
আমেরিকার সুপরিচিত গ্রসারি চেইন ট্রেডার জো-এর উদ্যোগেই এমনটা ঘটেছে
উপকারিতা ও গুণাগুণে অসামান্য হয়েও কুমড়ো কোনোদিনই ভারতবাসীদের বিশেষ পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেনি। বাঙালির পাতে কুমড়ো দেখতে পাওয়া গেছে কখনো পাঁচমিশালী তরকারিতে, কখনো বা বাদাম দিয়ে তৈরি মাখো মাখো কুমড়োর ছক্কায়, কখনো আবার সাধারণ ভাজা কিংবা বেসন দিয়ে বানানো কুমড়োনী’তে। তবে, আমেরিকার বাজারে কুমড়ো কিন্তু বরাবরই সবজিদের তালিকায় উপরের সারিতে থেকেছে। আর প্রতি বছর কুমড়োর এই চাহিদা বিশেষ ভাবে বেড়ে যায় অক্টোবর মাসের শেষদিকে হ্যালোইন উৎসব নাগাদ। আমেরিকায় কুমড়ো আবিষ্কার হয় উপনিবেশায়নের পর পরই। দেখা যায়, প্রতি বছর শরৎ কালে এখানে কুমড়োর ফলন অতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। এবং এর ফলে খুব সহজেই আমেরিকার সবজি বাজারে ওলকপি বা শালগমের জায়গা দখল করে নেয় কুমড়ো। এমনকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুমড়োর চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে শরৎকালের শেষদিকে হওয়া হ্যালোইনের প্রতীকই হয়ে দাঁড়ায় এই কুমড়ো। তবে আজকের এই গল্পে রয়েছে ছোট্ট একটা চমক!
কলকাতায় প্রায় প্রতিটি রাস্তার ধারে কিংবা মিষ্টির দোকানেই খোঁজ পাওয়া যাবে ‘সিঙাড়া’ নামের অত্যন্ত মুখরোচক বাঙালি খাবারটির। কিন্তু, কখনো কুমড়োর পুর দেওয়া সিঙাড়া খেয়েছেন? সাধারণত, সিঙাড়ার পুর হিসাবে ব্যবহার করা হয় আলু, ফুলকপি আর কুমড়ো দিয়ে তৈরি এক মন্ড। এরই অন্য এক প্রকার ‘সামোসা’ নামে পরিচিত, যার আমদানি হয়েছিল ভারতের বাইরে থেকে। আজ্ঞে হ্যাঁ! সিঙাড়া আপাতভাবে ভারতের সৃষ্টি মনে হলেও, বাস্তবে ভারতে এর আগমন ঘটেছিল মধ্য এশিয়ার দেশগুলি থেকে।
মধ্যযুগীয় মরক্কোবাসী ভূপর্যটক ইবন বতুতা ভারতবর্ষে পা রেখেছিলেন ১৪ শতকে। তাঁর রচনায় পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ধরা পড়ে মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজসভায় প্রায়ই ঘটে চলা বিভিন্ন উৎসব ও সেইসব উৎসবে খাবারের আয়োজনের কথা। তাঁর লেখা থেকেই জানতে পারা যায়, ‘সাম্বুসাক’ নামের এক খাবারের কথা। মুচমুচে তিনকোণা খাস্তা মোড়কের মধ্যে কুচোনো মটরশুঁটি, পেস্তা বাদাম কিংবা অন্যান্য কিছুর পুর দিয়ে তৈরি হত এই সাম্বুসাক। অতিথিরা শরবৎ-এর গ্লাস খালি করলেই, সুস্বাদু সাম্বুসাক তাদের পাতে হাজির হয়ে যেত। তেমনই আবার, সুফি সংগীতকার, পণ্ডিত ব্যক্তি কবি আমীর খসরু তাঁর লেখায় সামোসার কথা উল্লেখ করেন, যা ভারতের বিভিন্ন রাজদরবারে অত্যন্ত তরিবৎ করে খেতেন বিশিষ্টরা। ব্রিটিশরা যখন এ দেশে আসে, সিঙাড়ার স্বাদে মুগ্ধ হয়ে যায় তারাও। এবং ফিরতি পথে ইন্ডিয়ান ডায়াস্পোরা’র সঙ্গে বয়ে নিয়ে যেত সিঙাড়াও। এভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন আঞ্চলিক নাম ও জায়গাভেদে স্বাদের রকমফের নিয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে সিঙারা।
অন্য কোনো খাবারই বোধহয় চায়ের সঙ্গে এভাবে সঙ্গ দিতে পারে না, যেমনটা সিঙাড়া দেয়। বাংলার মন জয়ের পর পৃথিবী জয় করতে বেরিয়ে সম্প্রতি সিঙাড়ার অনুপ্রবেশ ঘটেছে আমেরিকার ‘স্ন্যাক মার্কেট’-এ। ক্যালিফোর্নিয়ার মনরোভিয়ায় অবস্থিত আমেরিকার সুপরিচিত গ্রসারি চেইন ট্রেডার জো-এর হেডকোয়ার্টার। সমগ্র আমেরিকা জুড়ে এই কোম্পানির অধীনে রয়েছে ৫৩০-এরও বেশি দোকান।
এই বছর ট্রেডার জো-এর উদ্যোগেই আমেরিকার খাদ্যবাজারে আত্মপ্রকাশ করে ‘মিনি স্পাইসি পাম্পকিন সামোসা’ (ছোটো আকারের মশলাদার কুমড়োর পুর দেওয়া সিঙাড়া)। বাজারে আসতেই তা জয় করে নেয় লক্ষাধিক মানুষের মন। এমনকি দেখা যায়, কুমড়োর প্রতি বিশেষ আগ্রহ না থাকা মানুষরাও এই সামোসার প্যাকেট সংগ্রহ করবার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠেছে। টক ঝাল ‘গ্রিন চাটনি’র সঙ্গে কুমড়োর মুখরোচক পুর দেওয়া তিনকোণা সিঙাড়াগুলি মুখে দিয়ে এমন মানুষও প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছে, কুমড়ো যার পছন্দের তালিকায় কোনোকালেই ছিল না। ট্রেডার জো-র এই অনবদ্য সৃষ্টি’তে মশলার পরিমাণও একেবারে পরিমিত। কেউ যদি এক বাক্স সিঙাড়া একাই খেতে চান, তাতেও এর ঝালের মাত্রা স্বাদকোরকগুলিকে তেমন অসুবিধা দেবে না।
ফ্লোরিডা-নিবাসী লেখক ম্যাকেঞ্জি ফিলসন তাঁর কুমড়োর সিঙাড়া খাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন অসাধারন লিখনশৈলীতে। তিনি বলেন, “এই নতুন স্বাদের সিঙাড়াগুলিকে আমি যখন দেখতে পাই, তখন সেগুলোকে সদ্য ট্রাক থেকে নামানো হয়েছে। এমনকি স্টোরের কুলার অবধিও সেগুলো পৌছতে পারেনি তখন। আমার এক পুরোনো বন্ধু আগে এক সময় ট্রেডার জো’তে কর্মরত ছিল। খানিকটা গোপন আঁতাত করবার ভঙ্গিতেই আমার হাতে সে ধরিয়ে দেয় এক বাক্স টাটকা সিঙাড়া। আর বিশ্বাস করুন, ট্রেডার জো-এ দাঁড়িয়ে কুমড়োপ্রীতি কিন্তু নেহাৎ হাসির কথা নয়। এখানে এপ্রিল মাস নাগাদই খদ্দেররা সারা বছরের জন্য কিনে রাখে পাম্পকিন ব্রেড মিক্স কিংবা পাম্পকিন ওয়াফেল। আর এখন আমি সত্যিই বুঝতে পারছি তারা এমনটা কেন করে।

মহামূল্যবান সিঙাড়ার বাক্সটি হাতে নিয়ে আমি বাড়ি ফিরে আসি এবং এয়ার ফ্রায়ারে ঢুকিয়ে দিই সেগুলি (৭ মিনিটের জন্য ৪০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে রাখলেই কাজ হয়ে যাবে)। বাক্স থেকে বের করে সোনালি রঙের মুচমুচে খোলসে কামড় দিতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এল মশলাদার চিজ-এ ভর্তি মাখো মাখো পুর। হলফ করে বলতে পারি, ভারতীয় খাবার খেতে যারা ভালবাসেন, তারা এই গরম মশলা, লঙ্কা, মরিচের স্বাদে ভরা পনির আর কুমড়োর পুর দেওয়া সিঙাড়ার হাতছানি কিছুতেই অগ্রাহ্য করতে পারবে না। সিঙাড়াগুলো এতখানি সুস্বাদু হওয়ার নেপথ্যে কিন্তু কুমড়োই। আমি এমনও কিছু পদ দেখেছি, যেখানে অতিরিক্ত মশলা আর চিনির ব্যবহারের ফলে মানুষ কুমড়োর আসল স্বাদই ভুলতে বসে। গ্রিন চাটনিতে ডুবিয়ে খান কিংবা শুধু মুখে – খুব শীঘ্রই কুমড়ো আপনার হৃদয়ে জায়গা করে নেবে।”
ট্রেডার জো’তে এই কুমড়োর সিঙাড়ার ৮.৫ আউন্সের দাম ৩.৯৯ ডলার। ইতিমধ্যেই এই ক্ষুদে সিঙাড়ার প্যাকেট “মরশুমের সবথেকে সেরা”র তকমা আদায় করেছে। ট্রেডার জো’র আবার রয়েছে ক্লাব ট্রেডার জো নামের এক সদস্যদল, যারা গত দশ বছর ধরে ট্রেডার জো দ্বারা বিক্রিত সামগ্রীগুলি পরখ করে এবং সে বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরে আপামর জনসাধারনের সামনে। কুমড়োর সিঙাড়া প্রসঙ্গে এই দলের এক সদস্য বলেন, “সিঙাড়ার ভিতরে থাকা কুমড়োর পুর এতটাই সুস্বাদু যে সারা বছরই যেন তা মুখে লেগে থাকে। মশলার চটক তো আছেই, সঙ্গে আছে কুমড়োর চিরাচরিত মিষ্টত্ব। এর ঝালের তীক্ষ্ণতা কখনোই আপনার মুখ পুড়িয়ে দেবে না। ডিনার পার্টি কিংবা ছুটির দিনের ভারী খাবারের আগে স্ন্যাক হিসাবে এই সিঙাড়া খাওয়াই যায়।”
মানুষের মতামত শুনে এটুকু নিশ্চিত হওয়াই যায় যে ট্রেডার জো-এর তৈরি এই কুমড়োর শিঙাড়া বাজারে পা রেখেই নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছে। আর আমেরিকার পটভূমিতে বাঙালির একান্ত আপন সিঙাড়ার (কুমড়োর) এই জয়, কলকাতার জন্যেও উৎসবের আমেজ এনে দিয়েছে।
ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এখানে করুন।
