিয়েটার সবসময় এইরকম একটা আধাআধি ফ্রেমের মধ্যে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে। তিনি যেমন সম্পূর্ণভাবে হয়ে উঠতে পারেননি পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা, অন্যদিকে গ্রুপ থিয়েটারও তাঁকে সম্পূর্ণ আপন করে নেয়নি কখনও। তবে মানুষটা যদি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হন, তাহলে নটচোঞ্চুরা তাঁকে কোন তকমায় দাগিয়ে দিচ্ছেন সেটা হয়তো তাঁর কাছে খুব একটা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াত না। সার্বিকভাবে বাঙালি মনীষার চূড়ায় বসবাস করতেন মানুষটি। মূলত তাঁর নাটকের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে আছে অনুবাদ।

নাটক নির্মাণ প্রসঙ্গে পৌলমী চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “জন্মান্তর নাটকটি নির্দেশনার কথা ভাবার কিছুদিন আগেই কাগজে একটা ঘটনা পড়ি। এক গ্রামে একজন ভদ্রমহিলাকে গ্রামবাসী ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাঁর উপর এমনভাবে আক্রমণ নেমে আসে যে শেষপর্যন্ত সেই ভদ্রমহিলা মারা যান। এছাড়াও বাল্য বিবাহের সমস্যা এখনও আমাদের সমাজে আছে এবং শ্রেণি বা কাস্ট নিয়ে রাজনীতিতে তো আজও ভারতবর্ষ তোলপাড় হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং দলিতের সমস্যায় ভারত আজকেও জর্জরিত। আমরা কিছুদিন আগেই দেখলাম ভারতের নতুন পার্লামেন্ট উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতি ডাক পেলেন না, ধর্মগুরুদের দিয়ে পার্লামেন্ট উদ্বোধন করানো হল। আরেকটি বিষয়, সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে আপাতভাবে কোনো সমস্যা নেই, কিছু মানুষ রাজনৈতিক আইনি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।”

এই সার্বিক প্রেক্ষাপটটি ভেবেই নাট্যনির্মাণে হাত দিয়েছেন সৌমিত্র-কন্যা পৌলমী চট্টোপাধ্যায়। তিনি আরও জানান, “নাটকটি ১৯৯৩ সালে লেখা, কিন্তু তারপরেও আমাদের নাটকটিকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে। এই নাটকে একজন ফিল্মস্টারের চোখ দিয়ে গ্রাম বাংলার গোটা চিত্রটি দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। বারবার মনে হয়েছিল এ কথাগুলো বলা খুব জরুরি। দলিত বা ‘ছোট জাত’-কে আমরা আজও কী চোখে দেখি, একজন মানুষ মুসলমান হলে সে বাড়িতে কী খাচ্ছে সেই বিষয়ে সন্দেহ করে আমরা তাকে মারি, এই সমস্ত দেখে নিজেদের একটা অসভ্য সমাজের মধ্যে বসবাসকারী প্রাণী হিসেবে মনে হতে থাকে আমার। নিজেদের জানোয়ারদের সঙ্গেও আমরা তুলনা করতে পারব না, কারণ জানোয়ারদের মধ্যেও একটা শৃঙ্খলাবোধ আছে, নিয়ম-নীতি আছে, জঙ্গলের মধ্যে তারা নিজেদের নিয়মে বসবাস করে, তার অপরদিকে আমরা মানুষেরা যে আসলে ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি আমি সত্যিই জানি না, এ বিষয়ে কথা বলার মতো আমার কোনো ভাষা নেই। আমরা নিজেদের হাতে একটা বীভৎস সমাজ গঠন করছি।”

তাঁর সঙ্গে কথা বলেই বোঝা যায়, সাম্প্রতিক এই ক্রাইসিস থেকেই জন্মান্তর নাট্য নির্মাণ। নাটকটি যখন শুরু হয়, তখন একে আর পাঁচটা সাধারণ ড্রয়িং রুম ড্রামার মতো মনে হয়। নাটকের প্রেক্ষাপট যখনই শহর থেকে গ্রামে স্থানান্তরিত হয়, তখনই আলো, সেট এবং গল্পের পট পরিবর্তনে দর্শকরা চমকে যেতে থাকেন। পৌলমী চট্টোপাধ্যায় একাধারে অভিনয় এবং নাট্যনির্মাণ, দুটি ক্ষেত্রেই দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন। নাট্য নির্মাণে নির্দেশক কিছুটা অর্থোডক্স, তবে তার ফলাফলটি যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক। এছাড়া দেবদূত ঘোষ, সঞ্জীতা, মানস মুখার্জী, সপ্তর্ষি ভৌমিক, পুষণ দাশগুপ্ত, অন্তরজিতা প্রত্যেকেই নিজের চরিত্রানুগ অভিনয়ের মাধ্যমে নাটকটিকে পূর্ণতা দিয়েছেন।

এই নাটকের আরও দুটি মূল পাওয়া, সৌমিত্রবাবুর লেখা গান, যার মধ্যে একটি গান সৌমিত্রবাবুর নিজের সুর করা এবং অন্যটি হচ্ছে মঞ্চ পরিকল্পনা। নাটকের প্রথমে তিনটি ভিন্ন লেয়ারে বিভক্ত চিড় খাওয়া মাটির মতো দেখতে ব্যাকড্রপটি যখন পরের দৃশ্যে ব্যাক সোর্সে আলোর খেলায় অরণ্যের প্রতীতি তৈরি করে, তা দর্শকদের চমকে দেয়।

তবে দুটি বিষয়ে হয়তো আরও সচেতনতা প্রয়োজন ছিল। প্রথমত, নাটকের দৈর্ঘ্য আর একটু কম করা গেলে বাঁধুনিটা আরও দৃঢ় হত এবং দ্বিতীয়ত, নাটকটিকে যদি কিছুটা পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ আজকের প্রেক্ষাপটে আনা যেত (ডিজিটাল ডিভাইস প্রভৃতি ব্যবহারে এবং ন্যূনতম মজুরীর হারের প্রসঙ্গগুলির দিক থেকে) তাহলে হয়তো বিষয়টা আরও যথাযথ হত। যদিও নাটকের মূল দ্বন্দ্বের বিষয়গুলি নাটক রচনার প্রায় তিন দশক পরেও খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি, সেক্ষেত্রে সম্পাদককে হয়তো খুব বেশি বেগ পেতে হত না সম্পূর্ণ নাটকটিকে আজকের প্রেক্ষাপটে নিয়ে আসতে।

বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের পথচলা শুরু আজ থেকে ৭৫ বছর আগে বহুরূপীর হাত ধরে। অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বহুরূপী আবার মঞ্চে ফিরেছে এবছর। তবে বহুরূপী যে কাজ ৭৫ বছর আগে শুরু করেছিল, সেই কাজ আজকে শুধুমাত্র একটি কোনো দলের কাজ নয়, এখন একটি আন্দোলনের রূপ পেয়েছে। মুখোমুখি এই গোটা বছর জুড়ে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের ৭৫ বছরকেই যেন উদযাপন করে চলেছে। মুখোমুখির জন্মদিনে হওয়া দুদিনের নাটক উৎসবে ছন্দা চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তীকে সম্মান জ্ঞাপন যেমন ছিল, তেমনই ছিল মুখোমুখির দুটি নতুন নাটক জন্মান্তর এবং আজকের সাজাহান-এর অভিনয়। জন্মান্তর নাটকটি নিয়ে আলোচনা যেকোনো কারণেই হোক তুলনামূলকভাবে কম, তবে এই মুহূর্তে বাংলার সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে এই নাটক ঠিক কতটা প্রাসঙ্গিক, তা দর্শকরা বারবার বুঝতে পেরেছেন।

_________

নাটকের ছবি: সন্দীপ কুমার

Developed by DXDasia