
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ১৩
আরও একটা বিষয় হল, শাস্ত্রীয় সংগীতের চেয়ে রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান অনেক বেশি হয়। যার জন্য শ্রোতারা মোহন সিংকে বেশি রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে দেখেছেন। মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন রাবীন্দ্রিক।
কিন্তু এসব বললে কী করে হবে! মোহন সিং কি রাবীন্দ্রিক নন? অবশ্যই রাবীন্দ্রিক। রাবীন্দ্রিক তিনি প্রথম থেকেই। রবীন্দ্রনাথের গান তাঁকে বোধ দিয়েছিল। জীবনের শুরুর পর্যায়ে শান্তিদেব ঘোষের মতো মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। তবে এ-ও ঠিক, প্রথম থেকেই মোহন খেয়াল গান, ধ্রুপদ গান। তিনি রবীন্দ্রসংগীত কখনও কাউকে শেখান না। তবু শ্রোতারা তাঁকে শুধুমাত্র রবীন্দ্রসংগীতের গাইয়ের ছাপই দিয়ে দিয়েছেন।
(গত পর্বের পর)
গত পর্বে মোহন সিং-এর গায়কি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। এই গায়কির আলোচনায় বারবার চলে আসে একটা প্রসঙ্গ — যে প্রসঙ্গ আসলে এই লেখকের নয়, শ্রোতাদের। একবার মোহন সিংকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি বড়ো শক্ত গান করেন। সেই কারণেই কি আপনার গানের শ্রোতা কম? উত্তরে মৃদু হেসে মোহন সিং জানিয়েছিলেন, আমি শ্রোতাভঞ্জনের জন্য রবীন্দ্রনাথের গান করি না। আর সেই কারণেই বিশ্বভারতীতে চাকরি করছি। নিজের গানের প্রচারের চেয়ে রেওয়াজে আমার ভক্তি বেশি। আমি অল্পশ্রুত গান গাইতেই ভালোবাসি।
কত অল্প কথায় কত সহজ করে নিজের ভুবন চিনিয়ে দিলেন তিনি। ভারী গান বলে কি সত্যিই কিছু হয়? গান শেখাটা নিশ্চয় টিয়াপাখির বুলির মতো নয়। এখানেই মোহন সিং-এর মতো শিল্পীরা প্রশ্ন তোলেন, একশোটা গান শিখে, একশো এক নম্বর গানটা আড়া চৌতাল হলেই শিল্পীরা পাতা ওল্টান। এটা কেন হবে? গান, তাল, সুর, লয় তো একটা বোধ, একটা অভ্যাস। প্রত্যেকটা সময়েই মোহন সিং তুলনামূলকভাবে অশ্রুত গান গাইতে বেশি ভালোবাসেন। এই যেমন ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’-র চেয়ে ‘জাগে নাথ জোছনারাতে’ গাইতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার কারণ এই গানের আবেদনে তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিকটভাবে পান।
মোহন সিং-এর গানের সবচেয়ে বেশি ভক্ত কিন্তু স্কুল আর কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাই। তাঁরই একটু কথা বলে আজকের পর্ব ইতি টানা যাক। মোহনবাবু মনে করেন, গানের ক্ষেত্রে স্বরজ্ঞান আর লয়টা সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন বেশির ভাগ গানই লোকে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গায়। লোকে শুনবে কেন? শান্তিদেব ঘোষ যাকে বলতেন ‘অশিক্ষিত গলা’। গানের বাণীতে, সুর আর লয়ের মেজাজ থাকলেই সেই গান শ্রোতাদের মন টানবে। আর ঘরানা তো একটাই। রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে অনুসরণ করলেই হল।
(চলবে…)
*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
