বাংলার তারকা খেলোয়াড় মনোজ গুহ : বিশ্ব ব্যাডমিন্টনে চার নম্বরে ছিলেন যিনি

খেলাধুলার পাশাপাশি ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবেও মনোজ গুহ ছিলেন উজ্জ্বল নাম

বছর ছয়েক আগের কথা। ঘড়িতে তখন রাত ১টা বেজে ৪৫ মিনিট। মারা গেলেন সর্বকালের সেরা বাঙালি ব্যাডমিন্টন তারকা মনোজ গুহ (Manoj Guha)। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোরগোল শুরু হল বিভিন্ন মহলে। নানা সংবাদমাধ্যমে লেখালিখিও হল দিনকতক। অতঃপর, আবার সব নিস্তব্ধ। অচিরেই আড়ালে চলে গেলেন তিনি। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না হোক, নিদেনপক্ষে দু-এক পংক্তিতেও আর জায়গা পেলেন না তিনি। অথচ কজন বাঙালি পেরেছিল তাঁর মতো বিশ্ব ব্যাডমিন্টন ময়দানে দাপিয়ে বেড়াতে? অনেকেই হয়তো জানেন না, ব্যাডমিন্টনে বিশ্ব তালিকায় চার নম্বরে নাম ছিল এই মনোজ গুহ-র।

১৯২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে জন্ম মনোজ গুহর। ছোটোবেলা থেকেই খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকতেন মনোজ। যদিও তার জন্য পড়াশোনায় ক্ষতি হয়নি কোনোদিনই। মেধাবী ছাত্র হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছেন সর্বদা। শুধু শারীরিক দক্ষতায় খেলোয়াড়ই নয়, উপরন্তু মনোজ গুহ আজীবন খেলাকে আত্মস্থ করতে চেয়েছিলেন অন্তরে। তাই বেছে নিয়েছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিকতা পেশাকে। অমৃতবাজার পত্রিকায় চাকরি করাকালীন তিনি বরাবর সাহচর্য পেয়েছিলেন অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য সহ একদল ক্রীড়াব্যক্তি ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের। ফলে ঘরে বাইরে খেলার আবহে থেকেছেন তিনি। কিন্তু কেবল এটুকুতে আটকে থেকেই যে তিনি জীবন কাটাতে চাননি তার প্রমাণ মেলে মনোজ গুহ-র অদম্য জয়ের নজিরেই। 

ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার হিসাবে দেশ ও আন্তর্জাতিকস্তরে সর্বোচ্চ খ্যাতি পেলেও মনোজ গুহ-র প্রথম ভালোবাসা ছিল ফুটবল। কলকাতার ফুটবল ময়দানের দ্বিতীয় ডিভিশনের ক্লাব ইয়ং বেঙ্গলের হয়ে বেশ কয়েক বছর ফুটবল খেলেছেন তিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আইএফএ লিগের প্রথম ডিভিশনের ক্লাব এরিয়ান ও ভবানীপুরের হয়েও খেলেছেন। 

১৯৫০ সাল। সদ্য স্বাধীনতা এসেছে দেশে। কলকাতার অলিতে গলিতে সে-সময়ে ফুটবলের চল। যদিও ফুটবলে বাঙালির জয় এসেছিল তার অনেক আগেই। ১৯১১ সালে মোহনবাগানের শিল্ড জয় প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছিল বাঙালিকে। তার ওপর আবার ‘চাইনিজ ওয়াল’ গোষ্ঠ পাল জমানার পর মহামেডানের ঐতিহাসিক তিরিশের দশক, ময়দানে কিছুটা ঝড়ের মত এসে পড়া শৈলেন মান্না এবং ইস্টবেঙ্গলের পঞ্চপাণ্ডব – সব মিলিয়ে সদ্যস্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে ফুটবল একটা সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল। এমন স্রোতে নিজেকে না ভাসিয়ে পারেননি তরুণ মনোজও। ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার হিসাবে দেশ ও আন্তর্জাতিকস্তরে সর্বোচ্চ খ্যাতি পেলেও মনোজ গুহ-র প্রথম ভালোবাসা ছিল ফুটবল। কলকাতার ফুটবল ময়দানের দ্বিতীয় ডিভিশনের ক্লাব ইয়ং বেঙ্গলের হয়ে বেশ কয়েক বছর ফুটবল খেলেছেন তিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আইএফএ লিগের প্রথম ডিভিশনের ক্লাব এরিয়ান ও ভবানীপুরের হয়েও খেলেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৪৬ সালে ক্যালকাটা রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের রেফারি পরীক্ষাতেও পাস করেছিলেন মনোজ গুহ।

ফুটবলের প্রতি আকর্ষণ অধিক মাত্রায় থাকলেও, তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ব্যাডমিন্টন। শহর কলকাতায় ব্যাডমিন্টন (Bengals Badminton) খেলার প্রচলন হয় বিখ্যাত কুস্তিগির গোবর গুহ-র জামাই শরৎচন্দ্র মিত্রের হাত ধরে। ব্যাডমিন্টনের আখড়ায় শুরু থেকেই ব্যাতিক্রমী ছাপ রাখতে শুরু করেন মনোজ গুহ। এমনকি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি খোদ কলকাতা থেকে হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি।

এইসময়ে ভারতীয় ব্যাডমিন্টনে আরও এক বিখ্যাত নাম ছিল নান্দু নাটেকর। তাঁর পাশেই নিজেকে একটু একটু করে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মনোজ গুহ। ১৯৫১ সালে দেশের প্রথম তিনজন শ্রেষ্ঠ শাটলারের একজন হিসেবে নিজের নাম তুলে ধরেন তিনি। সিঙ্গেলস এবং ডাবলস – দুই ক্ষেত্রেই মনোজের ক্ষিপ্রতা সাড়া ফেলে দেয় ক্রীড়া মহলে। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় ব্যাডমিন্টন দল প্রথম বিদেশে খেলতে যায়। শ্রীলঙ্কা যাওয়া সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন বাংলার মনোজ গুহ। ১৯৫১-৫২ সালে আমেরিকান টমাস কাপ এবং ১৯৫৪-৫৫ সালে ডেনমার্ক জোনাল ফাইনাল, দু ক্ষেত্রেই ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত রাজ্য ব্যাডমিন্টন ডাবলসে ৬ বার ও মিক্সড ডাবলসে ৫ বার চ্যাম্পিয়নের শিরোপা পান মনোজ গুহ। সে যুগে তাঁর হাত ধরেই বিশ্ব ব্যাডমিন্টন শক্তিতে ভারত তৃতীয় শক্তি হিসাবে উঠে আসতে পেরেছিল।

 

মনোজ গুহ বুঝতে পেরেছিলেন ভারতীয় ব্যাডমিন্টনে অপেশাদারী মনোভাবের পরিস্থিতিকে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যাডমিন্টনে টিকে থাকতে হলে যে তরুণ রক্ত লাগবে তাও টের পেয়েছিলেন তিনি। তাই নিজের খেলা শেষ করার পর কোচিং-এর দিকে নজর দেন মনোজ। ক্রীড়াবিদ হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান ভারতীয় ব্যাডমিন্টনে নয়া প্রজান্মকে প্রতিষ্ঠা করা। আশির দশকে ভারতীয় ব্যাডমিন্টনে যে নবীন প্রজন্মের জোয়ার দেখা গিয়েছিল তার জনকও ছিলেন তিনিই। কলকাতার উপকন্ঠে বাঘাযতীনের কাছে কুসুম কাননের অরুণোদয় সংঘের মাঠে তৈরি করেছিলেন ব্যাডমিন্টন অ্যাকাডেমি। সেখান থেকেই মনোজ গুহ-র হাত ধরে সে সময় কলকাতার বুক থেকে উঠে এসেছিলেন একের পর এক শাটলার। যাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম অমৃতা মুখোপাধ্যায়, সৌমেন ভট্টাচার্য। এমনকি খোদ মনোজ গুহর ছেলে শশাঙ্ক শেখর গুহ ওরফে লাল্টু গুহও এই নবীন প্রজন্মের তালিকায় ছিলেন। মনোজ গুহ-র হাতেই ব্যাডমিন্টনের হাতেখড়ি হয় ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাটলার প্রকাশ পাডুকনের। এমন বহু শাটলার সে সময় তিনি তৈরি করেছিলেন যারা জাতীয় স্তরে বাংলা থেকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

বাংলার ব্যাডমিন্টনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কারিগর ছিলেন মনোজ গুহ। একসময়ে বিশ্ব ব্যাডমিন্টনের ডাবলসে গজানন হেমাড্ডির সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি বিশ্ব ক্রমতালিকায় ৪ নম্বর স্থানে উঠে এসেছিলেন। অথচ আজ যদি গুগলে ভারতের আন্তর্জাতিক মানের ব্যাডমিন্টন তারকার নাম খুঁজতে যাই, দেখবো একই সময়ের নান্দু নাটেকার আছেন, আশির দশকের প্রকাশ পাডুকোন, পরবর্তী সময়ে পুল্লেলা গোপীচাঁদ থেকে হালফিলের সাইনা-সিন্ধু সব্বাই আছেন। নেই কেবল মনোজ গুহ। এমনকি আন্তর্জাল মাধ্যমে বিশেষ লেখালিখিও নজরে পড়েনা তাঁকে নিয়ে। আজ আবার ক্রান্তিকাল আসন্ন। ক্রীড়াক্ষেত্রে বাঙালির অবদান নিয়ে চারিদিকে চলছে আলোচনা-সমালচনার ঝড়। এখনই তো আবার প্রয়োজন তাঁকে। যিনি র‍্যাকেট হাতে এসে দাঁড়ালেই একদিন গ্যালারি ফেটে পড়তো, সেই মনোজ গুহকে স্মৃতির পাতা থেকে আবছা হয়ে যেতে দিলে সে দায়ভার বর্তাবে সমগ্র বাঙালি জাতির উপরেই।

 

Post Tags
Developed by DXDasia