
শৈশবের স্মৃতি ভাগ করছেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী, শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, সোহিনী সেনগুপ্ত
‘‘তখন ১৯৫৫-৫৬ সাল। আমার শৈশবকাল। ছাদে মেয়েরা এক্কাদোক্কা খেলত। আর আমরা কয়েকজন মিলে চোর-পুলিশ খেলতাম। এই খেলাটার সাংঘাতিক একটা মজা ছিল। গোলাগুলি চলছে বিশ্বজুড়ে। আমরা ছড়া কেটে বলতাম, সারেগামাপাধানি/ বোম ফেলেছে জাপানি / বোমের ভেতর কেউটে সাপ/ ব্রিটিশ বলে বাপরে বাপ — এগুলো সব বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালের। এখন কি এই খেলাগুলো আছে? হয়তো আছে কিছু জায়গায়৷ আসলে দর্শকশূন্য খেলার মজা নেই৷ পরিবারে বাচ্চাদের হইহই হারিয়ে যাচ্ছে হয়তো।’’ — শৈশব স্মৃতিচারণ করছিলেন সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী।
খেলা, যা কিনা উদাসীন হয়ে চুপ করে থাকা বা এ-প্রান্ত থেকে সে-প্রান্ত দৌড়ে বেড়ানোর খেলা। দিনগুলো হারিয়ে গেলেও স্মৃতিতে থেকে যায়। ছোটোবেলার খেলা আসলে মনের সবটা জুড়ে। এই কর্মব্যস্ততার জটিল জীবনে আমরা প্রত্যেকেই ফিরে যেতে চাই শৈশবের ঘাটে৷ কখনও বাতাবি লেবু দিয়ে ফুটবল; কাঠের তক্তা, তাল বা নারকেল বাগড়ার ব্যাট আর বাখারির উইকেট বানিয়ে জমিয়ে ক্রিকেট খেলা৷ এখানেই আমাদের দু-দণ্ড চুপটি করে বসে থাকা – পুরোনো বন্ধুদের ডাক – দুপুর গড়িয়ে যেই বিকেল নামবে, এ পাড়া থেকে সে পাড়া ছুটে বেড়াব সবাই – কারোর হাঁটু ছড়ে যাবে, কারোর কনুই-এ ব্যথা হবে – বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা বকাবকি করবে – সন্ধে নামলেই আবার পড়তে বসা মুখ গোমড়া করে।
সুন্দর একটা জীবন ছিল আমাদের। হয়তো এখনও আছে। কিন্তু ছোটোবেলার যা যা স্মৃতি এখনও আমরা আঁকড়ে থাকি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খেলা। কী খেলা? এই যেমন– ধরাধরি, লুকোচুরি, ইকির মিকির, কানামাছি, চোর পুলিশ, রাজা চোর মন্ত্রী সেপাই, ঝালঝাপটা, বুড়ি বাসন্তি, কিতকিত বা এক্কাদোক্কা, লালবাতি-কালোসোনা, ঘুটিং, গাদি, ধাপসা, কুমির ডাঙা, ডাংগুলি আরও কত কী!

কানামাছি ভোঁ ভোঁ/ যাকে পাবি তাকে ছোঁ
কানামাছি খেলায় কাপড় দিয়ে একজনের চোখ বেঁধে দেওয়া হয়, সে অন্য বন্ধুদের ধরতে চেষ্টা করে। যার চোখ বাঁধা হয় সে হয় ‘কানা’। অন্যরা ‘মাছি’র মতো তার চারদিক ঘিরে কানামাছি ছড়া বলতে বলতে তার গায়ে টোকা দেয়। চোখ বাঁধা অবস্থায় সে অন্যদের ধরার চেষ্টা করে। সে যদি কাউকে ধরতে পারে এবং নাম বলতে পারে, তবে ধৃত ব্যক্তিকে কানা বা অন্ধ সাজতে হয়। গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও শিশুদের মধ্যে এই খেলার প্রবণতা রয়েছে।
ধরতে পারে না… ধরতে পারে না...

ছোটোবেলার যা যা স্মৃতি এখনও আমরা আঁকড়ে থাকি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খেলা। কী খেলা? এই যেমন– ধরাধরি, লুকোচুরি, ইকির মিকির, কানামাছি, চোর পুলিশ, রাজা চোর মন্ত্রী সেপাই, ঝালঝাপটা, বুড়ি বাসন্তি, কিতকিত বা এক্কাদোক্কা, লালবাতি-কালোসোনা, ঘুটিং, গাদি, ধাপসা, কুমির ডাঙা, ডাংগুলি আরও কত কী!
শৈশবের খেলাগুলির মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হচ্ছে ধরাধরি বা ছোঁয়াছুঁয়ি। একে অপরকে ধরার চেষ্টা, কে কাকে তাড়াতাড়ি ছুঁয়ে ফেলতে পারে। এই খেলার জনপ্রিয়তা সাংঘাতিক। শুধুমাত্র বাংলাতে নয়, সুদূর ব্রিটেনেও। এমনকি এই খেলা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতাতেও জায়গা করে নিচ্ছে। শিশু ছাড়া প্রাপ্তবয়ষ্করাও খেলছেন। বাংলায় যা ধরাধরি বা ছোঁয়াছুঁয়ি, ব্রিটেনে তার নাম ‘চেজ ট্যাগ’। অ্যাথলিট এনিস মাসলিচ একবার বলেছিলেন, ‘‘একেবারে অন্য পর্যায়ে পেশাদারী অ্যাথলিটদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার মতোই এই খেলা৷ গতি অনেক বেশি হওয়ায় উত্তেজনাও বেড়ে যায়৷’’
টুকি… ধাপ্পা…

উনিশ শতকের এক পেইন্টিং-এ দেখা যায় তিনজন শিশু একটা জঙ্গলে লুকোচুরি খেলছে। চিত্রশিল্পীর নাম ফ্রেডরিক এডুয়ার্ড মেয়ারহেইম। একসময় ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়, সেইসঙ্গে লুকোচুরি খেলাও বিশ্বে ছড়িয়ে যায়। প্রভাবিত হয় শিশুরাই। একজন খেলোয়াড়কে বাছাই করা হয়। যখন সে তার চোখ বন্ধ করে এবং পূর্বনির্ধারিত সংখ্যায় গণনা করে তখন অন্য খেলোয়াড়রা লুকিয়ে পড়ে। পুরো সংখ্যা গোনার পরে, চোখ বন্ধ করা বাচ্চাটি বলে, 'প্রস্তুত কি না, আমি আসছি!' তারপর সে সব লুকোনো খেলোয়াড়কে খুঁজে বার করার চেষ্টা করে। কোথায় আছে জানান দেওয়ার জন্য কেউ বলে 'টুকি' – আর তাকে খুঁজে পেলেই চিৎকার করে পাশের জন বলে ওঠে 'ধাপ্পা'। এ এক ভারি মজার খেলা। সারা বিশ্বে খেলার বৈচিত্র্য অনুযায়ী বিভিন্ন নামে লুকোচুরি খেলা চলে। সাহিত্যিক এএম বুরেজ ১৯৩১ সালে তাঁর এক ভূতের গল্প বইতে এই খেলাকে বলেছেন 'স্মী'।
তুই চোর, আমি পুলিশ
প্রায় দেড়শো বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে শিশুদের দ্বারা পরিচালিত খেলা হচ্ছে চোর পুলিশ। সাধারণত খেলোয়াড়ের সংখ্যা অসীম রেখে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে ছেলে-মেয়েরা খেলে। এক দল পুলিশের ভূমিকা এবং অন্য দলটি একটি চোরের ভূমিকা পালন করে। পুলিশ খেলোয়াড়রা চোরদের তাড়া করে তাদের পরাজিত হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। খেলা এগোতে থাকে এইভাবে।
বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী শিবাজী চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে আসে পিট্টু খেলার কথা। তাঁর শৈশব কেটেছে শ্যামবাজারের মোহনবাগান লেনে। তিনি বলছেন, ‘‘সাত-দশটা টালির টুকরো গোল গোল করে এক জায়গায় সাজিয়ে রাখতে হয়, তারপর একটা ক্যাম্বিস বল দিয়ে সেখানে মারতে হয়। পড়ে যাওয়ার পর সব টুকরো তুলে নিয়ে যেমন ছিল তেমনই সাজিয়ে দিতে হয়৷ বিপরীত দল ক্যাম্বিস বল ছোঁড়ে। যদি সেটা আমার গায়ে লেগে যায়, তাহলে আমি আউট হয়ে যাব। এখন আর সেই মাঠও নেই, খেলাগুলোও প্রায় হারিয়ে গেছে৷ তবে কানামাছি এখনও খেলে অনেকে। আমার বাড়িতে আমি নিজেই এখনও খেলি বাচ্চাদের সঙ্গে। ছোটোবেলায় আমি এক্কাদোক্কাও খেলেছি। শৈশবে ছেলে-মেয়ে অত বিভাজন থাকে না, তাই সব সহজ লাগে।’’

স্মরণ করলে এইভাবে ভেসে উঠবে শৈশবে খেলাগুলোর ঝাপসা ছবি। পশ্চিমবাংলায় স্থানভেদে পাল্টে যায় খেলাগুলির নাম ও নিয়ম। ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, দাবার নিয়ম পৃথিবীজুড়ে একই৷ কিন্তু এই খেলাগুলো বদলে বদলে যায়। আন্তর্জাতিক খেলায় তকমা লাগে 'লোক'। এ আনন্দ গ্রামীণ, ফুরফুরে, অকৃত্রিম। শুধু শিশুরা কেন, বড়োরাও পা মেলান বৈকি! চোর, পুলিশ, কর্তা, গিন্নি, রাঁধুনি, চাকর সাজার খেলা। কখনও এক্কাদোক্কা-ঝালঝাপটা, কখনও কুমিরডাঙা-ডাংগুলি।
অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত শৈশবের খেলা প্রসঙ্গে বলেন, তাঁর জীবনের প্রথম দশটা বছর কেটেছে এলাহাবাদে৷ বন্ধু তেমন ছিল না। একা একা রান্নাবাটি আর টিচার-টিচার খেলতেন। কাল্পনিক ছাত্রছাত্রীদের শূন্য দিতেন আর প্রচুর মারতেন স্কেল দিয়ে৷ পরবর্তীতে এখন যখন শিক্ষকতা করেন, তখন তাঁর মতো ভালো দিদিমণি আর হয় না। সোহিনী বলছেন, ‘‘আমার নস্টালজিয়া ভালো লাগে। কিন্তু আঁকড়ে ধরে থাকতে ভালোলাগে না৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শৈশবও পাল্টে গেছে। আজ যখন বাচ্চারা ভিডিও গেমে মত্ত থাকে, খারাপ লাগে না। যার যেটা করতে ইচ্ছে হয় করবে। আমি খুব সুডোকু পাগল। ওটাও খেলি।’’
আসলে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একটা গোটা প্রজন্মের বেঁচে থাকা ছিল এই খেলাগুলো নিয়েই। তারপর ধীরে ধীরে আমরা আধুনিক থেকে অতি আধুনিক হয়েছি। আমরা বুঝেছি ব্যস্ততার পিছনে দৌড়, আমরা যান্ত্রিক সভ্যতায় আটকে গিয়ে হাতে ধরেছি রিমোট আর মোবাইল৷ কথা প্রসঙ্গে স্বপ্নময় চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘এখন সেই পরিবেশ নেই, খেলার সাথীও নেই। গ্রামবাংলায় এখনও খেলার মাঠ আছে। কিন্তু সেখানে মুশকিল হচ্ছে, গ্রামের মধ্যে একটা রাজনৈতিক চাপানউতোর বাচ্চাদেরও সংক্রামিত করছে। বাচ্চাটি ভাবছে আমার বাবার সঙ্গে তার বাবার ঝগড়া, তারফলে আমার পরিবারের সঙ্গে তার পরিবারের ঝগড়া — এটা কিন্তু অন্তর্নিহিত সামাজিক গবেষণার বিষয়। বাচ্চাদের এই সাইকোলজি নিয়ে কতজন ভাবেন জানি না। তাছাড়া এখনকার মতো আমাদের সময় মানুষে মানুষে এত বিভাজন তো ছিল না। বামুন-বাগদি, হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গেই খেলতাম। আমার হেয়ার স্কুলে প্রচুর মুসলিম বন্ধু ছিল। এখন বাচ্চাদের মধ্যেও এই বিভাজন ঢুকে গিয়ে শৈশব ও খেলাগুলোর বারোটা বাজছে। ২০০৬-৭ সাল নাগাদ পাড়ায় শুনলাম, চড়াই পাখি বারোটা, ডিম পেরেছে তেরোটা/ একটা ডিম কষ্ট, বিজেপির কষ্ট। বোঝাই যাচ্ছে, এখানেও রাজনীতি ঢুকে গেল।’’

যদিও আজও গ্রামবাংলায় কান পাতলে শোনা যাবে টুকি আর ধাপ্পার কোরাস, কানামাছি ভোঁ ভোঁ-র গুঞ্জন। আজও একটা প্রজন্ম বাঁচিয়ে রাখছে এসব লোকখেলাগুলি। সুকুমার রায় তাঁর 'আজব খেলা' ছড়ায় লিখেছিলেন, ‘‘আবার আঁকে আবার মোছে দিনের পরে দিন/ আপন সাথে আপন খেলা চলে বিরামহীন।/ ফরায় না কি সোনার খেলা? রঙের নাহি পার?/ কেউ কি জানে কাহার সাথে এমন খেলা তার?/ সেই খেলা, যে ধারার বুকে আলোর গানে গানে/ উঠছে জেগে – সেই কথা কি সূর্যি মামা জানে?’’
আপন সাথে আপন খেলা তো চলতেই থাকবে। কিন্তু সূর্যি মামা নিশ্চয় আমাদের দুঃখ বুঝবে। বিকেলের ঘণ্টা বাজলেই সব ভুলে সে বলবে, আয়, খেলতে আয়…।
______________
(ছোটোবেলার হারিয়ে যাওয়া খেলা – এ প্রসঙ্গে কথা বলতে বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে সুমন সাধু কথা বলেছিলেন সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী, সংগীতশিল্পী শিবাজী চট্টোপাধ্যায় এবং অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্তর সঙ্গে। তাঁদের স্মৃতিচারণ উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।)
