
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ১
সংগীত-মন তৈরি হওয়ার আবহে
বিস্তীর্ণ সাগরের মতো একটা জলজ্যান্ত অধ্যায়। জন্মসূত্রে তিনি পাঞ্জাবি হলেও নিজেকে শান্তিনিকেতনী বলতেই পছন্দ করেন। মোহন সিং খাঙ্গুরা। একদম ছোটোবেলা থেকেই শাস্ত্রীয় সংগীত পাঠ করেছেন তিনি। তার ফলে গানের তাল, স্বর-স্থান এবং রাগরাগিনীর জ্ঞান অর্জন হয়েছে বহুল মাত্রায়। মোহন সিং মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের গান প্রধানত দুইরকম। তাঁর গান গাইতে হলে কথার মর্ম বুঝতে হবে। তাকে নিয়ে যেতে হবে মনন অনুধাবনের মধ্যে দিয়ে। ভাবতে হবে এই গানকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কীভাবে দেখতেন। গানের মধ্যে ‘আলটিমেট’ হচ্ছে তার ভাব। তাকে হতে হবে শিল্পোৎকীর্ণ। ধরা যাক, ‘আমারও পরাণ যাহা চাই’ গাইতে গাইতে একজন কেঁদে ফেললেন। এটাকে মোহন সিং বলছেন ‘ড্রামা’, ‘আর্ট’ বলতে রাজি নন। এই ভাব মানুষের ভেতরে থাকে, আলাদা করে তা শেখা যায় না।
কবে থেকে গান গাইতে শুরু করেছেন? – মনে নেই। মোহন তখন স্কুলবয়সী। মঞ্চে গান গাওয়া স্কুলে পড়তে পড়তেই। বাবা ছিলেন আর্মি অফিসার। কিন্তু সংগীতকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসোতে পেরেছিলেন তিনি। মা গাইতেন লোকসংগীত। পাঞ্জাবি লোকসংগীত শেখা বা শোনা মায়ের কাছেই। শান্তিনিকেতন আসার পর আউল-বাউল তত্ত্ব ঢুকে গেছে মোহন সিং-এর হৃদয়ে। সেই সময় বিশ্বভারতীর উপাচার্য কিংবদন্তি শান্তিদেব ঘোষ। সুদূর পাঞ্জাব থেকে মোহন তাঁর প্রিয় ‘শান্তিদা’কে চিঠিতে লিখছেন,
“প্রিয় শান্তিদা, আমি ছোটো থেকেই গান শিখি। এবার আমি শান্তিনিকেতনে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতে চাই। আমার কি অ্যাডমিশন হবে? সুযোগ না পেলে বিছানাপত্র নিয়ে যাব, আবার ফেরত আসব, এটা করতে পারব না। কারণ আমি বিশেষভাবে সক্ষম একজন মানুষ।”
সাত-আটদিন পরে উত্তর এল, “তোমার বিছানাপত্র নিয়ে তুমি চলে এসো।”
শৈশবে গান শেখা নিয়ে কথা বলছেন মোহন সিং
এইভাবে সংগীত ভবনে প্রবেশ করলেন মোহন সিং। বিশ্বভারতীতে ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে ইন্টারন্যাশনাল গেস্ট হাউস। ওখানেই কদিন থাকলেন। পরে কদমতলা হস্টেলে তাঁর জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাথরুমের পাশেই ঘর। একসময় ওই ঘরেই ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব। মোহনকে শান্তিনিকেতনে ছাড়তে এসেছিলেন বড়দা। বড়দাকে শান্তিদা বললেন, “যান, মোহন এবার আমাদের দায়িত্বে। চিন্তা করবেন না।”
শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে মোহন সিং
এর আগেও কি আমি শান্তিনিকেতনে এসেছি?
প্রথম দিন শান্তিনিকেতন ঘুরে এমনই এক অনুভূতি হয়েছিল মোহনের। খুব চেনা একটা জায়গা। যেন এর আগেও কত কতবার এসেছেন। গাছ চেনা, পাখিদের বাসা চেনা, বিশ্বভারতীর ফাঁকা মাঠও চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু কেন? আগে তো কখনও শান্তিনিকেতন আসা হয়নি তাঁর! কেন এত চেনা লাগছে সবকিছু? সাল ১৯৬৭। তখনকার শান্তিনিকেতন নিরিবিলি একটা এলাকা। জনমানবহীন। রাস্তায় যেতে যেতে মোহন দেখতেন কেউ জার্মানি, কেউ রাশিয়ান, কেউ চিনা। নিজেদের মতো নিজেদের ভাষায় তাঁরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে যাচ্ছেন। যেন গোটা বিশ্ব একটা কেন্দ্রবিন্দুতে এসে মিশেছে। প্রথম ছাত্র হলেন সুধীশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তারপরেই মোহন সিং-এর জীবনে এলেন উস্তাদজি। এই উস্তাদজি ছিলেন নাগপুরের মানুষ। প্রথমে শুরু করলেন রাগ শেখাতে। উস্তাদজির যে ঘরানা ছিল বা যেভাবে তিনি গান শেখাতেন, সেই ভার আজও বহন করেন মোহন। ধ্রপদাঙ্গের ঘরানা সেই প্রথম শেখা। উস্তাদজি কখনও বকেননি। বিল্পম্বিত খেয়াল, ছোটো খেয়াল অনেকেই পারতেন না। উস্তাদজি চটে যেতেন। মোহন সিং-এর বন্ধু ননীগোপাল। সেই ননীকে একবার হাতুড়ি ছুঁড়ে মেরেছিলেন উস্তাদজি। তারপরেই পকেট থেকে লজেন্স বের করে ননীকে দিলেন। মোহন সিং বারবার বলেন, “উস্তাদজি আমার কাছে পিতৃসম। আসলে আমার বাবা-ই তিনি। সবই বলা যেত ওঁকে।”
অন্যদিকে ধ্রুবতারা যোশী শিল্পীদের মতো করে শেখাতেন। খুবই প্রফেশনাল। না ধরতে পারলে পরবর্তীতে আর কিছু করার থাকত না। কিন্তু উনি কাউকে কোনোদিন বকেননি। মোহন জীবনের প্রথম আগ্রা ঘরানা শিখলেন তাঁর প্রিয় যোশীদার কাছেই। যোশীদা একা থাকতেন। দুপুরে গান শিখতে শিখতে দেরি হয়ে গেলে ওখান থেকেই খেয়ে আসতেন মোহন। ঝাঁঝওয়ালা কফি খেতে এবং খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন যোশীদা।
মোহন সিং খাঙ্গুরার আরেকজন শিক্ষক সুধীশ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ভীষণ শৌখিন মানুষ। ইস্ত্রি করা, মাড় দেওয়া জামা পরতেন সবসময়। বেশি কথা বলতেন না। গুনগুন করে ঠুংরি গাইতেন কথার মাঝে। এই সুধীশদার স্মরণসভায় মোহন সিং গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান। প্রিয় সুধীশদার জন্য তিনি গান গাইছেন। দূরে কোথা থেকে নিশ্চয় শুনছেন সুধীশদা। মোহন গাইছেন, “অসীম কালসাগরে ভুবন ভেসে চলেছে/ অমৃতভবন কোথা আছে তাহা কে জানে” – ঝাঁপতাল, ভৈরবীর এই গানের প্রশান্তি সেদিন মোহন গেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় সুধীশদার জন্য। মৃত্যুর আগে সুধীশ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রিয় ছাত্র মোহনকে বলেছিলেন, “রবীন্দ্রসংগীত শিখবে না?” উত্তরে মোহন বলেছিলেন, “আগে সারেগামা-টা ঠিক মতো শিখি। তারপর দেখা যাবে।” তখন কে জানত, রবীন্দ্রনাথের গানের গভীরে রাজ করবেন মোহন সিং খাঙ্গুরা!
(চলবে…)
*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত।
