বিশ্বজয় করা কুস্তিগীর ‘গোবর পালোয়ান’ সাহিত্য নিয়ে বক্তৃতাও দিয়েছেন আমেরিকায়

তাঁকে নিয়ে হাজারো মিথ তৈরি হয়েছিল

ওজন: ২৩০ পাউন্ড। গলা: ২০ ইঞ্চি। হাতের গোছা: ১৫ ইঞ্চি। কব্জি: পৌনে ৯ ইঞ্চি, বুক: ৫০ ইঞ্চি, বুক (ফোলালে) ৫২ ইঞ্চি, ঊরু: ৩৩ ইঞ্চি, পায়ের ডিম: সাড়ে ১৮ ইঞ্চি। 

বাপরে বাপ! ইনি নির্ঘাত কোনো বডিবিল্ডার! কিংবা কুস্তিগীর। বিদেশি? নয়? তাহলে বাঙালি তো কিছুতেই হতে পারে না! কী বললেন? সাক্ষাৎ বঙ্গসন্তান! কে মশাই ইনি? নামখানা তো জানতেই হয়! যতীন্দ্রচন্দ্র গুহ বা গোহ ওরফে ‘গোবর’। 

বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ভারতীয় কুস্তিগীরদের ভয়ে তখন কাঁপছে পশ্চিমী দুনিয়া। বিশেষত আমেরিকার কুস্তিমহল। বিশাল বিশাল সাদা চামড়ার পালোয়ানদের ধোবিপাটে চিৎ করে উলটে ফেলছে অপেক্ষাকৃত রুগ্ন ‘নিগার’ ভারতবাসী। তাদের নিয়ে খবরের কাগজে কত লেখালিখি! বাস্তব-কল্পনার মিশেলে ঘটছে অতিমানবের নির্মাণ। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলে দিচ্ছেন দু’জন। গামা এবং গোবর। গোবরবাবুকে নিয়ে বাঙালির গর্ব কম না। এড ‘স্ট্র্যাঙলার’ লুইস থেকে সিবিস্কো কিংবা হাকেন্সমিদ, বিশ্ববিখ্যাত ‘রেসলার’-দের ধরে ধরে মাটিতে আছাড় মারছেন তিনিই। এই মানুষটাই আবার নিখুঁত ইংরেজিতে অনর্গল দেশিবিদেশি সাহিত্য নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সক্কলে থ। এককালীন তুচ্ছতাচ্ছিল্যের পাত্র গোবরবাবু কাগজের প্রথম পাতায় ‘জেন্টল জায়ান্ট’!

ঠাকুরদা অম্বিকাচরণ ছিলেন পালোয়ানমহলে ‘রাজাবাবু’। পেশায় মুৎসুদ্দি হলেও নেশা কুস্তি। আখড়া মসজিদবাড়ি স্ট্রিটে। অবাঙালি মল্লযোদ্ধাদের থেকে খাতির আদায় করেছিলেন নিজগুণেই। শোনা যায়, মল্লসম্রাট বুটা তাঁর নওজোয়ান শিষ্য করিম বখশ্‌কে নিয়ে এসেছিলেন অম্বিকাচরণের আখড়ায়। এই আখড়াতেই থলথলে ‘গোবরের তালের’ মতো চেহারা নিয়ে ‘যতীন’ এসেছিল। যতীনের কাকা ক্ষেত্রচরণ ওরফে ক্ষেতুবাবু, নাম দিলেন গোবর। সতেরো আঠারো বছর বয়সেই গোবরের সঙ্গে কুস্তি করার মত লোক পাওয়া যায় না দেশে। মত্ত হাতির মত শক্তি আর দম। 

সুতরাং আঠারো বছর বয়সেই গামা, আহমদ, ইমামের মতো পালোয়ানদের নিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন লন্ডন। সেখানে নেমেই সাহেবদের ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছেন। এলেন, লড়লেন আর জয় করলেন। লন্ডন হাঁ যতীনকে দেখে।

এরপর আমেরিকা। স্কটল্যান্ড-এর জিমি ক্যাম্বল, গ্রিসের বিল দেমেত্রালস, জার্মানির কার্ল সাফ্ট, বোহেমিয়ার জো শুল্‌জ, বেলজিয়ামের জ্যানসন, সুইডেনের লুনডিন, বুলগেরিয়ার গ্রানোভিচ, তুরস্কের মেহমুদ, একে একে জমি ধরাচ্ছেন সবাইকে। মার্কিন মহল নানা গুজব ছড়াচ্ছে, “ভারতীয় পালোয়ানদের সোনা খাইয়ে গায়ের জোর বাড়ানো হয়! অলৌকিক শক্তির অধিকারী তারা।” ‘কালা আদমি’-র হাতে সাদা চামড়ার অপমান তারা সইতে পারছে না। নিয়মে নানাধরনের কারচুপি চলছে। চোরাগোপ্তা মার এড়িয়েও বারবার জিতে যাচ্ছেন বাঙালি কুস্তিগীর। 

কিন্তু বিদেশ না, দেশেই আসল অপমান সইতে হচ্ছে গোবরকে। ছোটো গামার সঙ্গে  অবিস্মরণীয় লড়াইতে হার হচ্ছে তাঁর। ছোটো গামা দুবার ফাউল করলেন। তা সত্ত্বেও নাকি দেখেও দেখেন না কেউ। বাঘের মতো লড়ে হারছেন ‘বাঙালি হারকিউলিস’। কাগজে কাগজে ছি-ছিক্কার পড়ে গেল। বাঙালি নিন্দায় মেতে উঠল। এরপর গোবর ধীরে ধীরে সরে আসেন লড়াই থেকে। কুস্তির আখড়ায় আধা সন্ন্যাস। 

সাংবাদিক ইভলিন ওয়েলস একবার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভারতের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? গোবর নির্দ্বিধায় উত্তর দিয়েছিলেন, “জাতপাত।” আজীবন অহিংসায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। গান্ধী-নিন্দা সহ্য করতে পারতেন না। মাথায় একটা গান্ধী টুপি সর্বক্ষণ। কংগ্রেসের বহু বিশিষ্ট নেতা তাঁর বন্ধু। কিন্তু তাঁদের থেকে এতটুকু সৌজন্য নেন না রাশভারী মানুষটি। বিভিন্ন  বিষয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান। নিউ ইয়র্কের মডার্ন আর্টস অ্যান্ড লেটার্স-এ তো দীর্ঘ বক্তৃতাও  দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের জীবন ও বাণী নিয়ে। আখড়ায় থাকত একটা হনুমানের মূর্তি। কিন্তু পুরুত ডাকেননি গোবরবাবু। প্রতিদিন কোনো না কোনো ছাত্র পুজো করে। মন্ত্রপাঠ হয় না। নিজেদের মতো বজরংবলীকে সম্মান জানিয়ে নেমে পড়ে দঙ্গলে।

অন্তরঙ্গ আড্ডাসঙ্গী ছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। প্রায়শই আসতেন আখড়ার বৈঠকখানায়। এলেই গোবরবাবু দেখিয়ে দেন নিজের ছেলে রতনকে, “ওর মগজে একটু অঙ্ক কষে দিন তো!” হাভানা চুরুটের গন্ধে ম ম করে আড্ডাঘর। আজীবন ওই একটিই তো বদভ্যাস বয়ে বেরিয়েছেন সংযমী কুস্তিগীর।  

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি হারিয়েছে কুস্তি-শরীরচর্চার প্রতি আগ্রহ। তারা মগজাস্ত্রেই পৃথিবী জয় করার স্বপ্ন দেখেছে। খেলাধুলোতেও ঢুকে পড়ছে নোংরা রাজনীতির মারপ্যাঁচ। ‘যুগান্তর’ কাগজে একটি প্রবন্ধে গোবরবাবু লিখেছিলেন, “বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করে আসছি যে ফুটবল, ক্রিকেট ও ওই জাতীয় খেলাধুলার এবং অলিম্পিক এসোসিয়েশন প্রভৃতি বড় বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভার এমন সব ব্যক্তি বিশেষের হাতে গিয়ে পড়েছে, যাঁদের খেলাধূলা সম্বন্ধে জ্ঞান ও দরদ, নুতন খেলোয়াড় তৈরি করার যোগ্যতা ও ইচ্ছা পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। গণতন্ত্রের যুগে, যেখানে ভোটের ফলাফলে নির্ধারিত হয় যে ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের পরিচালক কে বা কারা হবেন, সেখানে দেখা যায় যে যাঁদের ভোট সংগ্রহের দক্ষতা আছে, তাঁরা খেলাধুলার দরদী না  হয়েও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড়, মাঝারি ও ছোট, সমস্ত পদগুলোই অধিকার করে নেন…” (মূল বানান অপরিবর্তিত)

১৯১১ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রতিস্পর্ধার জনক মোহনবাগান। সমসময়ে কুস্তিতে গোবর গুহরা হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির আইকন। কিন্তু নিজেকে প্রদেশিকতার বেড়াজালে আটকে রাখেননি। নিজের বয়ানেই ছিলেন, “এক প্রকৃত বিশ্বনাগরিক।”

ঋণ : ১. প্রিন্স গোবর গোহ- শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, খোয়াবনামা
২. গোহ পালোয়ান -শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, আনন্দবাজার পত্রিকা

 

Post Tags
Developed by DXDasia