“সৌমিত্রদাকে আমরা দেখলাম, শরীরের যাবতীয় অসুস্থতাকে ভুলে গিয়ে অভিনয় করে চলেছেন”

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ৮৭তম জন্মদিনে স্মৃতিচারণ করছেন পরিচালক শৈবাল মিত্র

সৌমিত্রদার সঙ্গে আমি প্রথম কাজ করি ২০০৭ সালে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য ছবি বানাতে গিয়ে। ছবিটির নাম ছিল ‘দ্রোণাচার্য’। ছবিতে সৌমিত্রদার সঙ্গে আর যারা অভিনয় করেছিলেন তাঁরা হলেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ ও অপরাজিতা ঘোষ দাশ। সেই আমার সঙ্গে তাঁর প্রথম আলাপ। তবে সেই আলাপ যে ক্রমে ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছেছিল তা নয়। অন্য অনেক পরিচালকের থেকে আমার সঙ্গে সৌমিত্রদার সম্পর্কের মধ্যে একটা দূরত্ব রয়ে গিয়েছিল। এর কারণ প্রথমে অবশ্যই সৌমিত্রদার উচ্চতা সম্পর্কে আমি সব সময়েই খুব সজাগ ছিলাম। আর আমি নিজে খুব একটা আড্ডাবাজ নই বলে শুটিংয়ে সৌমিত্রদার আড্ডায় যোগ দেওয়াকে এড়িয়েই চলতাম। তাছাড়া ছবি করার যাবতীয় ঝক্কি যেহেতু পরিচালক হিসেবে আমাকেই সামলাতে হত, তাই কখনো ইচ্ছে হলেও আড্ডায় যোগ দেওয়া সম্ভব হত না।

‘দ্রোণাচার্য’ ছবিটি সৌমিত্রদা দেখেছিলেন কিনা জানি না। কিন্তু ছবিটির কথা উনি হয়তো শুনেছিলেন। তাই ২০১৬ সালে আবার যখন ‘তখন কুয়াশা ছিল’ ছবির জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি, তখন তিনি দোণাচার্যের খোঁজ করেছিলেন। ‘তখন কুয়াশা ছিল’ বানাতে গিয়ে আমায় নানারকমের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। ঠিক ছিল ছবিটি শীতকালে শুটিং হবে। কিন্তু সৌমিত্রদার ডেটের সঙ্গে অন্য শিল্পীদের ডেট মেলাতে গিয়ে শুটিং শুরু হল ২০১৭-র জানুয়ারি মাসের শেষদিকে। প্রথমে তিনদিন শুটিং হয়। কিন্তু তারপরই কলকাতায় সৌমিত্রদার নাতি রণদীপ ভয়ঙ্কর এক অ্যাক্সিডেন্টের ফলে পঙ্গু হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। ফলে তার জীবন বাঁচাতে শুরু হয় ডাক্তারদের লড়াই। সেই সময় উদ্বীগ্ন, চিন্তিত সৌমিত্রদাকে কাছ থেকে দেখেছিলাম। তিনি তাঁর সব কাজ থামিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর খবর রাখলেও ছবির বাকি শুটিংয়ের ব্যাপারে স্বভাবতই তাঁর কোনও যোগাযোগ করিনি, কিন্তু রণদীপের খবর রাখতাম।

‘তখন কুয়াশা ছিল’ ছবির একটি দৃশ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

এর ফলে শুটিং আরও প্রায় কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। এরপর রণদীপ কিছুটা ভালো হলে সৌমিত্রদা তাঁর থমকে থাকা কাজকর্ম শুরু করেন। কিন্তু উদ্বেগ আশঙ্কায় সৌমিত্রদা কলকাতার বাইরে শুটিং করতে যেতে আর রাজি হলেন না। ফলে কলকাতার স্টুডিয়োতে সেট বানিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। কাজ করতে করতে লক্ষ্য করেছি মনে মনে নাতিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলেও শটের সময় তার কোনও রকম বহিঃপ্রকাশ থাকত না। পাক্কা পেশাদার অভিনেতার মতো নিজের ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় বিক্ষোভকে সরিয়ে রেখে কাজ করে চলেছেন। ছবিটি এখনও মুক্তি পায়নি। কিন্তু যেদিন হবে সেদিন মানুষ দেখবে কী অসাধারণ অভিনয় করে গেছেন সৌমিত্রদা।

এরপর যখন ‘আ হোলি কন্সপিরেসি’ ছবি করার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন আবার সৌমিত্রদার সঙ্গে যোগাযোগ করি। এবার ছবিটির ভাষা ইংরেজি আর সঙ্গে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ্‌। যেদিন ওঁর বাড়ি গিয়ে প্রস্তাবটা দিই মনে হল উনি ঠিক বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু ক্রমশ ছবিটির চিত্রনাট্য পড়ে নাসির সাহেবের সঙ্গে কথা বলে খুবই উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই ছবিতেও দুই বিরাট মাপের অভিনেতার একসঙ্গে ডেট পাওয়া নিয়ে অনেক বিনিদ্র রাত আমাকে কাটাতে হয়েছিল। এর মধ্যে সৌমিত্রদার শরীর ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না শেষ পর্যন্ত সৌমিত্রদা শুটিং করে উঠতে পারবেন কিনা। 

‘আ হোলি কন্সপিরেসি’ ছবির পোস্টার

এদিকে নাসির সাহেব সৌমিত্রদার সঙ্গে কাজ করতে খুবই উৎসাহী। মাঝে মাঝেই তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি জানতে চান প্রস্তুতি কেমন হচ্ছে ইত্যাদি। আমি তাঁকে সবই জানাই, কিন্তু সৌমিত্রদাকে নিয়ে আমার উদ্বেগের কথা কিছু বলি না। বুঝতে পারি অবস্থা এমন দিকে এগোচ্ছে যে দুজনেরই ছবিটিতে কাজ করার ইচ্ছে থাকলেও হয়তো সৌমিত্রদার শারীরিক কারণে শুটিং হয় পেছিয়ে দিতে হবে অথবা সৌমিত্রদাকে বাদ দিয়েই ছবিটিকে করতে হবে। অথচ চরিত্রটির জন্য সৌমিত্রদার থেকে ভালো আর কেউ নেইও কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে।একটা সময় এল যখন সৌমিত্রদাও বুঝতে শুরু করেছেন এত বড়ো একটা রোলে অভিনয় করার ধকল হয়তো তাঁর শরীর নিতে পারবে না। এমন অবস্থায় আমার পক্ষে তাঁকে জোর করাও খুব মুশকিল হয়ে পড়ল। সৌমিত্রদা বিভিন্ন অজুহাতে শুটিং পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করতে লাগলেন। কিন্তু দেখা গেল সেটা করতে গেলে নাসির সাহেবের পরবর্তী ডেট পেতে আরও একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। প্রযোজকরা তাতে চিন্তায় পড়লেন। শুটিং ফ্লোর বুকিং হয়ে গেছে। সেট তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এমন অবস্থায় শুটিং থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। আমি অনেক সঙ্কোচ নিয়ে সৌমিত্রদাকে সব জানালাম। সব শুনে সৌমিত্রদা রাজি হলেন শুটিং করতে। কিন্তু তাঁর অসুস্থতার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা আমাদের করতে হল। এমনিতেই সৌমিত্রদা দিনে চার ঘন্টার বেশি শুটিং করতে পারেন না। দুর্বল হয়ে পড়েন।

অবশেষে একদিন শুটিং শুরু হল। নাসির সাহেব এলেন কলকাতায়। শুটিংয়ের ফ্লোরে যেদিন দুজনের প্রথম দেখা হল, আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখলাম দুজনে দুজনাকে জড়িয়ে ধরে সেকি আনন্দ! সেদিন জানতে পেরেছিলাম দুজনেরই বহুদিনের একটা আশা সত্যি হয়েছিল। তা হল, কোনো একটা ছবিতে দুজনের এক সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে। এই ইচ্ছে সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। যাই হোক, এর ফলে অসুস্থ সৌমিত্রদাকে আমরা দেখলাম শরীরের যাবতীয় অসুস্থতাকে ভুলে গিয়ে অভিনয় করে চলেছেন। দেখে বোঝার উপায় রইল না যে মানুষটা কতখানি অসুস্থ ভেতরে ভেতরে।

এই হলেন সৌমিত্রদা। বারবার দেখেছি একবার ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ালে আর সব যেন মিথ্যে হয়ে যেত মানুষটার কাছে। কে পরিচালক, কেমন তাঁর শরীরের অবস্থা কোনও কিছুই তখন আর বিচার্য নয়। তখন তিনি শিশির ভাদুড়ি আর সত্যজিতের হাতে গড়া এক আশ্চর্য অভিনেতা। যিনি তাঁর অভিনয়ের সংগীতকে ছন্দে তালে ভঙ্গিতে মুখরিত করে তুলে সারা ফ্লোরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। যেন তিনি তাঁর সেই গুরুদের উদ্দেশে গেয়ে উঠছেন, “বন্দনা মোর ভঙ্গিতে আজ সংগীতে বিরাজে”। 

 

 

 

 

 

Developed by DXDasia