
১১৫ বছর ধরে বর্ধমান-সহ সারা বিশ্বে মিহিদানা পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে
সুকুমার রায় বহুকাল আগেই তাঁর ‘পাগলা দাশু’র ‘চিনে পটকা’ গল্পে লিখে গেছেন, “হাঁড়িতে কী রেখেছিলি?” রামপদ তখন বুঝিতে পারিল যে গোলমালের জন্য সমস্ত দোষ তাহারই ঘাড়ে আসিয়া পড়িতেছে! সে বেচারা তাড়াতাড়ি বুঝাইতে গেল, “আজ্ঞে, ওর মধ্যে করে মিহিদানা এনেছিলাম, তার পর”— মুখের কথা শেষ না হইতেই পণ্ডিতমহাশয় বলিলেন, “তারপর মিহিদানাগুলো চীনে পটকা হয়ে ফুটতে লাগল— না?” বলিয়াই ঠাস্ ঠাস্ করিয়া দুই চড়!” – বেচারা মিহিদানার কারণে পণ্ডিতমশায়ের কাছে তাকে মার খেতে হয়েছিল। সেই মিহিদানা। যা একান্তর বর্ধমানবাসীর গর্বের। হলুদ হলুদ দানায় উজ্জ্বল বর্ণের সুস্বাদু সেই মিষ্টির নাম জানে সারা বিশ্ব। ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ জিআই রেজিস্ট্রেশনের স্বীকৃতি পায় মিহিদানা ও সীতাভোগ। অর্থাৎ সরকারিভাবে এই দুই মিষ্টি শুধুমাত্র বর্ধমানের নিজের। বাংলার মিষ্টি নিয়ে যাবতীয় দ্বিধা-দ্বন্দ্বের গল্প নতুন কিছু নয়। আর এই দ্বন্দ্ব আছে বলেই, লড়াই শেষে জিতে যাওয়ার তৃপ্তিও আছে। যেরকম তৃপ্তি আমার আপনার জিভে। কারণ বর্ধমান মানেই মিহিদানা আর মিহিদানা মানেই বর্ধমান। এই প্রবাদবাক্য হয়তো প্রত্যেক বাঙালিই একবাক্যে স্বীকার করে নেবেন। মিহি অর্থে সূক্ষ্ম এবং দানা অর্থে শস্য – সেই থেকেই জন্ম হল মিহিদানার। তা এই মিহিদানার জন্ম হল কীভাবে? আসুন একটু জেনে নেওয়া যাক।
আরও পড়ুন
উত্তমকুমার, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, মান্না দে – সেসময় প্রত্যেকের পছন্দ ছিল ধীরেনের ফিশ কবিরাজি
১৯০৪ সালের ১৯ আগষ্ট লর্ড কার্জন এলেন বর্ধমানে। সেইসময় বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাব বর্ধমানের বিশিষ্ট মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ভৈরবচন্দ্র নাগকে বিশেষ ধরনের মিষ্টি প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। যাতে লর্ড কার্জন সম্মানিত হন এবং বাংলার মিষ্টি নিয়ে তাঁর কোনও ধন্দ না থাকে। লর্ড কার্জনকে স্বাগত জানাতেই ভৈরবচন্দ্র নাগ তৈরি করলেন সীতাভোগ এবং মিহিদানা। যা খেয়ে লর্ড কার্জন অভিভূত হয়ে যান। এমনকি তার অনেক বছর পর দুর্গাপুর কংগ্রেসের এক অধিবেশনে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু মিহিদানা খেয়ে বিরাট প্রশংসা করেন। অর্থাৎ মিহিদানার ইতিহাস আজ থেকে ১১৫ বছর আগের। না, বাঙালি কিন্তু এই ইতিহাস ভুলে যায়নি। বরং, বংশ পরম্পরায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম মিহিদানার গল্প শুনিয়ে এবং খাইয়ে একেবারে বাড়ির মিষ্টি হয়ে উঠেছে মিহিদানা। পাশাপাশি সীতাভোগও কম যায় না।

মিহিদানা কীভাবে তৈরি হয় জানেন? মিহিদানার প্রধান উপাদান কিন্তু চাল। প্রস্তুতিতে সাধারণত গোবিন্দভোগ, কামিনীভোগ অথবা বাসমতী চাল ব্যবহার করা হয়। চাল গুঁড়ো করে তার সঙ্গে বেসন এবং জাফরান মেশানো হয় ভালো করে। তারপর তাতে জল মিশিয়ে একটি থকথকে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। একটি ছিদ্রযুক্ত পেতলের পাত্র থেকে সেই মিশ্রণ কড়াইতে ফুটন্ত গাওয়া ঘিতে ফেলা হয়। তারপর দানাগুলি কড়া করে ভেজে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তুলে চিনির রসে রাখা হয়। ব্যাস, তৈরি হয়ে যাবে মিহিদানা। তবে এই ধরনের মিষ্টি বাড়িতে তৈরির চেষ্টা না করাই ভালো। কারণ একটাই। আস্লি বর্ধমানের হলুদ রঙা মিহিদানা যদি আপনি একবারও চেখে না দেখেন, তাহলে হায় এ বাঙালি জন্ম।
বাঙালি কবি-শিল্পীরাও সেই কবে থেকে মিহিদানায় মজে আছেন। এই মিষ্টিকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে কত কত গান, সাহিত্য। শুধুমাত্র সুকুমার রায় নন, এই তালিকায় থাকবেন রজনীকান্ত সেন। তাঁর ‘কল্যাণী’ (১৯০৫) কাব্যগ্রন্থের ঔদারিক সংগীতে বাংলার বিভিন্ন্রকম মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়। মিহিদানার উল্লেখ করে রজনীকান্ত লিখেছেন, “যদি, কুমড়োর মতো, চালে ধরে রত,/ পান্তোয়া শত শত;/ আর, সরষের মতো, হত মিহিদানা/ বুঁদিয়া বুটের মতো!” ভেবে দেখুন, মিহিদানা তৈরি হচ্ছে ১৯০৪-এ। আর তার ঠিক পরের বছরেই এই লাইনগুলি লিখছেন রজনীকান্ত। একবছরের মধ্যেই যে মিহিদানা সর্বত্র পৌঁছে গিয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
