
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ১১
রবীন্দ্রনাথের ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে’ গানে ‘হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে’র জায়গায় ‘হৃদয়’ উচ্চারিত হয় সাংঘাতিক গভীরভাবে। এ এক বিস্মৃত যুগের আর্তনাদ এবং জীবনের একমাত্র প্রিয়কে খোঁজা, খানিক অপেক্ষাও। ‘হৃদয়’ শব্দের ‘হৃ’-তে যে আকুতি আছে, তা বিক্রম সিং নিজের মতো করে ব্যবহার করেছিলেন। এই গানেই ‘সবাই ছেড়েছে নাই যার কেহ/ তুমি আছ তার আছে তব স্নেহ’ লাইনের ‘ছেড়েছে’-র জায়গায় ‘ড়’-এর কী মারাত্মক উচ্চারণ করেন বিক্রম।
আসলে গান এবং এসরাজের বপণ দুই ছেলের মধ্যে করেছিলেন মোহন সিং। তাঁদের জোর করেননি কোনোদিন। দুই ছেলে নিজেরাই সুরকে নিজেদের মতো করে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। তাই মোহন সিং এবং বিক্রম সিং একই পরিবারের হয়েও গায়কিতে ভিন্ন হয়ে যান। এখানেই তো শিল্পের মজা। আজকের পর্ব জুড়ে শুধুমাত্র বিক্রম সিং-ই থাক। শুনেছি, তিনি একা থাকতে ভালোবাসতেন।
(গত পর্বের পর)
দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর অর্থাৎ দীনুদা রবীন্দ্রনাথের গানকে আকার দিতে জানতেন। তাঁর একটা বড়ো প্রভাব ছিল মোহন সিং-এর মধ্যেও। ৪৬ বছর বয়সে এসে মোহন সিং অনুভব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে, তারপর তাঁকেই আঁকড়ে ধরা। মোহন সিং বলেন, সংগীতের আসলে কোনও জাত হয় না, সে ধ্রুপদ হোক, খেয়াল হোক, রবীন্দ্রসংগীত হোক বা নজরুলগীতি – সংগীতের কোনও জাত হয় না। নিজেকেই ফর্মটার কাছে পৌঁছে যেতে হবে, তাকে চিনে নিতে হবে। একটা খেয়াল কীভাবে হওয়া উচিত অথবা একটা রবীন্দ্রনাথের গান কীভাবে হওয়া উচিত, তা শিল্পীকেই বুঝতে হবে। এদের আইডেন্টিটি হৃদয়ে জুড়ে বসা দরকার। যদি খেয়ালের টিপিক্যাল জিনিসগুলো রবীন্দ্রনাথের গানে ব্যবহার করা হয়, তাহলে অন্যায় করা হবে। আসলে রবীন্দ্রনাথের গায়কি কী, তা বুঝতেই বুঝতেই বহু বহু বছর সময় লেগে যায়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, What is the dimension of the notes which he used। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে গবেষণা করলেই বোঝা যায় সংগীত জগতে তিনি নতুন একটা ফর্ম আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। স্রষ্টার ফর্মের সঙ্গে নিজের অনুভবের বোঝাপড়া মোহন সিং শিখিয়েছিলেন তাঁর দুই পুত্রকে। গত পর্বে একা ছিলেন বিক্রম। আজকের পরবর্তী অংশও তাঁর জন্য রইল।
আনন্দ পুরস্কারের অনুষ্ঠানে মোহন সিং
সাহিত্য, রাগসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত এবং পেইন্টিং এই চার জগতেই ঘোরাফেরা ছিল বিক্রম সিং খাঙ্গুরার। চার জগতেই সাফল্য পেয়েছেন। খুব ছোটো থেকেই গান শিখতেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। ছিলেন ‘মোহরপিসি’র প্রিয় পাত্র। সাহিত্য ছিল তাঁর প্রথম আগ্রহের জায়গা, কিন্তু শেষমেশ গানেই এসে পড়লেন। বিশ্বভারতীতেই কয়েকটা চাকরির অ্যাপ্লাই করেছিলেন, কিন্তু হয়নি। তাই নিয়ে বেশ মনখারাপও ছিল তাঁর। একটা সিডির জন্য দশটা গান মাত্র দুই-তিন ঘণ্টায় গেয়ে ফেলতে পারতেন।
সে সময় বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা সুতপা ভট্টাচার্যের কোয়ার্টারে ছোটো একটা সাহিত্য সভা হত। গানে কবিতায় মশগুল সেই বন্ধুসভার সদস্যদের একটি পত্রিকা ছিল, ‘সজন’। বিক্রম তার দু’বার সম্পাদক হয়েছিলেন। একদিন সভা চলাকালীন সুতপা ভট্টাচার্য বললেন, “আসরের চা-টা কেন শুধু মেয়েরাই বানাবে? যাও বিক্রম চা বানাও। জল ফোটার পরে চা-পাতা দিয়ে ভিজতে দিয়ো। পাঁচ মিনিট।”
হাসিমুখো বিক্রমের সে কী উৎসাহ! কিছুটা ভয়ও। কিছুক্ষণ পরেই তিনি এ ঘর-ও ঘর ঘুরছেন। দেওয়ালের দিকে তাকাচ্ছেন। আসলে ওই যে পাঁচ মিনিট। কিন্তু ঘড়ি কোথায়? সময়টা বুঝবেন কীভাবে? তারপর শুরু হল সারা ঘরময় ঘড়ি খোঁজা। সেই কাণ্ড দেখে সবার কী হাসি! বন্ধুমহলের প্রত্যেকেই কেউ কোনোদিন বিক্রমকে ঘড়ি পরতে দেখেননি। আসলে সময়ের কাছে জীবনকে সঁপে দেওয়া বিক্রমের ছিল না পসন্দ। কিন্তু কী আশ্চর্য! সময়কে তুড়ি মেরে কাউকে কষ্ট না দিয়ে অসময়ে চলে গেলেন তিনি। বিক্রমের যে আসলে কী রোগ ছিল, তা কোনও ডাক্তারই ধরতে পারেননি সে সময়। হাজার চেষ্টা করেও তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি।
(চলবে…)
*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
