
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৩১
আমাদের জাহাজের অন্যতম রেজিমেন্টাল অফিসার ওয়েন ম্যাকগি (Wayne McGee) নতুন চাকরিতে ঢুকেছে। আফ্রিকান আমেরিকান খুবই নরম স্বভাবের এই মানুষটি জাহাজের ব্যান্ড মাস্টারও বটে। অবসর সময় দেখেছি ওয়েন বাঁশি বাজায়। অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রেও হাত বেশ পাকা। রেজিমেন্টাল অফিসার বলতে যে দাঁতখিচুনে রাগী চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ওয়েন সেই ধাঁচের নয় একেবারেই। তা এই জাহাজে ওয়েনের অন্যতম দায়িত্ব হল সব বন্দরে যা কিছু দ্রষ্টব্য আছে তার খোঁজখবর নেওয়া আর ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য বেড়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। একবার সান জুয়ান (San Juan) বন্দরে ওয়েনের মুন্সিয়ানায় ঘোড়ায় চড়ে পুয়ের্তো রিকোর (Puerto Ricor) রেইনফরেস্ট দেখার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিছু ডলারের বিনিময়ে, ঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুরে নিতে পারো বৃষ্টি ভেজা গহীন জঙ্গল। কিছু উৎসাহী ছাত্র আর প্রফেসারের সাথে আমিও নাম লিখিয়েছিলাম এই দলে। ঠিক সকাল ৮:৫০ -এ আমাদের তৈরি থাকতে বলা হয়েছিল। ঘোড়ায় চড়ার উপযোগী পোশাক পড়ে মনে মনে ঘোড়াটির দীর্ঘায়ু কামনা করে ৮:৪৫ -এ গেটের কাছে পৌঁছে দেখি ওয়েন লিস্ট ধরে মিলিয়ে নিচ্ছে যাত্রীদের নাম। এক বিশাল শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বাস উপস্থিত হল আমাদের গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার সাথে বাসে উঠলো ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেরিন ট্রান্সপোর্টেশন ডিপার্টমেন্টের দুইজন শিক্ষক আর গোটা চল্লিশেক ছাত্র-ছাত্রী। চালক আমাদের স্প্যানিশ ভাষায় সুপ্রভাত, আপনাদের যাত্রা শুভ হোক, এইসব বলে রওনা দিল জঙ্গল অভিমুখে। আস্তে আস্তে পুরনো সান জুয়ান (San Juan) আর তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ানো জাহাজগুলিকে পিছনে ফেলে আমরা হাইওয়ে ধরে এগোলাম লুকুইলো (Luquillo) বলে পাহাড়তলির এক বসতির উদ্দেশ্যে। আমাদের গন্তব্যস্থল হ্যাসিন্ডা কারাবালি (Hacienda Caraballi) নামে এক ঘোড়ার খামার। বাসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি চেনা চেনা গাছপালা। রাস্তার পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে আম গাছ, নারকেল গাছ, পেঁপে আর কলা গাছ। ঘন সবুজ পাতায় ভরা গাছের মাথায় ফুটে রয়েছে টকটকে লাল পলাশ আর কৃষ্ণচূড়া। পর্যটন এই দেশের মুখ্য আমদানির পথ তাই পর্যটকদের চোখে আরাম দিতে রাস্তার দুই ধারে সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ করে বসানো হয়েছে ঘন সবুজ আর গাঢ় মেরুন পাতাবাহার গাছ। সবুজ মেরুনের এই বিস্তীর্ণ পাতার কার্পেট দেখে মনে হচ্ছিল এখানকার ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার বুঝিবা মোহনবাগান সমর্থক। রাস্তার পাশের একতলা বা বড়োজোর দোতলা বাড়িগুলির মাথায় রয়েছে প্লাস্টিকের হালকা নীল রঙের জলের ট্যাঙ্ক। ছোটো বাড়িগুলির সামনে এক চিলতে করে বাগানে সূর্যস্নান সেরে ফুটে রয়েছে রক্তজবা, কাঠালি চাঁপা, রঙ্গন। প্রকৃতি কেমন নিজের খেয়ালে একই রকম ফুল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে উত্তর আর দক্ষিণ গোলার্ধের নিরক্ষবৃত্তের অঞ্চলগুলি।
এক বিশাল শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বাস উপস্থিত হল আমাদের গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার সাথে বাসে উঠলো ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেরিন ট্রান্সপোর্টেশন ডিপার্টমেন্টের দুইজন শিক্ষক আর গোটা চল্লিশেক ছাত্র-ছাত্রী। চালক আমাদের স্প্যানিশ ভাষায় সুপ্রভাত, আপনাদের যাত্রা শুভ হোক, এইসব বলে রওনা দিল জঙ্গল অভিমুখে।
ক্রমশ বাসের জানলা দিয়ে দেখা গেল সবুজ চাদর জড়ানো পাহাড়গুলি যারা রিও গ্রেনেডের দক্ষিণে ক্যারিবিয়ান ন্যাশনাল ফরেস্ট এল ইউনুকুকে (El Yunuque) পাহারা দিয়ে রেখেছে। পাহাড়গুলির গাল, মাথা, কপাল আলতোভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে, বৃষ্টির বার্তাবাহী থমথমে মেঘগুলি। মনে হল ঠিক এমনই মেঘ দেখেছিলাম কৈশোরে, চেরাপুঞ্জিতে।

“বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চড়ে
পরান্মুখ সবুজ নালি ঘাস
দুয়ার চেপে ধরে…”
ঘণ্টাখানেকের ভেতর আমাদের বাস পৌঁছল সেই ঘোড়ার খামারে। বাতাসে আস্তাবলের গন্ধ, খামারের সামনে শুয়ে থাকা অলস বাদামী লোমওয়ালা কুকুর আর পরিত্রাহী চিলচিৎকারে কান ফাটানো এক মোরগ বলে দিচ্ছিল আমরা শহুরে সান জুয়ানকে (San Juan) অনেক পিছনে ফেলে এসেছি। রেইনফরেস্ট ইনের মালিক আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে একটা ফর্ম সই করিয়ে নিলেন। তাতে লেখা আছে যে, আমরা যদি কেউ ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে চিৎপটাং হয়ে পড়ি বা অন্য কোনো অঘটন ঘটাই তাহলে সেই সব হ্যাপার জন্য হ্যাসিন্ডা কারাবালি (Hacienda Carabali) দায়ী হবে না। এর পরে ঠিক অভিনেতা চিন্ময় রায়ের মতো দেখতে একজন খুব রোগা লোক এক বিশাল ঘোড়াকে সামনে এনে আমাদের ছোটোখাটো লেসন দিলেন। কীভাবে তরাং করে ঘোড়ার জিন ধরে তার পিঠে চাপতে হবে, কেমন করে ছোটাতে হবে, কেমন করে ডাইনে-বাঁয়ে যেতে হবে, ঘোড়া থামাতে হবে, ঘোড়া থেকে নামতে হবে ইত্যাদি।

এইসব কায়দা দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। ভাবছিলাম, আমার মতো ল্যাজে-গোবরেদের জন্যেই হ্যাসিন্ডা কারাবালি (Hacienda Carabali) ওই ফর্মের ব্যবস্থা করেছে। মেরিন ট্রান্সপোর্টেশনের প্রফেসরও মিনমিন করে জানালেন ওঁর পিঠে একটা খিঁচ ব্যথা আছে। এক লাফে তরাং করে উনি বোধহয় ঘোড়ায় চাপতে পারবেন না। এর পরে চিন্ময় বললেন যে, যারা পাকা ঘোড়সয়ার তারা ডানদিকে দাঁড়াও আর যারা জীবনে ঘোড়ায় চাপোনি তারা বামদিকে। ছোটোবেলায় দার্জিলিংয়ের ম্যালে জীর্ণশীর্ণ ঘোড়ায় চড়ার কথা বেমালুম চেপে গিয়ে আমি সুড়সুড় করে গেলাম বামদিকের কাঁচুমাচু মুখের মানুষগুলোর দিকে। একে একে পাকা ঘোড়সওয়ারিদের ঘোড়া এল আর তারা অবলীলাক্রমে কোনো অঘটন না ঘটিয়ে সেই তেজি স্বাস্থ্যবান ঘোড়াগুলিতে চেপে বসলো।
রেইনফরেস্ট ইনের মালিক আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে একটা ফর্ম সই করিয়ে নিলেন। তাতে লেখা আছে যে, আমরা যদি কেউ ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে চিৎপটাং হয়ে পড়ি বা অন্য কোনো অঘটন ঘটাই তাহলে সেই সব হ্যাপার জন্য হ্যাসিন্ডা কারাবালি দায়ী হবে না।

সওয়ারিদের নিয়ে ঘোড়াগুলি নিরুৎসাহ মুখ করে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। চিন্ময় বলেছিলেন যে, ঘোড়াগুলির নিজস্ব পেকিং অর্ডার আছে। ওরাই ঠিক করে কে আগে যাবে, কে দলের মাঝখানে থাকবে আর কে পেছনে যাবে। আমরা যেন ওদের এই ব্যাপারে একেবারেই না ঘাঁটাই। অবশেষে আমার ডাক পড়লো। আমার ঘোড়াটি ঈশ্বরের কৃপায় দেখলাম যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট আর ঘন বাদামি রঙের। জানলাম তার নাম হলো, নেগ্রিটা (Negrita)। জয় মা বলে পা জিনের আংটায় লটকে একটা হ্যাচকায় নিজেকে নেগ্রিটার (Negritar) পিঠে চাপালাম কোনোক্রমে কেলেঙ্কারি না করে। একবার পিঠে উঠে পড়তে পারলে আর তেমন দুশ্চিন্তা থাকে না।
এর পরে আমরা লাইন করে রওনা দিলাম গহীন জঙ্গলের দিকে। একটু পরেই বুঝলাম পিকিং অর্ডারে নেগ্রিটা (Negrita) হল ওদের নেত্রী। কথা নেই বার্তা নেই বেশ জোরে সকলকে পিছনে ফেলে সে আগে আগে হালকা স্পিডে ছুটতে লাগলো। এই প্রচেষ্টায় জঙ্গলের গাছের কয়েকটা নিচু ডালপালা আমাকে সজোরে চপেটাঘাত করায় পিছনের ফিচেল ছাত্ররা হাসতে হাসতে প্রায় ঘোড়া থেকে পড়ে যায় আর কি! প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও একটু পরে রাস টেনে নেগ্রিটাকে (Negrita) বশে এনে ঘন ঝোপঝাড় দেখলেই মাথা নিচু করে চলার কায়দাটা বুঝে গেলাম। আস্তে আস্তে আমরা পৌঁছালাম গভীর জঙ্গলে যেখানে গলাগলি করে দাঁড়ানো গাছের পাহারায় সূর্য দেবেরও প্রবেশ নিষেধ। কানে আসছিল নানারকম ঝিঁঝিঁর আওয়াজ, পাখির ডাক আর অদেখা কিছু জীবের পাতার ওপরে পা ফেলার শব্দ। দেখতে পেলাম নানা রঙের পাখি আর বিশালাকায় গিরগিটি। প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এসে পৌঁছালাম এক ঝর্ণার ধারে। স্বচ্ছ জলে নিচের পাথরগুলি দেখা যাচ্ছে আর টাটকা রাঙা পলাশ ঝরে পড়ে ভেসে যাচ্ছে স্রোতের সাথে বন্ধুত্ব করে। ছাত্রদের ভেতর অনেকেই সেই ঝরনায় ঝাঁপিয়ে, সাঁতার কেটে খুব খানিকটা লাফালাফি করে ফিরে গেল নিজস্ব শৈশবে। আর ঠিক তখনই ঝরনার জলে, পলাশের মাথায়, শ্যাওলায় পিচ্ছিল পাথরের বুকে বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি নামলো। গভীর জঙ্গলে বৃষ্টি নামলো ঘোড়ার ক্ষুরের ধুলো ভিজিয়ে। রুক্ষতাকে শাসন করে, কোমলতায় অবগাহন করে, রেইন ফরেস্টের অতিথিশালার জিয়নকাঠি বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি নামলো অন্তরে বাহিরে।

“দুপুরে রুক্ষ গাছের পাতার
কোমলতাগুলি হারালে-
তোমাকে বকব, ভীষণ বকব
আড়ালে।
যখন যা চাই তখুনি তা চাই!
তা যদি না হবে তাহলে বাঁচাই
মিথ্যে, আমার সকল আশায়
নিয়মেরা যদি নিয়ম শাসায়
দগ্ধ হাওয়ার কৃপণ আঙুলে-
তাহলে শুকনো জীবনের মূলে
বিশ্বাস নেই, সে জীবন ছাই!
মেঘের কোমল করুণ দুপুর
সূর্যে আঙুল বাড়ালে-
তোমাকে বকব, ভীষণ বকব
আড়ালে।”
চলবে…
________
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
