
জনপ্রিয় এই খাবার এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে
পাঠক বন্ধুরা, আজ যে বস্তুটি নিয়ে এই নিবন্ধ … সেটিও একটি অতি সুস্বাদু খাদ্য বিশেষ। প্রথমেই একটা কুইজ। উত্তর দিতে পারলে…. না না বিশেষ কোনো পুরস্কার নেই। আসলে সঠিক উত্তর দিতে পারলে দেখবেন আপনার মনটা ভালো হয়ে গেছে। খাবারটার কথা মনে আসলেই আপনার মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে চায়ের কথা মনে পড়বে আর তার সঙ্গে টা হিসেবে খেতে ইচ্ছা করবে সেই অপূর্ব সুখাদ্যটি – মোটমাট একটা দারুণ ব্যাপার। তাহলে প্রথম ক্লুটা দিই? ইতিহাসবিদদের মতে ফারসি শব্দ ‘সংবোসাগ’ থেকে এই অতি জনপ্রিয় খাবারের নামটির উৎপত্তি। উত্তরটা…. অজানা তাইতো? তাহলে এবার দ্বিতীয় ক্লুটা দেওয়া যাক। এই খাবারটা কিন্তু আদতে ভারতীয় নয় মানে ভারতবর্ষে কিন্তু এই খাবারটির জন্ম হয়নি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এর ভারতে আগমন। এবার ও পারলেন না? তাহলে তৃতীয় ক্লুটা তো এবার দিতেই হয়। এবার মনে পড়ে যাবেই মানে এবার আপনারা পারবেনই। বৃষ্টি বাদলার দিনে সন্ধ্যাবেলায় চায়ের সঙ্গী হিসেবে অথবা অতিথি আপ্যায়নে এই খাবারটির কোনো বিকল্প নেই। এই তো, এবার ঠিক ধরতে পেরেছেন। হ্যাঁ পাঠকবন্ধুরা, আমি আজ শিঙাড়া নিয়ে দু’চার কথা লিখব।
পূর্ণিমা ঠাকুরের লেখা ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’
অতি সুস্বাদু যে খাবারটিকে আমরা শিঙাড়া নামে জানি, একদল ইতিহাসবিদের মতে পার্সি শব্দ ‘সংবোসাগ’ থেকে এই শিঙাড়া নামের উৎপত্তি হয়েছে। ইরানি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই সংবোসাগ বা সাম্বুস কয়েকশো বছর আগে ভারতবর্ষে এসে পৌঁছায়। তারা সারাদিন ব্যবসার কাজে পথে পথে ঘুরে রাতে যে সরাইখানায় থাকতেন সেখানে পরের দিনের পাথেয় হিসেবে ময়দার খোলের মধ্যে মাংসের পুর ভরে তৈরি হত সাম্বুসা বা সামোসা। মাংসের পুর ভরা এই খাবার অনেকক্ষণ ভালো থাকতো বলে এটি পথের খাবার হিসেবে নিতেন তারা।
আরও পড়ুন: কান্দির রাজবাড়িতে গৃহদেবতার ভোগ রাধাবল্লভী
ইরানি ঐতিহাসিক আবুল ফজল বৈহাকির ‘তারিখ-এ-বৈহাগি’ বইতেও এই সাম্বোসার উল্লেখ পাওয়া যায়। চতুর্দশ বা পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মালোয়ার সুলতানের রাজসভাতেও নাকি শিঙাড়া পরিবেশন করা হতো। পার্সি ভাষায় লেখা মধ্যযুগের রান্নার বই ‘নিমতনামা’য় প্রায় আটরকম শিঙাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা রাজসভায় পরিবেশিত হতো। সেইসব শিঙাড়ায় কোনটায় পাঁঠার মাংস থাকত আবার কোনোটায় হরিণের মাংস। বাদাম, ক্ষীর আর গোলাপজল দিয়ে মিষ্টি পুর ভরা শিঙাড়াও তৈরি করা হত। ইবন বতুতার বর্ণনায় পাওয়া যায় যে মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজসভাতেও পরিবেশন করা হত শিঙাড়া এবং সেই শিঙাড়ায় পেস্তা, মাংস, আখরোট ও বাদামের পুর দেওয়া হতো। আবুল ফজলের লেখা আইন-ই-আকবরি বইতেও কুতাব নামে একটি খাদ্যদ্রব্যের উল্লেখ আছে তৎকালীন ভারতে বা হিন্দুস্তানে যা ‘সামবোশাহ’ নামে পরিচিত ছিল। তবে তখনো শিঙাড়ার ভিতরে আলুর পুর দেওয়ার প্রচলন হয়নি।
‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’, পূর্ণিমা ঠাকুর
পর্তুগিজরা যখন ভারতে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করল তখন তাদের সঙ্গেই ভারতে চলে এলো বাটাটা বা বাতাতা– বাংলায় যে চমৎকার আনাজটিকে বলা হয় ‘আলু’…. আর সে এসেই হৈ হৈ করে বাঙালি রান্নাঘরের সিংহভাগ দখল করে বসলো। তার পর থেকেই শিঙাড়ায় আলুর পুর দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়। নিরামিষ পদের তালিকায় যুক্ত হলো আলুর পুর দেওয়া শিঙাড়া। সেই যে শিঙাড়ার জয়যাত্রা শুরু হল এখনো “সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে”.. শীতকালে ফুলকপি আলু বাদামের পুর দেওয়া গরম গরম … এমন শিঙাড়া সারা বিশ্বে পাবে নাকো তুমি। আমাদের যে সবথেকে প্রিয় মানুষ… প্রাণের মানুষ….যার কারণে আমরা অহংকারে মটমট করি…. বুক ফুলিয়ে পরিচয় দিই আমরা ‘টেগোরের’ দেশের মানুষ… সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি…. ঠাকুরবাড়িতেও কিন্তু শিঙাড়া বানানো হতো। পূর্ণিমা ঠাকুরের লেখা ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ বইতেও লেখিকা শিঙারা বানানোর পদ্ধতি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন।
টার্কি দেশের বই ‘টার্কিশ টেবল’
ভারত শুধু নয়… শিঙাড়া বিদেশের মানুষজনও খুব ভালোবেসেই খায়। টার্কি দেশের একটি পৃথিবী-বিখ্যাত কুকবুক বা রান্নার বই হল ‘টার্কিশ টেবল’ (Turkish Table).. এই বইটিতে পর্যন্ত শিঙাড়ার রেসিপি দেওয়া আছে। হয়তো তার নাম শিঙাড়ার বদলে অন্য কিছু, হয়তো তার মধ্যে আলুর তরকারির পুরের পরিবর্তে মাংসের পুর দেওয়া আছে….. কিন্তু বস্তুটি আদতে শিঙাড়াই।
‘টার্কিশ টেবল’-এ শিঙাড়ার রেসিপি
তাহলে….. পাঠকবন্ধুগণ, চলুন শিঙাড়ার জয়ধ্বনি দিই আমরা। আর এই লেখা শেষ করি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্ত কবি ও ছড়াকার মোহিত ঘোষের লেখা একটি ছড়া দিয়ে….
“সিঙ্গাড়া
সিঙ্গাড়া রে সিঙ্গাড়া
তোর যে দেখি শিং খাড়া
গা টা বেজায় খসখসে
হাঁটু মুড়েই রোস বসে
ফাটিয়ে দিলে তোর ভুঁড়ি
নোলায় লাগে সুড়সুড়ি
পাই ভেতরে এক কাঁড়ি
জোর মজাদার তরকারি”..
(জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছড়ার বই ‘টাপুর টুপুর’ থেকে নেওয়া.. বইয়ের বানানই রাখা হয়েছে)
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা;
ঠাকুরবাড়ির রান্না, পূর্ণিমা ঠাকুর।

