
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ৮
টুকু অর্থাৎ রনধীর রায়ের বাদ্যযন্ত্র দেখলেই টুং টাং করতেন আবির। একবার কোনো একটি তার খুলে যাওয়ায় ছোট্ট আবির বাঁধতে শুরু করেছিল। সেই দেখে চমকে উঠেছিলেন রনধীরবাবু। এতটুকু বয়সে এত সুন্দর করে তার বাঁধছে বাদ্যযন্ত্রে! সেই শুরু। আরেক সন্তান বিক্রম। স্বাতন্ত্রতায় যিনি আজও প্রত্যেকটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ের নয়ন জুড়ে থেকে গেছেন। বিক্রম সিং-এর কথা উঠতেই বাবা মোহন সিং বলেন, বিক্রমের জন্ম পাঞ্জাবে। গায়ের রং ছিল গোলাপি। সেই থেকে মায়ের দেওয়া নাম ‘পিঙ্কু’। প্রথম ‘সা’ লাগিয়েছিল মাত্র দেড় বছর বয়সে। উস্তাদজি প্রথমদিন চমকে গেছিলেন। এই বয়সে এমন সুর! কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে বিক্রমের যাতায়াত ছয় বছর বয়স থেকে। তাঁর কোলে বসে গান শিখেছেন, কবিতা লিখেছেন। মোহরদির দেওয়া তাই আদরের নাম ‘কবি’। বিক্রম সিং-এর ক্ষণজন্মের সাক্ষী থেকেছি আমরা। তাঁর গলায় রবীন্দ্রনাথের গান শুনে কেঁদে উঠেছি, অস্থির হয়েছি। মোহন সিং, বিক্রম সিং এবং আবির সিংকে নিয়ে বিস্তৃত লেখা পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।
(গত পর্বের পর)
শ্রোতাভঞ্জনের জন্য রবীন্দ্রনাথের গান করি না…
মোহন সিং বারবার বলেন, তিনি শ্রোতাভঞ্জনের জন্য রবীন্দ্রনাথের গান করেন না। তাই অল্পশ্রুত গান গাইতেই বেশি ভালোবাসেন। একটা কথা অস্বীকার করার কোনো জায়গাই নেই যে, তাঁর গানের প্রচারের চেয়ে রেওয়াজে ভক্তি বেশি। মোহন সিং মনে করেন, ভারী গান বলে কিছু হয় না। গান শেখাটা ঠিক টিয়াপাখির বুলির মতো নয়। ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ গেয়ে ওঠেন মোহন সিং। কিন্তু তাঁর গলায় ‘জাগে নাথ জোছনারাতে’ যেন অপূর্ব এক দৃশ্য এনে দেয় চোখের সামনে। তাঁর গলায় এই গান শুনলে যেন রবীন্দ্রনাথকে ছোঁয়া যায় অনেক কাছ থেকে। মোহন সিং বলেছেন, গানের ক্ষেত্রে স্বরজ্ঞান এবং লয় এই দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন অনেক গানই গাওয়া হয় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। লোকে তা শুনবে কেন? শান্তিদেব ঘোষ হয়তো এটাকেই বলতেন, ‘অশিক্ষিত গলা’। গানের বাণীতে, সুর আর লয়ের মেজাজ থাকলে সেই গান শ্রোতাদের মন টানতে বাধ্য। যাঁরা কমবেশি সংগীত বিষয়ে পড়াশোনা করেন তাঁরা জানেন, যে কোনও গান গাওয়ার ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চা অতি আবশ্যক। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তা মানতেন। মানতেন বলেই শান্তিনিকেতনে শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরুদের এনেছিলেন।
পাঞ্জাবের স্বর্ণমন্দিরে, ছবি- মোহন সিং খাঙ্গুরা
কোথায় রেখেছ পথিকের ঘুম?
গত পর্বে মোহন সিং-এর দুই সন্তান বিক্রম আর আবিরের প্রসঙ্গ উঠেছে। একজনের কণ্ঠ আরেকজনের এসরাজ – শান্তিনিকেতনের বাড়িটা তখন গমগম করছে সংগীতে। তারপর হঠাৎ একদিন চলে গেলেন মোহনের যুবকবেলার একমাত্র বন্ধু টুকু (অর্থাৎ রণধীর রায়)। খুব কষ্ট পেয়েছিলেন বিক্রম আর আবির। বসন্তের রাত। আবির সিং-এর চোখে তখন জল। প্রাণের প্রিয় কাকু চলে গেলেন। ছড় টেনে একনাগাড়ে বাজিয়ে চলেছেন টুকুকাকুর শেখানো তিলক-কল্যাণ আর ইমন।
এদিকে ‘কবি’ বিক্রম সেদিন ডায়েরিতে এলিজি লিখেছিলেন। গান-কাকুকে উদ্দেশ্য করে মধ্যরাতের সেই ডায়েরিতে লেখা ছিল, ‘‘কোথায় রেখেছো পথিকের ঘুম/ পথের দু-ধারে শালবন কথা বলে?/ হৃদয়ে ঝরেছে আলোর শীর্ষ?/ জানো কি, বুকের গহনে দীঘল মেঘ খুলে যায়…!’’
খাটো চাইনিজ কলারের ফতুয়া পরে ছেলেটা দৌড়চ্ছে বকুলবীথির দিকে। তারপর পাঠভবন। রাস্তার ধারে ছড়িয়ে থাকা কাগজ ফুল। বুনো ছাতিমের গন্ধ। বসন্তে রাঙা পলাশ। আর জলরঙের কোপাই নদীটা। এই সবকিছু ছিল বিক্রমের বড্ড প্রিয়। সাইকেল করে বেরিয়ে পড়তেন লাইব্রেরির দিকে। কখনও সোনাঝুরি। বাড়ি ফিরেই হয়তো মা’কে বলে উঠবেন, “দু-পিস মাছ ভেজে দাও। খুব খিদে পেয়েছে।” তখনও কি শিল্পী জানেন, সোনাঝুরির গাছে গাছে টাঙানো থাকবে তাঁর ক্ষণস্থায়ী আয়ু!
(চলবে…)
*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত
অনিবার্য কারণবশত এই সপ্তাহে কোনো ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হল না।
