ক্যানিং-এ মাতিয়ে রাখছে মাতলা

ক্যানিং-কে বলা হয় সুন্দরবনের প্রবেশ পথ। বহির্বিশ্বেও তার পরিচিতি।

মাতলা নদীর উপর দিয়ে সাঁই চলে যাচ্ছে ব্রিজ, জেলেদের মাছ ধরার জন্য জাল ছুঁড়ে দেওয়ার টেকনিক বাংলাকে আছন্ন করছে। মাতিয়ে রাখছে মাতলা। লর্ড ক্যানিং আসছেন, মিটিং করছেন। এইচ.ই.এ কট্টর লিখেছেন, ১৮৬৪ সালে সুন্দরবন পুনঃতদন্তের জন্য অপ্রত্যাশিত প্রকল্প নিয়ে একটি সাক্ষ্য দেওয়া হয়, যা ক্যানিংয়ের শত্রু ছাড়া আর কিছুই নয়। এর ফলে নস্যাৎ হয়ে যায় ক্যানিং-কে প্রধান বন্দর শহর করার ধারণাটি।

ক্যানিং স্টেশন চত্বর

১৮৫৬ থেকে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল এবং ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর থেকে ভারতে প্রথম ভাইসরয়। বিখ্যাত রাজনীতিজ্ঞ জর্জ ক্যানিংয়ের তৃতীয় পুত্র চার্লস জন ক্যানিং। তাঁর প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের শুরু। লর্ড ক্যানিং এই বিদ্রোহটি দমন করেন এবং এ ঘটনার পর ১৮৫৮ সালে পার্লামেন্টারি আইন পাশ হয়। ক্যানিং যতদূর সম্ভব ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বাছবিচারহীন প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ পরিহার করেন এবং ‘ক্ষমাশীল ক্যানিং’-এর উপাধি অর্জন করেন। লর্ড ক্যানিং-এর প্রশাসনের শেষদিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৮৬১ সালে ভারতীয় কাউন্সিল আইন পাশ, যার দ্বারা বেসরকারি ভারতীয় সদস্যগণ ভাইসরয়ের আইনসভায় মনোনীত হতে পারতেন। ১৮৫৭ সালের যুদ্ধের সময়কার গুরুভার ও কঠিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্লান্ত ক্যানিং অবসর গ্রহণ করে ১৮৬২ সালে ভগ্নস্বাস্থ্যে ভারত ত্যাগ করে চলে যান ইংল্যান্ডে। সেই থেকেই রয়েছে ক্যানিংসের ‘হাউস’, যা আজ প্রায় ধ্বংসাবশেষ।

মাতলা নদী

লর্ড ক্যানিং একটি বন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যা হতে পারে কলকাতার বিকল্প এবং সিঙ্গাপুরের প্রতিদ্বন্দ্বী। সবুজ ম্যানগ্রোভদের রেখে যেতে চেয়েছিলেন নিজের মতো, যেহেতু তারা প্রকৃতির ক্রোধের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক বাঁধা, ঘূর্ণিঝড়, ঢেউ এবং জোয়ারের প্রবাহের প্রাথমিক আক্রমণকে শোষণ করে। ‘গোলকুঠি’ এবং ‘হোটেলকুঠি’ নামেও প্রশাসনের উদ্দেশ্যে দুটি পৃথক বিল্ডিং তৈরি করা হয়েছিল। প্রথমটি বর্তমানে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ‘হোটেলকুঠি’ এখনও ক্যানিং শহরের উপকণ্ঠে হেলিকপ্টার মোড়ের কাছাকাছি ধ্বংসাবশেষ আকারে দাঁড়িয়ে আছে। 

ক্যানিং সুন্দরবনের প্রবেশ পথ হিসেবে বহির্বিশ্বে পরিচিত। চটুল ম্যানগ্রোভ বনের নিকটতম রেলওয়ে এবং সড়কপথ ক্যানিং থেকে কলকাতার সঙ্গে সংযুক্ত। শিয়ালদহ দক্ষিণ লাইন থেকে ক্যানিংগামী ট্রেন চলে, যার ভাড়া ১৫ টাকা। দুটি রাস্তা বা সড়কপথ: একটি ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস; দ্বিতীয়টি বাসন্তী হাইওয়ে। এই দুটি পথ  কলকাতার সঙ্গে যুক্ত। এই মহকুমার মূল স্থান ক্যানিং একটি সুপ্রাচীন জনপদ, যা গড়ে উঠেছিল বড়লাট লর্ড ক্যানিং এর নামানুসারেই। মাতলা নদীর তীরে এই জায়গাটি বর্তমানে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার নামে খ্যাত। ভারতবর্ষের তৃতীয় শহর হিসেবে ক্যানিং এ রেলপথ স্থাপন হয় তৎকালীন ক্যানিং বন্দরের সুবিধার্থে ১৮৬২-৬৩ সালে। উল্লেখ্য এ রাজ্যের ইতিহাসে ক্যানিংই ছিল প্রথম পুরশহর। পরে সেই তকমা যদিও মুছে যায়।

ক্যানিং স্টেশন প্ল্যাটফর্ম

ইতিহাস কথা বলে। হ্যাঁ, বলে। মাতলার ধারে আমরা ঠাঁই বসে থাকি। নিবিড় সহাবস্থান আমাদের। ইতিহাসের খুব কাছে চলে এলে সবকিছু কেমন শান্ত মনে হয়। ইতিহাসের পাতা থেকে ‘যুদ্ধ’ নামক এক ভারি শব্দ ম্লান হয়ে যায় এভাবেই। 

ছবি- প্রতীক দে চৌধুরী 

Developed by DXDasia