“লখনউ থেকে ঘুড়ি আনা হত, আমি আর টুকু শান্তিনিকেতনের মাঠে ওড়াতাম”

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ২

নিমাইদা বাজালেন তানপুরা, আর আমি হারমোনিয়াম

নিমাইচাঁদ বড়াল বেশি গল্প করতেন না। মাঝে মাঝে মোহন সিং-কে বলতেন, আজ সন্ধেতে চলে এসো, বৌদি লুচি আর আলুর দম করবে। লুচি খাওয়ার পর কিছু গান হত, বন্দিশ হত, কিছু পুরোনো রেকর্ডিংও হত। নিমাইবাবু রেকর্ডিং করতে খুব ভালোবাসতেন। মাইক্রোফোনের ব্যবহার কীভাবে করা যায়, ‘নিমাইদা’র কাছেই প্রথম শেখা মোহনের। তাঁর কাছে একটা সাংঘাতিক ভালো হারমোনিয়াম ছিল। সেটা ছিল নিমাইদার কাকা রায়চাঁদ বড়ালের। একবার সংগীত ভবনে নিমাইদার গুরুজি এলেন। উনি মোহনকে বললেন, 
– আজ সন্ধেতে আমার অনুষ্ঠান। মোহন, তুমি হারমোনিয়াম বাজিও। তোমার হাতটা খুব ভালো। 
– কিন্তু আমি তো জানিই না বাজাতে। 
– না না, আজ তুমিই বাজাবে।

সংগীত ভবনের সামনের স্টেজে অনুষ্ঠান হল। হারমোনিয়াম আসলে বাজাবার কথা ছিল নিমাইচাঁদ বড়ালের। কিন্তু সেদিন নিমাইদা বাজালেন তানপুরা, আর মোহন ধরলেন হারমোনিয়াম। গুরুজি সেদিন বেহাগ গেয়েছিলেন। একদম সকাল সকাল সংগীত ভবনে চলে আসতেন নিমাইদা। ক্লাসে তখন কোনো ঘণ্টা ছিল না। আটটায় চলে আসতেন, ১১টা অবধি ক্লাস নিতেন। মোহন আর নিমাইচাঁদবাবুর যুগলবন্দি শুনত ক্লাসের সক্কলে।

ছোটোবেলার মোহন 

শান্তিনিকেতনে পূর্বপল্লীর মাঠে টুকু আর আমি ঘুড়ি ওড়াতাম

মোহন সিং খাঙ্গুরা বারবার বলেন, পৃথিবীতে সবথেকে বড়ো জিনিস হল নিজেকে জাজ করা। নিজের গানের জাজমেন্ট নিজে করা। থার্ড পার্সেন হিসাবে। সুর লাগছে কিনা, তান ঠিক হচ্ছে কিনা, রাগ কীভাবে বসবে সব বিচার করতে হবে নিজেকেই। মোহনের রেডিও শোনার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল ছোটো থেকেই। সংগীত ভবনের হস্টেলে রেডিও ছিল শুধু তাঁর কাছেই। অশেষদা (অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়) বলতেন, সকালে চলে আসব। বাজনা আছে। এসে নিজেই চা তৈরি করে খেতেন। তারপর চুপটি করে ওঁর বাজনা শুনতেন মোহন। এটা ছিল একটা রোজকার রেওয়াজের মতো। অশেষ বন্দোপাধ্যায় মানুষটি ভারি রসিক ছিলেন। একদিন ক্লাস শেষ হতে বাইরে দেখা গেল, কতগুলো ছাগল ঘুরছে। অশেষদা বললেন, “এই দেখো, টপ্পার ঘরানা চলে এসেছে।” গরু দেখিয়ে বলতেন, “ওই দেখো, ধ্রুপদ চলে এসেছে”। শিক্ষকদের সঙ্গে ক্লাসের বাইরেও ভীষণ আন্তরিক সম্পর্ক ছিল।  তাঁদের প্রত্যেকেরই বন্ধুত্বের একমাত্র সেতু ছিল গান। বিভিন্নরকম গানের আলোচনা-সমালোচনা চলত। যন্ত্রের মধ্যে কীভাবে গান আসতে পারে, যন্ত্রের চরিত্রটা ঠিক কীরকম এসব নিয়ে সারাদিন কেটে যেত।

টুকু এবং মোহন একসঙ্গে প্লেন ওড়াচ্ছেন শান্তিনিকেতনের মাঠে 

একবার লখনউ থেকে এক বস্তা ঘুড়ি আনা হয়েছে। বিশ্বভারতীর খেলার মাঠে সকাল দশটা নাগাদ যাওয়া হল। কিন্তু চারিদিক গুমোট, হাওয়া নেই। ঘুড়ি আর ওড়ানোই হল না। দুপুরে খাওয়াটাই ভুলে গেলেন মোহন আর টুকু। টুকু অর্থাৎ রনধীর রায়। এই টুকুর সঙ্গে মোহনের এমনই সম্পর্ক ছিল। ক্লাস ফাইভে মোহন হাতে পেয়েছিলেন একটা বক্স ক্যামেরা।

ঘুড়ি ওড়ানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে বলছেন মোহন সিং খাঙ্গুরা

আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলা যাক। মোহন সিং-এর হাত ধরেই শান্তিনিকেতনের মানুষ প্রথম গাড়ি দেখতে শুরু করে। গাড়ি চালানো বহু পুরোনো শখ। ১৯৮৫ সালে পৌষ মেলায় গাড়ির শোরুমে সেই প্রথম একটা গাড়ি বুক হল। আসানসোলে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে সেই গাড়ি। যার দাম ১৯,০০০ টাকা। সেই সময়ে এটা বিশাল অঙ্কের টাকা। বিশ্বভারতী থেকে লোন নিলেন মোহন। স্কুটার চালিয়ে গেলেন সিউরি, মাত্র ৫৫ মিনিটে। গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে। কিন্তু তাঁরা সবাই হতবাক। এমন গাড়ি বীরভূম জেলায় আগে কখনও দেখেননি কেউ। এটা কোন ক্যাটাগরিতে পড়বে, কেউ বুঝতে পারছিলেন না। সাইড কার স্কুটার জানার পর রেজিস্ট্রেশন হল। গাড়ির নম্বর হল। সেদিন রেজিস্ট্রেশন অফিসের এক অফিসারকে স্কুটারে করে ঘুরিয়েছিলেন মোহন সিং। খেলার মাঠে প্রায়ই নিজেদের তৈরি করা খেলনা হেলিকপ্টার ওড়াতেন মোহন আর টুকু। আসলে তখন ছিল শখ বাঁচিয়ে রাখার সময়। ওড়বার সময়। 
(চলবে…) 

*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত।

Developed by DXDasia