ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : সবুজ স্পন্দন

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ১৮

গত পর্বের পর

রোদের তাপ বাড়ছে। সকালে যে ছিল কোমল প্রদীপের মতো, সে এখন হাজার আলোর রোশনাই আর আগুন নিয়ে হনহনিয়ে এগোচ্ছে মধ্য গগনের দিকে। লাল সেলাম রোদে সেঁকা ২৫০ ধরে চলেছে দক্ষিণ পশ্চিমে… তার চাকায় এখন ঘরে ফেরার সুর… কার্লোস জীপ রেন্টালে অপেক্ষা করে রয়েছে নতুন সওয়ারী। ফিরতি পথে মনটা বড়ো উচাটন ছিল। এই স্বপ্নের মতো দ্বীপ, ময়ূর পেখম জল, আচমকা আবিষ্কৃত শঙ্খবেলা, বালির তাপের জিয়নকাঠিতে কাছিমের প্রাণ… এই সব ছেড়ে ফিরে যেতে হবে দৈনন্দিন ব্যস্ততায়… ফিরে যেতে হবে এক আগ্রাসী শৈত্যে… ফিরে যেতে হবে নিরবিচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতায়…এছাড়া রয়েছে দুপুর একটার ফেরী ধরবার অনিশ্চয়তা… ফাহার্দয় পৌঁছে বাহন পাবার ডামাডোল… দর কষাকষি… এই সব চিন্তা হৈ-হৈ করে বল্লম উঁচিয়ে তেড়ে আসছিল মগজের কোষে কোষে। একটা ছবি মাথায় ঘুরছিলো… সান জুয়ানের ফাঁকা বন্দর… আমাদের জাহাজ টিএস কেনেডি কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে উত্তরপানে… লাল সালোয়ার কামিজ পরণে, লাল ফুলতোলা কাপড়ের ব্যাগ হাতে আমি শুনশান বন্দরে ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অপরিচিত পথচারীরা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

একটা ছবি মাথায় ঘুরছিলো… সান জুয়ানের ফাঁকা বন্দর… আমাদের জাহাজ টিএস কেনেডি কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে উত্তরপানে… লাল সালোয়ার কামিজ পরণে, লাল ফুলতোলা কাপড়ের ব্যাগ হাতে আমি শুনশান বন্দরে ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অপরিচিত পথচারীরা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

যখনই এই সব চিন্তাগুলি মাথায় ভিড় করে আসে… যখনই দুঃখবোধ চেতনাকে আচ্ছন্ন করে… যখনই কষ্ট হয়… তখনই আমি গিয়ে প্রকৃতির হাত ধরি। সে আমাকে তার রূপ রস শব্দ গন্ধ দিয়ে এক আশ্চর্য মায়ায় ভুলিয়ে রাখে। আমি চোখ রাখলাম ময়ূর পেখম জলে… কান রাখলাম ঢেউয়ের সমর্পনে… মন রাখলাম দ্বীপের মায়ায়…। কোথায় যে সাগর শুরু আর আকাশ শেষ ঠিক ঠাহর হয় না… আর ওমনি বল্লমগুলি গুটিয়ে পাটিয়ে চিন্তাগুলি কোথায় গিয়ে লুকোলো কে জানে।

কার্লোস জীপ্ রেন্টালের সঙ্গে আগে থেকেই ব্যবস্থা করা ছিল। তারা লাল সেলামকে ভালো করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝে নিয়ে একটা জীপে করে আমাদের কুলেব্রা ফেরীঘাটে পৌঁছে দেবার বন্দোবস্ত করলো। এবার আর উল্কির উল্কাপাত নয়… ভারী সুবোধ এক কিশোর ধীরে সুস্থে গল্প করতে করতে জীপ চালাচ্ছে।

“ভাই আমরা একটার ফেরীর টিকিট পাব তো?”

“নিশ্চয় পাবেন। কোনো চিন্তা করবেন না। বেশিরভাগ ট্যুরিস্ট এখানে সারা দিন কাটিয়ে সন্ধের ফেরী ধরে… আপনাদের কোনই অসুবিধে হবে না।”

“ভাই এখানে দুপুরে হালকা কিছু খেয়ে নিতে চাই। কতক্ষণে ফাহার্দ পৌঁছব তার ঠিক নেই… সস্তাগন্ডার  কোনো ভালো জায়গা বাতলাতে পারো?”

“নিশ্চয় পারি… আপনারা ভিব্রা ভের্দেতে খেয়ে নেবেন। ফেরীঘাট থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। সেখানে যে একবার স্যান্ডুইচ খেয়েছে তার জন্ম সার্থক!”

“থ্যাঙ্ক ইউ ভাই। ফেরীর টিকিট কেটে তাহলে সেখানেই কিছু খেয়ে নেব।” সুবোধ আমাদের ফেরীঘাটে নামিয়ে হাসিমুখে হাত নেড়ে, ‘আবার এস কিন্তু’ বলে ফিরে গেল।


তখন ঠিক দুপুর বারোটা। কিছু মানুষ লাইন দিয়েছে টিকিট কাউন্টারের সামনে। আমরা তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একজন পুলিশগোছের লোক আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়াব, ঠিক কোথায় টিকিট কাটব এই সব নিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় বিস্তারিত নির্দেশ দিয়ে গেল। আমরা মাথা নেড়ে জানালাম যে সব বুঝেছি! লটর পটরকে কোথাও দেখলাম না। তার বোধহয় এখন রাত হয়েছে। টিকিট কেটে নিশ্চিন্ত হয়ে আমি আর জেনিফার এগোলাম সুবোধের বাতলে দেওয়া গন্তব্যে। ভিব্রা ভের্দে রেস্তোরাঁ…। ভিব্রা ভের্দের অর্থ সবুজ স্পন্দন। ফেরীঘাট থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। সেখানে যে একবার স্যান্ডুইচ খেয়েছে তার নাকি জন্ম সার্থক!

খুব ভালো লাগলো। অর্গ্যানিক খাবারের এই দোকানটি চালায় মধ্য তিরিশের এক দম্পতি নেস্টর আর আনাবেল। টাটকা মাছ, ফলমূল, শাক সবজি দিয়ে নিজের হাতে খাবার বানায় আনাবেল। নেস্টর খদ্দেরদের দেখাশোনা করে… টাকাকড়ির ব্যাপারগুলো ও সামলায়। ওরা নিজেরা রুটি তৈরি করে… ভালো চিজ আনায় সাগরপার থেকে… তরিবত করে তৈরি করে টাটকা স্যান্ডুইচ, ফ্রুট স্যালাড, এগ বেনেডিক্ট। একটা সার্ফ বোর্ডে চক দিয়ে মেনু লেখা রয়েছে। হাতে সময় অল্প। জেনিফার একটা আভকাডো স্যান্ডুইচ আর আমি একটা চিকেন স্যালাড স্যান্ডুইচ প্যাক করে দিতে বললাম… সঙ্গে টাটকা ফলের রস। বেশ তাড়াতাড়ি হাতে তৈরি রুটিতে মাল মশলা দিয়ে স্যান্ডুইচ বানিয়ে দিল আনাবেল। ফেরীঘাটের কাঠের বেঞ্চিতে বসে ভাবুক ভাবুক মুখ করে নীলের পানে চেয়ে সেই তরিবত করে বানানো খাবার খেলাম। এমন সময় কায়ো ব্লাংকো ভেঁপু বাজিয়ে জানান দিল… সময় হয়েছে… এবার যে যেতে হবে…

কায়ো ব্লাংকো চলেছে ফাহার্দ অভিমুখে… পেছন পানে ঝাপসা হয়ে আসছে কুলেব্রা ফেরীঘাট… সামনে  অগুন্তি ছোটো ছোটো দ্বীপ… সেখানে মানুষ বাস করেনা… সেখানে কেবল বাসা বাঁধে সামুদ্রিক পাখি… তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা এগোলাম… পেছনপানে রয়ে গেল সেই দ্বীপ… যার নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস… দীঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন।

অবশেষে কায়ো ব্লাংকো ভিড়ল ফাহার্দ জেটির পাঁচ নম্বর গেটের সামনে। সব যাত্রীর মনে হল নির্দিষ্ট গন্তব্য, বাহন বা ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের চলনের দৃপ্ততায় সেটা স্পষ্ট। আমি আর জেনিফার জেটি থেকে বেরোলাম চাতক পাখির অস্থিরতায়। বাইরে দু একটা ট্যাক্সি… কিন্তু তাদের সওয়ারী ঠিক হয়ে গ্যাছে। অন্য সকলে হাঁটা দিয়েছে কার পার্কের দিকে… তাদের নিজস্ব গাড়ি আছে। একটা ট্যাক্সিতে উঠবার উপক্রম করছিল দুটি অল্পবয়েসী মেয়ে। পরণে টি-শার্ট আর জিনস, পিঠে ব্যাকপ্যাক। হন্তদন্ত হয়ে লাল সালোয়ার কামিজ তাদের শুধলো…

“আচ্ছা আপনারা কি সান জুয়ান যাচ্ছেন?”

“হ্যাঁ… সান জুয়ান বিমান বন্দর”

“ওহ… আমরাও সান জুয়ান ফিরব তবে আমাদের গাড়ি নেই… আমরা কি আপনাদের সঙ্গে এই ট্যাক্সিতে যেতে পারি? ভাড়াটা ভাগাভাগি করে নেওয়া যাবে। আপনাদের বিমানবন্দরে পৌঁছে আমরা যাব জাহাজঘাটায়৷ বারতি যা লাগবে আমরা দিয়ে দেব।”

অবশেষে কায়ো ব্লাংকো ভিড়ল ফাহার্দ জেটির পাঁচ নম্বর গেটের সামনে। সব যাত্রীর মনে হল নির্দিষ্ট গন্তব্য, বাহন বা ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের চলনের দৃপ্ততায় সেটা স্পষ্ট। আমি আর জেনিফার জেটি থেকে বেরোলাম চাতক পাখির অস্থিরতায়।

মেয়ে দুটি নিজেদের ভেতরে মৃদু স্বরে প্রস্তাবটা বিবেচনা করে ট্যাক্সি চালকের সাথে কথা বলে নিল। সকলে রাজি। সকলের মাথা পিছু ২০ ডলার খরচা পরবে। আমরাও হাঁপ ছেড়ে নিজস্ব ব্যাক প্যাক আর লাল ফুলতোলা কাপড়ের  ব্যাগপত্র নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। 

গাড়ি চলেছে সান জুয়ান অভিমুখে। জানালার বাইরে হুশ হুশ করে সরে যাচ্ছে লোকিলো, রিও গ্রান্ডে, ক্যারোলিনা, হাসিয়েন্দা পাহাড়… আমি আর জেনিফার পেছনের সিটে বসেছি যার সঙ্গে তাকে ভারী মিষ্টি দেখতে… রজনীগন্ধার মতো স্নিগ্ধ চেহারা… পেশায় অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সের এয়ার হোস্টেস… বান্ধবীর সাথে ছুটি কাটাতে এসেছিল এই দ্বীপে। সামনের সিটে প্রৌঢ় চালকের পাশে যে বসেছে তার চাবুকের মতো শরীর… দেখলে লাল গোলাপের কথা মনে হয়… পেশায় পূর্ত দপ্তরের সরকারি অফিসার। আমরা পরস্পরের সাথে কথা কইছিলাম… ট্যাক্সি চালকও ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে তাল মেলাচ্ছিল। বলছিল ওর পরিবারের কথা ওর ছেলের কথা যার বয়েস নাকি পাশে বসা মেয়েটির মতোই হবে। 

জেনিফার অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল। হঠাৎ লাল গোলাপকে বলল,

“আচ্ছা আজকে ভোরবেলা কি তুমি এনসেনেদা হন্ডার পাশ দিয়ে দৌড়োচ্ছিলে? আমরা একটা লাল রঙের গল্ফ কার্ট চেপে যাচ্ছিলাম… মনে আছে?"

“ওহ… হ্যাঁ হ্যাঁ… ঠিক ঠিক… তাই ভাবছিলাম তোমাদের কোথায় দেখেছি…?”

লাল গোলাপ উচ্ছসিত হয়ে হাসতে লাগলো… হাসির দমকে কেঁপে উঠলো চাবুক শরীর… আর পাশে বসা সমবয়েসীর পিতার চোখের দৃষ্টি আর মনোযোগ পাল্টাতে লাগলো… আলগোছে…

তারপর… বিমানবন্দর… তারপর জাহাজঘাটা… তারপর আর এক যাত্রাপথ… আর এক গন্তব্য… আর এক শীত… আর এক বসন্ত… আর এক বিরহ… আর এক মিলন… কিন্ত সে সবের আড়ালে… নিভৃতে… থাকবে একটা ঝোঁকের মাথায় দেখে ফেলা দ্বীপ… যার নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস… দীঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন… যে বয়েস মানে না… আগুপিছু ভাবে না… যেখানে এক আকাশ ময়ূর পেখম জল মিশে যায় এক সমুদ্র আকাশে… যেখানে অপেক্ষায় থাকে শঙ্খমালা… যেখানে বালির তাপের জিয়নকাঠিতে কাছিমের প্রাণস্পন্দন… যেখানে গোলাপি তটভূমিতে জলের কিনারে কাত হয়ে শুয়ে থাকে জীর্ণ সংঘাত… এখন যেখানে ছবি আঁকে স্থানীয় মানুষ… ডিমে তা দেয় শঙ্খচিল… ঢেউ ভাঙে অভিমানে…

চলবে…

___________________________________

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia