অলিম্পিয়া স্পোর্টিং হাউস : ভারতকে জ্যাভলিন চিনিয়েছিল কলকাতার এই প্রতিষ্ঠান

নীরজ চোপড়ার জন্য এদেশে জ্যাভলিন চর্চা বেড়েছে

০২৪ প্যারিস অলিম্পিক্সে পুরুষদের জ্যাভেলিন বা বর্শা ছোঁড়ায় দ্বিতীয় স্থান দখল করে রুপো জিতেছেন নীরজ চোপড়া। যদিও দেশের ক্রীড়ামহলের সবাই ধরেই নিয়েছিল সুইডেনের এরিক লেমিং, ফিনল্যান্ডের জনি মাইরা, চেক প্রজাতন্ত্রের জান জিলেজনি এবং নরওয়ের আন্দ্রেস থরকিল্ডসেনদের তালিকায় ঢুকে পড়বেন নীরজ। এই পাঁচজন-ই টানা একাধিকবার জ্যাভলিন ছুঁড়ে সোনা পেয়েছেন অলিম্পিক্সে। ভারতের প্রথম অ্যাথলিট হিসাবে পরপর দুই বছরই সোনা জেতা অধরা রয়ে গেল নীরজের। এই জ্যাভলিনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কলকাতা। গোটা ভারতের সঙ্গে জ্যাভলিনের পরিচয় ঘটিয়েছিল কলকাতাই। এ শহরেই রয়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন তথা প্রধান জ্যাভলিন প্রস্তুতকারী সংস্থা অলিম্পিয়া স্পোর্টিং হাউস (১ নম্বর নির্মল চন্দ্র স্ট্রিট)।

বাঁশের জ্যাভলিন

জ্যাভলিন কী! অনেকেই চিনত না। নীরজ সোনা জেতার পর থেকে একটা সচেতনতা এসেছে। সাড়া পড়েছে। অনেক বেশি মানুষ এখন জ্যাভলিন নিয়ে খোঁজ নেন। জিজ্ঞাসা করেন।

সোনা জিততে না পারলেও বিগত অলিম্পিকে নীরজের সোনা জয় এদেশে জ্যাভলিন চর্চাকে অনেক বেশি ত্বরান্বিত করেছে বলে মত অলিম্পিয়া-র অন্যতম কর্ণধার ঋদ্ধিশেখর বসু’র। ঋদ্ধির কথায়, “জ্যাভলিন কী! অনেকেই চিনত না। নীরজ সোনা জেতার পর একটা সচেতনতা এসেছে। সাড়া পড়েছে। অনেক বেশি মানুষ এখন জ্যাভলিন নিয়ে খোঁজ নেন। জিজ্ঞাসা করেন। জ্যাভলিন তো ছিলই কিন্তু সোনা জয়ের ফলে সামগ্রিক ভাবে একটা ‘বুস্ট’ পেয়েছে। মানুষকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।”

বৌবাজারের ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি বা ভীমনাগের দোকানের মতো সেখানকার অলিম্পিয়াও এ শহরে ইতিহাসের অনন্য উপাদান হয়ে উঠেছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সজল ঘোষ। তিনি ছিলেন ঋদ্ধির ঠাকুরদার পরামর্শদাতা এবং সম্পর্কে শালামশাই। দোকানের বর্তমান মালিক ঋদ্ধির বাবা, ড. শেখর চন্দ্র বসু। ১৮৯৬ সালে শুরু হয় অলিম্পিয়ার সফর। ঋদ্ধি জানালেন অলিম্পিয়া নামকরণের নেপথ্য কাহিনি। এথেন্সে আধুনিক অলিম্পিক্সের সূচনা হয়েছিল ১৮৯৬ সালে। সে’বছরই তাঁদের দোকানের জন্ম। যেহেতু ক্রীড়া সামগ্রীর দোকান, তাই নাম রাখা হয় অলিম্পিয়া। অলিম্পিয়ার খ্যাতি ছিল বাঁশের তৈরি জ্যাভলিনের জন্য। একদা বাঁশ দিয়ে মাছ ধরার বড়শি আর জ্যাভলিন বানানোই ছিল তাঁদের মূল ব্যবসা। অলিম্পিয়ার জ্যাভলিনের এতটাই চাহিদা ছিল যে গোটা দেশে তো বটেই, এমনকী ইউরোপ, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ-সহ পৃথিবীজুড়ে তা রপ্তানি করা হত।

জ্যাভলিন প্রস্তুত প্রক্রিয়া

ঋদ্ধির মতে, বাঁশের জ্যাভলিন ‘ফ্লেক্সিবেল’, টেকসই এবং সস্তাও। যাঁরা জ্যাভলিন থ্রো নিয়ে এগোতে চান, নবিশদের জন্য বাঁশের জ্যাভলিন আদৰ্শ। আরও বললেন, বার্মা বাঁশ দিয়ে জ্যাভলিন বানান তাঁরা। যা মূলত ত্রিপুরা থেকে আনা হয়। তারপর ‘স্মোকিং’ করা হয়। নির্দিষ্ট তামপাত্রার গরম জলের বাষ্পের সাহায্যে বাঁশের ‘রাইপেনিং’ করা হয়। তারপর ‘গ্রিপ’ লাগানো এবং শেষে মাথায় স্টিলের ‘টিপ’ জুড়ে দেওয়া হয়। 

অলিম্পিয়া স্পোর্টিং হাউস

১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সময়কালে অলিম্পিয়াই ছিল ভারতের একমাত্র জ্যাভলিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। মাসে ৩০০০ জ্যাভলিন প্রস্তুত হতো তখন। চুনী গোস্বামী এবং পিকে ব্যানার্জীর মতো ক্রীড়া তারকারা অলিম্পিয়ার সামগ্রীর উপর ভরসা করতেন। ১৯৫০-৬০ সময়টাতে গোটা ভারতে জ্যাভলিনের ব্যবসায় অলিম্পিয়ার মনোপোলি ছিল। তখন ব্যবসা সামলাতেন ঋদ্ধির দাদু বিভূতিভূষণ বসু। ঋদ্ধি পরিবারের চতুর্থ প্রজন্ম, যিনি ব্যবসায় এসেছেন। বলছিলেন, “এখন প্রযুক্তির অগ্রগতি হয়েছে, ফাইবারের জ্যাভলিন চিন থেকে তৈরি হয়ে আসছে। নীরজ ওগুলোই ব্যবহার করেন। আগে অলিম্পিকে বাঁশের জ্যাভলিন-ই ব্যবহার হত। সময়ের সঙ্গে বদলেছে। এখনও  আমরা নিজেরাই জ্যাভলিন বানাই। পূর্ব ভারতে যেকোনও স্কুল, কলেজে যেখানে জ্যাভলিন ব্যবহার করা হয়, প্রায় সবই আমাদের প্রতিষ্ঠানের। উত্তর-ভারত, মিরাটে অ্যালুমিনিয়ামের জ্যাভলিনের ব্যবহার বেশি। পূর্ব-ভারতে এখনও বাঁশের জ্যাভলিন ব্যবহার করা হয়।”

 

অলিম্পিয়ার তীর-ধনুক

তবে, এখন ওঁরা অ্যালুমিনিয়ামের জ্যাভলিনও বানান। ওজনের নিরিখে চার ধরনের বাঁশ ও অ্যালুমিনিয়ামের জ্যাভলিন বানায় এই প্রতিষ্ঠান। মেয়েদের জন্য ৫০০ গ্রাম। মহিলাদের জন্য ৬০০ গ্রাম। ছেলেদের জন্য ৭০০ গ্রাম। পুরুষদের জন্য ৮০০ গ্রাম। বাঁশের জ্যাভলিন ৫০০ টাকা। অ্যালুমিনিয়াম জ্যাভলিন ১০০০ টাকা। জ্যাভলিন ছাড়াও ক্রীড়াজগতের অন্যান্য সামগ্রী যেমন তিরন্দাজদের জন্য বাঁশের তীর, ধনুক তৈরি করেন তাঁরা। ১৯৮২-র দিল্লি এশিয়ান গেমস-এর জন্য তীরন্দাজীর যাবতীয় সামগ্রী গেছিল অলিম্পিয়া থেকে। ২০১১ সালে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়াম অর্থাৎ যুবভারতীতে আর্জেন্টিনা ও ভেনেজুয়েলার যে বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ হয়েছিল সেখানে অলিম্পিয়ার তৈরি ফাইবার গ্লাসের গোলপোস্ট বসানো হয়েছিল। জ্যাভলিনের জন্য বাঁশ আসে মেঘালয়, শিলং থেকে। এছাড়াও এখন বক্সিং গ্লাভস, ফুটবলের গোল পোস্ট ইত্যাদি তৈরি করছেন তাঁরা। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া অর্থাৎ সাই (SAI) অলিম্পিয়ার তৈরি নানা ক্রীড়া সামগ্রী ব্যবহার করে বলে জানিয়েছেন ঋদ্ধি।

Post Tags
Developed by DXDasia