
২০২০ সালের দুর্গাপুজো— কোথায় কী থিম! কলকাতা ঘুরে দেখল বঙ্গদর্শন
“বলদে চড়িয়া শিবে শিঙ্গায় দিলা হাঁক
আর শিঙ্গা শুনি মর্ত্যেতে বাজিয়া উঠল ঢাক
শিবের সনে কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী
আশ্বিন মাসে বাপের বাড়ি আসেন ভগবতী
গৌরী এল, দেখে যা লো…”
দোহার ব্যান্ডের বিখ্যাত এই গান বেজে ওঠে দুর্গাপুজোর আগে আগেই৷ এই গানের সুর গৌরীকে ডাক দেয়। আগমন বার্তা। আকাশে বাতাসে তুলোর মতো মেঘ আর মখমলে কাশ। পুজোর বাকি আর মাত্র ৩০ দিন। সমস্ত আনন্দ, সমস্ত উত্তেজনা, সবকিছুই বেঁচে আছে, তবে পুজো আসার ইঙ্গিতগুলো বদলে গেছে খানিক। গৃহবন্দি মানুষ উৎসব পালন করেছে নিজের মতো করে। আর দিন গুনেছে কবে আসবে দুর্গাপুজো! একটু বাইরে বেরোতে হবে তো। এই রোমান্টিসিজম বাঙালির যতদিন বেঁচে থাকবে, প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে কটা দিন দেখা হওয়ার উচ্ছ্বাসও থাকবে ততদিন। হ্যান্ডশেক নয়, কোলাকুলি। আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরাটুকুর মজা। এই তো, এটুকুই তো সম্বল। কিন্তু অতিমারী বলে দিয়েছে শারীরিক দূরত্ব অবলম্বন করতে। তাহলে এই কোলাকুলিগুলো মাঠে মারা যাবে না তো?
টালাপার্ক প্রত্যয়
কলকাতার দুর্গাপুজোর মধ্যে রয়েছে বহু যুগের ইতিহাস। কত কত আন্দোলন। কত হুল্লোড়। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার পড়েছে। কলকাতাবাসীদের শুধু একটাই প্রশ্ন। কোন পুজোর কোন থিম? আসুন, সেই খোঁজটুকুই বরং দেওয়া যাক।
অজেয় সংহতি
শহরের বড়ো-মেজো-সেজো সব পুজোই মেতে এই পোস্টারের ট্রেন্ডে। পোস্টারেই শুরু হয় পুজোর কাউন্টডাউন। সঙ্গে, পুজোকমিটির বিজ্ঞাপন। নিজেদের এলাকার পুজো নিয়ে খানিক অতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি করা। এর ধাঁচা হাজারো। কখনও দক্ষ পেশাদারি কায়দায় ‘ক্রমশ প্রকাশ্য’ ভঙ্গিতে ধারাবাহিক পোস্টার লঞ্চ চলতেই থাকে। কখনও, প্রথমে টিজার, পরে মূল পোস্টার। কেউ কেউ পোস্টার নিয়েও সাবেকি। কয়েকমাস আগে থেকেই কলকাতার বড়ো রাস্তা, অলি-গলি ভরে ওঠে এই পোস্টারে। পোস্টারে-পোস্টারেও পুজোর টক্কর চলতে থাকে উত্তর থেকে দক্ষিণ। এক পুজোর পোস্টার সীমানা ডিঙিয়ে চলে আসে অন্য এলাকার পুজো-মণ্ডপের সামনে। সে এক আলাদাই মজা।
দমদম পার্ক তরুণ সংঘ
নাকতলা উদয়ন সংঘ
দক্ষিণ কলকাতার বেহালা নূতন দলের থিম আন্তরিকতার পুজো মানবিকতার উৎসব। অজেয় সংহতি এবার শুভাশুভ-এ। যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লীর পুজোয় দেখা যাবে লৌকিকতার ছাপ। অন্যদিকে খিদিরপুর ২৫ পল্লীতে মা আসবেন বাধা পেরিয়ে। দমদম পার্ক তরুণ সংঘে এবার ছোটো বাজেটে বড়ো পরীক্ষা। টালাপার্ক প্রত্যয়ে কল্পলোক এবার লোকহিত। গড়িয়াহাট হিন্দুস্তান ক্লাবের ভাবনা প্রাণ বায়ুতে মহামায়া অন্তরে তাঁর জীবন ছায়া। হিন্দুস্তান পার্কের ভাবনা মানত। সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে সাবেকিয়ানা। আহিরীটোলা সার্বজনীনে দেখা যাবে মায়ের ভাঙন।
বেহালা নূতন দল
গড়িয়াহাট হিন্দুস্থান ক্লাব
সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে তিনটি পুজোক্লাব। বাদামতলা আষাঢ় সংঘের থিম পথের পাঁচালি। ৬৬ পল্লীতে অপরাজিত এবং কালীঘাট নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিটে অপুর সংসার। অন্যদিকে চেতলা অগ্রণীতে দুঃসময়। কুমোরটুলি সার্বজনীনের থিম পুজো পজেটিভ করোনা নেগেটিভ। নাকতলা উদয়ন সংঘের ভাবনা তরঙ্গ (চুপের শব্দ বিরাট)।
বাদামতলা আষাঢ় সংঘ–৬৬ পল্লী–নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিট
অতিমারীর মধ্যে জয়গান। সেই জয়গানের সুর যাঁরা বেঁধে দিচ্ছেন সেই সমস্ত শিল্পী এবং পুজো উদ্যোক্তাদের জানাই কুর্নিশ। বিশ সাল তার অনেকখানি বিষ দূর করুক সামাজিক দূরত্ব এবং সমস্ত সতর্কতার মধ্যে দিয়ে। আবহে বেজে উঠুক পুজোর গান। পাড়ার মোড়ে মোড়ে থাক পুজোর পোস্টার। আর থাক পুজোর লড়াই। শিল্পীদের মুখে থাক চওড়া হাসি।

