
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২৮
আজ সারাদিন সমুদ্র বড়ো অস্থির। ২৫ নট গতিবেগে হাওয়া দিচ্ছে আর তার ঠেলাঠেলিতে ঢেউয়েরাও রুখে দাঁড়াচ্ছে মাথায় ফেনার মুকুট পরে। উড়ুক্কু মাছেরা এত গণ্ডগোলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে অনির্দিষ্ট ভাবে। বারান্দায় দাঁড়ালে চোখে মুখে ঢেউয়ের ছিটোনো জলের ঝাপটা এসে লাগে। কোনো এক অদৃশ্য যোগসূত্রে একাত্ম হওয়া যায় বাইরের পাখিটির সঙ্গে।
‘এখন বাঁশি বাজানো যাবে
কেননা বুকের ভিতর অনেকটা ফাঁপা লাগছে
আর বাইরের হাওয়াও বেশ মজবুত…’
আমরা এখন ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের মাঝখানে। ৭৫০,০০০ স্কোয়ার মাইলের এই সমুদ্রের চারিপ্রান্ত ঘিরে আছে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান আইল্যান্ড, পানামা আর দক্ষিণ আমেরিকা। এই সমুদ্রের নামকরণ হয়েছিল ক্যারিব ইন্ডিয়ানদের কথা মাথায় রেখে, যারা একসময় এখানে বসতি গড়েছিল। কুরাসাও-এর সময় আমেরিকার তুলনায় এক ঘণ্টা এগিয়ে। তাই গতকাল জাহাজে ঘোষণা করা হয়েছিল যে আমরা যেন রাতে হাতের ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে নিই। আজকে তাই এক ঘণ্টা কম ঘুমিয়ে বেশিরভাগ ছাত্রই ক্লাসে ঢুলছিল। সেটা যে আমার পড়ানোর জন্য নয়, তা অবশ্য জোর গলায় বলা যাবে না! আজকে ক্লাস শেষ হতে সকলেই খুব উল্লসিত দেখলাম।

সমুদ্রের উপর উড়োজাহাজ
দীর্ঘ দুই সপ্তাহ একটানা পড়ানোর পর আগামীকাল শুরু হবে ছুটির চারটে দিন। আগামীকাল অনেকদিন পরে আমরা একটা বন্দরে ভিরব। জাহাজে বেশ একটা চাপা উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে আজ। অনেক ছাত্র-ছাত্রী এই প্রথম আমেরিকা ছেড়ে অন্য কোনো দেশে পা ঠেকাবে। এইসব দ্বীপে সুরা পানের ন্যূনতম বয়স ১৮। আমেরিকায় সেটা ২১। তাই বন্দরে জাহাজ ভেরা মাত্র প্রচুর মদ খাওয়ার পরিকল্পনা করেছে ফার্স্ট আর সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রীরা। এই সময় জাহাজের মেডিকেল স্টাফ আর কমান্ডার রোজাকের দল বিশেষ উদ্বিগ্ন থাকেন। বেসামাল ছাত্ররা সব ঠিকমতো জাহাজে না ফেরা পর্যন্ত তারা নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। মদে যাদের তেমন রুচি নেই তারাও রীতিমতো উল্লসিত… নতুন দেশ দেখা, নতুন মানুষ দেখা, নতুন রকম খাবার খাওয়া (বিশেষ করে দুই হপ্তা জাহাজের সেদ্ধ পাস্তা, সবজি আর মাংস খাওয়ার পরে)… সেটাই বা কম কী!
৭৫০,০০০ স্কোয়ার মাইলের এই সমুদ্রের চারিপ্রান্ত ঘিরে আছে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান আইল্যান্ড, পানামা আর দক্ষিণ আমেরিকা। এই সমুদ্রের নামকরণ হয়েছিল ক্যারিব ইন্ডিয়ানদের কথা মাথায় রেখে, যারা একসময় এখানে বসতি গড়েছিল।

ছাত্রদের সঙ্গে
এর মধ্যে পোলিশ প্রিন্সকে চন্দন সাবান দেওয়া হয়ে গেছে। ওর ইংরেজিটা একটু ভাঙা ভাঙা। আমাকে বললো, ‘বাণী, আই ডু নট ওয়ান্ট টু টেক ফ্রম ইউ…’। আমি ভাবলাম, সেরেছে আমার উপহার নেবে না বলছে নাকি! আর কয়েকবার চেষ্টার পর বোঝা গেল যে বলতে চাইছে আমার যদি সাবান কম পড়ে, সেই ভেবে ভাগেরটা নিতে অপ্রস্তুত বোধ করছে। আমি ওকে নিশ্চিন্ত করে বললাম যে আমার এই জাহাজের দৈনন্দিন কাক-স্নান সারবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সাবান আছে। তাই ও যেন এই নিয়ে একেবারেই ইতস্তত না করে। তখন এক গাল হেসে, সেটা পকেটে পুরলো। আজ খাবার টেবিলে দেখি কান এঁটো করে হাসছে আর গায়ে ভুরভুর করছে মাইসোর স্যান্ডাল সোপ।
এইসব দ্বীপে সুরা পানের ন্যূনতম বয়স ১৮। আমেরিকায় সেটা ২১। তাই বন্দরে জাহাজ ভেরা মাত্র প্রচুর মদ খাওয়ার পরিকল্পনা করেছে ফার্স্ট আর সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রীরা।
পোলিশ প্রিন্স জাহাজে ওর সাইকেল নিয়ে এসেছে। যখনই আমাদের জাহাজ কোনো বন্দরে পৌঁছয় সে একটা খুব আঁটোসাঁটো স্প্যানডেক্স-এর বাইকিং স্যুট পরে সাইকেল নিয়ে নেমে যায় আর সাইকেল করে সেই জায়গাটা চষে বেড়ায়। এটা খুবই ভালো পরিকল্পনা, তবে নাইলনের ওই টাইট বডি স্যুট পরে ওকে মনে হয় অরণ্যদেবের রোগাসোগা, টাকমাথা পিসেমশাই।

কার্ক
কাক-স্নানের কথায় মেরিন ট্রান্সপোর্টেশন দপ্তরের অধ্যাপক কার্কের রসিকতা মনে পড়ল। কার্ককে দেখতে একেবারে ব্রুস উইলিসের মতো। মাথা পরিষ্কার করে কামানো, দিনে হাজারবার ডন বৈঠক করা মাংসপেশি খোদাই চেহারা। বাইসেপে, ঘাড়ে, পায়ে নানা রকম উল্কি করা… সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা করে সকলের সঙ্গে। তা আমার যখন শাওয়ার কাজ করছিল না আর আমার গায়ের তথাকথিত বোঁটকা গন্ধ নিয়ে কমান্ডার রোজাক থেকে জাহাজশুদ্ধু সকলে হাসাহাসি করছিল তখন কার্ক আমাকে বলেছিল, “বাণী, ইউ ক্যান ইউজ মাই শাওয়ার ইফ ইউ ওয়ান্ট… বাট রিমেম্বার, ইউ হ্যাভ টু টেক দিস ডিল কুইকলি… দেয়ার ইস এ স্মল উইন্ডো অফ অপারচুনিটি… ইফ ইউ ওয়েট টু লং, মাই গুডউইল উইল বি ওভারওয়েল্মড বাই ইওর স্টিংক…” বলে নিজের রসিকতাতেই পেট চেপে গড়াগড়ি যায় আর কি!

সমুদ্রে সূর্যের আলো
ক্যারিব সাগরে সন্ধে নামছে। একটু পরেই জানলার পর্দা টেনে দিয়ে বারান্দায় দাঁড়াবো। সূর্যাস্তের মুখোমুখি হবো। আগামী কয়েকদিনের চিঠিতে থাকবে নতুন দেশের কথা… তবে এখনও সে সময় হয়নি। এখন কেবল বারান্দায় দাঁড়াবো সেই অস্থির হাওয়ার সামনে, আর হয়তো একটু সুস্থির হবো…
“এখন লেগেছে গায়ে বড়ো বেশি ব্যক্তিগত হাওয়া
এখন উড়েছে সব ধুলো
আকাশের দিকে… আর পথেরও ধমনী দেয় সাড়া
ভুলে যেও… সবকিছু ভুলো…”
চলবে…
__________
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
