
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২২
জামাইকার মন্টেগো বে (Jamaicar Montego Bay)-তে আগে কখনও আসিনি। ইতিহাসে পড়েছিলাম ১৪৯০ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের এই দেশ আবিষ্কারের কথা। তিনি নাকি মন্টেগো বে-র নীল সমুদ্র দেখে নাম দিয়েছিলেন Golfo de Buen Tiempo (Fair Weather Gulf)। পরবর্তীকালে স্প্যানিয়ার্ডরা এখানে বেশ জম্পেশ করে গোরুর মাংস, চামড়া আর চর্বি রপ্তানির ব্যবসা চালু করে। তারই এর নাম দেয় Manteca (Lard), যার অর্থ চর্বি। ১৫১১ থেকে ১৬৫৫ সাল পর্যন্ত জামাইকা ছিল স্পেনের কুক্ষিগত। তার পরে সিল অলিভার করময়েল কষে যুদ্ধ করে এই নীল সমুদ্রে চমকানো বৈদুর্যমনির মতো দেশটিকে বিলেতের রাজমুকুটে কোহিনূরের ঠিক পাশটিতে বসিয়ে দেন। তখন ছিল আখের ব্যবসার রমরমা। ক্রীতদাসদের হাড় ভাঙা খাটুনিতে আখের রস থেকে তৈরি হতো চিনি, গুড় আর রাম। জাহাজ বোঝাই করে মন্টেগো বে থেকে সেগুলি পাঠানো হতো সুদূর ইউরোপের বন্দরগুলিতে। ১৮৩২ সালে ক্রীতদাসরা বিদ্রোহ করে। ব্যাপটিস্ট ওয়ার-এর সাংঘাতিক যুদ্ধে রাঙা হয় মন্টেগো বে-এর শান্ত উপকূল। এই শহরেই ফাঁসি হয় ক্রীতদাস নেতা স্যামুয়েল সার্প-এর। অবশেষে ১৯৬২ সালে ইংরেজদের হাত ছাড়িয়ে জামাইকা স্বাধীন হয়।

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রা
আরও পড়ুন: ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : মহাকাশ ভ্রমণ
আমাদের জাহাজ কেনেডি যখন ছাত্রছাত্রী বোঝাই হয়ে মন্টেগো বে-তে এসে নোঙর ফেললো তখন তার নীল জল, মিঠে হাওয়া, নারকেল গাছের সারি দেওয়া শান্ত চেহারা দেখে মালুম হচ্ছিল কেন কলম্বাস সাহেব এর নাম দিয়েছিলেন Golfo de Buen Tiempo (Fair Weather Gulf)। প্রথমেই যেটা খেয়াল করলাম তা হল, এখানকার মানুষের গা ছাড়া ঢিলেঢালা হাসিখুশি ভাব। কিছু জিজ্ঞেস করলেই তার উত্তর সাধারণত হবে Ya Maan, সে তুমি পুরুষ বা নারী যাই হওনা কেন! এছাড়াও খুব বলতে শুনেছি, “নো প্রবলেম ম্যান”। জামাইকানরা বিশ্বাস করে যে, In life there are no problems, there are only situations that you have to deal with. (এই জীবনে কোনো সমস্যা নেই কেবল কয়েকটি পরিস্থিতি আছে যা তোমাকে মোকাবিলা করতে হবে)। এহেন গা এলানো জীবনবোধ শুনে আমি তো মহাখুশি। মনে মনে একঝলকে নিজেকে দেখে নিলাম মিটিমিটি হেসে মাথায় জটার বিনুনি ঝুলিয়ে সমুদ্রের তীরে নারকেল গাছের ছায়ায় বসে Reggae বাজনা শুনছি আর ঘাড় দুলিয়ে বলছি, Ya Maan No problem Maan…!
প্রথমেই যেটা খেয়াল করলাম তা হল, এখানকার মানুষের গা ছাড়া ঢিলেঢালা হাসিখুশি ভাব। কিছু জিজ্ঞেস করলেই তার উত্তর সাধারণত হবে Ya Maan, সে তুমি পুরুষ বা নারী যাই হওনা কেন! এছাড়াও খুব বলতে শুনেছি, “নো প্রবলেম ম্যান”।
ডকের গেটের বাইরে ট্যাক্সির সারি। ট্যাক্সিগুলি ছোটো মিনি ভ্যানের মতো যাতে আট দশ জন লোক ধরে। জাহাজঘাটা থেকে মন্টেগো বে-এর জমায়েত পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে। যেতে মাথাপিছু ভাড়া পাঁচ ডলার। যে তিনদিন আমাদের সাতশো মানুষ বোঝাই জাহাজ এখানে নোঙর ফেলেছিল সেই দিনগুলোতে ট্যাক্সিচালকদের আমদানি নেহাৎ মন্দ হয়নি, তা বলাই বাহুল্য। জামাইকাতে বোধহয় আমেরিকার মতো মদ খাবার কোনোও নূন্যতম বয়স নেই। প্রথম দিনেই দেখলাম পালে পালে ছাত্ররা রেস্তোরাঁতে ভিড় করে লাগামছাড়া রামের জোয়ারে ভাসতে লেগেছে। কিছু বলতে গেলেই ঢুলুঢুলু চোখে লটরপটর করতে করতে Ya Maan No problem Maan…!
যে কোনো নতুন দেশে গেলেই আমার খুব ইচ্ছে করে সেই দেশের যতটা সম্ভব দেখে ফেলতে। প্রথমদিনেই মন্টেগো বে শহরটা মোটামুটি চেনা হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু আমার মদ গাঁজায় আসক্তি নেই অথবা গরম বালির ওপরে সিন্ধুঘোটকের মতো উপুড় হয়ে রোদ পুইয়ে, গায়ের চামড়া কালিকুষ্টি করেও তেমন সুখ পাই না, তাই ঠিক করলাম যে দ্বিতীয় দিনেই বাসে চেপে কিংস্টন শহরটা দেখে আসবো। শুনলাম সে নাকি জামাইকার এক্কেবারে অন্য প্রান্তে, যেতে আসতে আট ঘণ্টা। শুনেই তো আমার সহকর্মীরা আঁতকে ওঠে… Not Happening!! বলে দে হাওয়া। অতএব সাত সকালে ঝটপট ডিম, রুটি, কমলার রস খেয়ে ঘোর বেগুনি রঙের পোশাক পরে, একাই পৌঁছে গেলাম বাস ডিপোতে। Knutsford বাস কোম্পানির হাসিখুশি চালক গ্রেগ হলো সারথি। টিকিট কেটে গ্যাট হয়ে বসলাম একেবারে সামনের সিটে। গ্রেগ সকলকে বলে কয়ে নিলো যে বাস আগামী চার ঘণ্টায় দুটো জায়গায় ঠিক দশ মিনিটের জন্য থামবে। আমরা যদি হাত পা মেলতে গিয়ে ঠিক সময়ে না ফিরি তাহলে আমাদের ছাড়াই সে রওনা দেবে গন্তব্যস্থলের দিকে।

জামাইকান চিকেন
গুরুগম্ভীর সতর্কবাণীর ঠিক পরেই একটা মিঠে Reggae বাজনা চালিয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে বাস চালাতে শুরু করলো। বাস চলছে সমুদ্রের ঠিক ধার ঘেঁষে। সে ভারী সুন্দর দৃশ্য। একপাশে নীল সাগর মিশে রয়েছে ঝুঁকে পড়া আকাশের সঙ্গে, আর অন্য পাশে পাহাড় আর তার গায়ে ছোটো ছোটো বাড়িতে গেরস্থালির চিহ্ন। সামনে এক চিলতে বাগান, রোদ্দুরে শুকোতে দেওয়া কাপড় চোপড়, উঠোনে ঘুমিয়ে থাকা ছাগলছানা, ফল ফলন্ত কলাগাছ। সেইদিন রবিবার বলে দেখছিলাম সাদা lacer ফুল তোলা গাউন পরে গিন্নিবান্নিরা ছোটো ছেলে মেয়ের হাত ধরে চার্চের উদ্দ্যেশে পথে বেড়িয়েছেন। তাদের মাথায় সাদা ফুল তোলা টুপি, পায়ে সাদা মোজা আর কালো জুতো। প্রতিটা ছোটো ছোটো শহরেই দেখলাম একাধিক চার্চ। খ্রীষ্ট ধর্মের ভিতরেও নানান মতের অলিন্দ। সেখানেও বৈষ্ণব আর শাক্তের ভেদাভেদ বোধ হয়। তাই ভিন্ন মতালম্বীরা আশ্রয় পেয়েছে ভিন্ন চার্চের ছাদের তলায়। বুঝলাম এই চিনির রসে ভিজে থাকা Ya Maan No problem Maan-এর দেশেও আষ্ঠেপৃষ্ঠে রাস টানা ধর্মের লাগাম। প্রতি রবিবার তাই পরম পিতার কাছে সপরিবারে প্রার্থনা আর গোটা হপ্তার পাপস্খলন।
চলবে…
____________
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
