
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষকে একাত্ম করছে পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ
সুন্দরবন – এই নাতিদীর্ঘ শব্দ শোনামাত্রই একটা বুনোট চিত্রকল্প আমাদের মনে ভেসে ওঠে। ডোরাকাটা বাঘ, গরান গাছের জঙ্গল, সাপ, লোনা জল, বনবিবির আখ্যান, ভেড়ি, আর হতদরিদ্র, অবহেলিত মানুষ। এই অঞ্চলে খাদ্য, পানীয় জল, বাসস্থানের সমস্যা দূরীকরণের জন্যে সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা নানারকম উদ্যোগ নিয়েছে, নানারকম প্রকল্পও চালু করেছে। কিন্তু মানুষের দুঃখ-কষ্ট শুধুমাত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসে লাঘব হয় না। তারপরেও প্রয়োজন হয় বোধ, মেধা, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা। এই পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা খুবই প্রয়োজনীয়। তাছাড়া কুসংস্কারের জড়তা কাটিয়ে যুক্তিবাদী ও স্বনির্ভর হওয়ার প্রক্রিয়া সুস্থ, সংবেদনশীল সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কাজটা কঠিন, কিন্তু সৎ প্রচেষ্টা আর দূরদর্শিতা থাকলে সম্ভব। এই কথাই প্রমাণ করছে 'পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ', বা পিউপা (PUPA)। তাদের 'আমার গ্রাম' প্রকল্প এই অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনযাপনে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আনছে।

সংস্থাটির যাত্রা শুরু ১৯৯০-৯১ সালে। সেই সময়ে শাখাওয়াত মেমোরিয়াল মেয়েদের স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে এই অভিযান আরম্ভ হয়েছিল। ভারতীয় 'জুলজিকাল সার্ভের' প্রাক্তন বিজ্ঞানী ডক্টর অমলেশ মিশ্রর মস্তিষ্কপ্রসূত পিউপা শুরুর দিনগুলো থেকেই স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে শিক্ষা, বিশেষত বিজ্ঞানের প্রসার নিয়ে নিরলস কাজ করছে। বর্তমান কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র সুন্দরবনের সাগরদ্বীপ। সেখানকার দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের পরিবেশ আর ফলিত বিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতন করছে পিউপা। গ্রামের নাম ফুলবাড়ি, এবং আক্ষরিক অর্থেই ফুলের মতন ছেলেমেয়েদের শেখানো হচ্ছে গাছের সালোকসংশ্লেষ (photosynthesis) প্রক্রিয়া, বিজ উদগম (seed germination) বিভিন্ন ধাপ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (rainwater harvesting) করার প্রাথমিক পদ্ধতি। প্রকৃতির মাঝে, পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শিক্ষা দানে এই উদ্যোগ সত্যিই অভিনব। কেউ কি ভেবেছিল, প্রত্যন্ত সাগর ব্লক এলাকার নবম শ্রেণির ছাত্রী প্রাণোচ্ছল দীপ্তি প্রামাণিক জৈব চাষাবাদের গবেষণার জন্যে সরকারি পুরস্কার পাবে এবং মহারাষ্ট্রে যুব বিজ্ঞান কংগ্রেসে সারা দেশের মাত্র ৩০-জন আমন্ত্রিতদের তালিকায় তার নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে? কিন্তু পিউপার সততা আর নিরন্তর প্রয়াস এসবই বাস্তবায়িত করেছে। গুরুগম্ভীর মান্ধাতা আমলের পড়াশোনা নয়, খেলার ছলে নানারকম শিক্ষণীয় প্রোজেক্টের মাধ্যমে মানুষ গড়ার কাজে পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের কর্মীবৃন্দ নিজেদের সঁপে দিয়েছেন। ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্নে বিভোর, সুন্দরবনের ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়েরা এখন আর স্কুলকে ভয় পায় না, পড়াশোনার কথায় মুখ লুকোয় না। তারা এখন পিউপার বিশ্বস্ত হাত ধরে এক-একজন খুদে বিজ্ঞানী।
কিন্তু অমলবাবুদের সংস্থা শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। সুন্দরবনে ফি-বছরে বন্যা পরিস্থিতি হয়। ক্ষেতজাঙাল ভেসে যায় লোনা জলে, চাষ নষ্ট হয়। কৃষকদের বিপুল ক্ষতির পরিমাণ সহ্য করতে হয়। এই ক্ষেত্রেও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ডক্টর অমলেশ মিশ্র জানান, ধানচাষবিষয়ক গবেষণায় তারা ১৫ জাতের ধান নির্দিষ্টরূপে চিহ্নিত করেছেন যা লোনা জলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যেমন নোনা মালাবতী, তালমুগুর, কেরালা সুন্দরী প্রভৃতি ধান। সাগরদ্বীপ ছাড়াও পাথরপ্রতিমা অঞ্চলে গোবর্ধনপুর আর রক্ষাকালীর মতন প্রত্যন্ত গ্রামে এই নিয়ে কাজ করছে পিউপা। গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়নের প্রশ্নেও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ পিছিয়ে নেই। শিক্ষা, স্বনির্ভর প্রকল্প ও জলবায়ু সংরক্ষণের মতন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মহিলাদের প্রধান অংশীদার করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে। যেমন ২০১২ সালে অনিমা দাস, যিনি সাগরদ্বীপে ‘কৃষ্ণা-সুচিত্রা স্মৃতি পঠন কেন্দ্রের’ শিক্ষিকা, বাংলা বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুরস্কৃত হয়েছেন শ্রেষ্ঠ উপস্থাপনার জন্য। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ বান্ধব প্রজেক্টে ২০১৩ সাল নাগাদ দলিত ছাত্রী হাসি পাত্র নিজের কাজের জন্যে পুরস্কৃত হয়েছে, পেয়েছে শংসাপত্র।

অবহেলিত অঞ্চলে মানুষদের জৈব চাষবাসের নিয়মিত প্রশিক্ষণও দেয় পিউপা। তরল স্টার্চ, গোবর, কেঁচো, নিমপাতা, মাছের টনিক প্রভৃতি দ্রব্যের সঠিক ব্যবহার কেমনভাবে জৈব উপায়ে চাষের ফলন বাড়ায়, এই নিয়ে চাষীদের অবহিত করা হয়।
প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে জীবিকা নির্বাহের জন্যে। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও চেতনায় ভর করে সেই প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া মানুষের কর্তব্য। পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের যাত্রা সবসময়ে মসৃণ হয়নি। কর্মীর অভাবে, টাকাপয়সার অভাবে, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের গতি রুদ্ধ হয়েছে। এরপরেও হাল ছাড়েননি পিউপার সদস্যরা। বরং রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়ে নতুন ভাবে উজ্জীবিত হয়েছেন। বর্তমানে গোটা রাজ্যের ৫০-এর বেশি স্কুলে তারা কর্মযজ্ঞ ছড়িয়ে দিয়েছেন। সুন্দরবনকে আরও সুন্দরভাবে গড়ে, পশ্চিমবঙ্গকে আরও পরিবেশবান্ধব বানিয়ে, পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ নতুন প্রজন্মকে একটা শান্ত পৃথিবী উপহার দিতে চাইছে, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে একই সূত্রে মানুষ নিজেকে বাঁধতে পারে।
