‘সুর নাই, তাল নাই, অথচ অন্ধ ভক্তগণ মোহিত’ — রবীন্দ্রনাথকে বললেন দ্বিজেন্দ্রলাল

রবিবাবু দ্বিজুবাবুর তর্জা কি শুধুই ‘অঘটন’ মাত্র!




লেখিকা মহুয়া দাশগুপ্তের কণ্ঠেও শুনে নিতে পারেন এই লেখা

সে এক আমল ছিল। রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে চন্দ্রাতপ খাটিয়ে বসতো কবির লড়াই। ছন্দবদ্ধ শব্দে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করাই ছিল কবিয়ালদের উদ্দেশ্য। তারপর সেই সব দিন গেছে। এসেছে গীতিকাব্য, মহাকাব্যের সময়। এসেছেন মধুসূদন,  বিহারীলাল, দ্বিজেন্দ্রলালের মতোন কবি। এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কবিদের পারস্পরিক মতপার্থক্য যে বিরোধ তৈরি করত, তা সেই ফেলে আসা দিনের তর্জার থেকে কিছু কম ছিল না । খেউর ,খিস্তি? সেও ছিল ছদ্মবেশে। তাহলে, শুন শুন গুণীজন, শুন দিয়া মন/ রবিবাবু দ্বিজুবাবুর তর্জা করি যে বর্ণন।’

দুজনেই শ্রদ্ধেয়, দুজনেই প্রতিভাবান। বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে উভয়েরই অবদান অসীম। তবু সময় তো ঘটনার ঘনঘটা জমিয়ে রাখে মহাকালের কেন্দ্রে। তাই ইতিহাস হয়ে যায়। সেই সত্য অনেকসময় ভক্তের আবেগকে আহত করতে পারে। কিন্তু সেই আবেগ অতীতের ঘটনাকে বদলাতে পারে না। সত্য সূর্যের মতোই দৃপ্ত, উজ্জ্বল । 

বিরোধের সূচনা করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। সেই আমলের বিদ্বান, সাহিত্যমনস্ক সমাজ তখন ‘দ্বিজুবাবুর দল’ আর ‘রবিঠাকুরের দল’ — এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসাহিত্যের বিরুদ্ধে দ্বিজেন্দ্রলালের অভিযোগ ছিল মূলত দুইটি — অস্পষ্টতা এবং দুর্নীতি। 

১৩১২ সালের ২৩ বৈশাখ, দ্বিজেন্দ্রলালকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠির হদিশ পাওয়া যায় প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ডে। রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলালের উদ্দেশে লিখছেন, ‘প্রিয়বরেষু , আপনি আমার স্তাবকবৃন্দের মধ্যে ভর্তি হতে পারবেন না এ কথাটা এতটা জোরের সঙ্গে কেন বল্লেন আমি ভালো বুঝতে পারলাম না। আপনার নিন্দুকের দলে আমি যোগ দিতে পারবো না — একথাও তো আপনি বলতে পারতেন।’ দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথকে জানিয়ে শুনিয়েই রবীন্দ্রবিরোধীতায় নেমেছিলেন। ১৩২৩ শ্রাবণ সংখ্যার বঙ্গদর্শনে অজিত চক্রবর্তীর ‘কাব্যে প্রকাশ’ নামের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধকে কেন্দ্র করেই মঞ্চে নামলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। অনেক বক্তব্য পেশ করলেন রবীন্দ্রসাহিত্যের অস্পষ্টতা নিয়ে। বললেন, ‘আমাদের দেশে এই অস্পষ্ট কবিদের অগ্রণী শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ দ্বিজেন্দ্রলালের আক্রমণের কেন্দ্রে রইল রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতাটি। কবিতাটির প্রচলিত রূপক অর্থকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে কবিতাটিকে এক নির্দয় কৃষকের স্ত্রী-পুত্রকে বঞ্চিত করার কাহিনিতে পরিণত করলেন। জানালেন, এই কবিতার আধ্যাত্মিক অর্থের জন্য তিনি নাকি রবিবাবুর অনেক ভক্তের কাছে গিয়েছেন। ‘তাঁহাদের —‘এ্যা —ও— কি জানেন না– ’ ইত্যাদি প্রায়ই শুনিয়াছি। কোন আদ্যন্ত সঙ্গত ব্যাখ্যা পাই নাই।’ তারপরেই দ্বিজেন্দ্রলাল কবিতাটির একটি ভয়ানক ব্যাখ্যা দিলেন। কৃষক, ধানচাষ, মাঝি, নৌকা— সবকিছুকে বাস্তবের পটভূমিতে টেনে আনতে গেলেন। বললেন, ‘–রবিবাবুর ভক্তগণ বলিবেন, আঃ, ওসব ধরিতে নাই। কেমন শুনিতে বলো দেখি ‘শ্রাবণ গগন ঘিরে’ —যেন কেহ ধাঁই করিয়া তবলায় চাঁটি দিল —তাহার পর হউক বেতালা।’ দ্বিজেন্দ্রলাল নানা প্রকারে বলতে চাইলেন কবিতাটি লেখার সময় ‘রবিবাবু কলম এলাইয়া দিয়াছেন। সুর নাই, তাল নাই, অথচ এই কবিতা পড়িয়া তাঁহার অন্ধ ভক্তগণ মোহিত। কেন?’

এই কেন-র উত্তর পেলে দ্বিজেন্দ্রলাল সম্মুখসমরে যেতেন না। দ্বিজেন্দ্রলাল রূপক বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে না চেয়ে বলেছিলেন, ‘–হেঁয়ালিতে কবিতা লিখিলেই কবিতা উত্তম হয় না। –যদি স্পষ্ট করিয়া লিখিতে না পারেন , সে আপনার অক্ষমতা। তাহাতে গর্ব করিবার কিছুই নাই।’

এই অনর্থক সমালোচনার প্রত্যুত্তর এসেছিল। যদুনাথ সরকার ‘সোনার তরী’র একটা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, ‘প্রথম পাঠেই যে এরূপ কবিতার প্রতি পংক্তি বোঝা যাইবে এরূপ আশা করা যায় না, এবং না বুঝিতে পারিয়া অমনি নববাণীর দূতের প্রতি অথবা রবিভক্তগণের মধুচক্রে ঢিল ছুঁড়িলে শুধু ‘হাসির সমালোচনা’ রচনা করা হয়। এবার লড়াই জমে উঠলো। দ্বিজেন্দ্রলাল ‘সোনার তরী’র একটি প্যারোডি লিখে ফেললেন। — ‘ঘাটে ডিঙ্গা লাগায়ে বন্ধু পান খায়ে যাও!/ পান খায়ে যাও বন্ধু, পান খায়ে যাও।’ এইবার এই প্যারোডি কবিতার এমন ব্যাখ্যা করলেন যে রবীন্দ্রভক্তগণের অতিভক্তিতে সজোরে আঘাত লাগল। দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারোডির ব্যাখ্যা দাঁড়ালো— ‘হে হরি। আমাকে করুনা করে দর্শন দিয়া যাও।’ দ্বিজেন্দ্রলাল স্পষ্টতার দোহাই  দিয়ে একরকম  রবীন্দ্রবিদূষণেই নেমেছিলেন। 

দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রতি আরেকটি অভিযোগ করেছিলেন— দুর্নীতির। ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ গানটি সম্বন্ধে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। আপত্তি ছিল অদ্ভুত কারণে। দ্বিজুবাবুর মতে, গানটা নাকি গৃহস্থ ঘরের কুমারীর মুখে শোভন শুনতে লাগে না। অথচ, দ্বিজেন্দ্রলালের প্রেমের গান বা কবিতা কিছু কম ছিল না। দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের গানে ‘লাম্পট্য’ ছাড়া কোনো মৌলিকতা খুঁজে পাননি। রবীন্দ্রনাথ নাকি বৈষ্ণব কবিদের থেকে রূপকল্প ‘অপহরণ’ করেছিলেন। এর উত্তর দিলেন প্রমথ চৌধুরী। বীরবল ছদ্মনামে তিনি বলেছিলেন, ‘হয়তো রাধা-কৃষ্ণের বেনামী করলে গানটা সম্বন্ধে আপত্তি হত না।’ প্রত্যুত্তর এলো চৈতন্য লাইব্রেরির পরিচালক গৌরহরি বসাক ‘মেঘনাদ’ এই ছদ্মনামে। নীরদচন্দ্র চৌধুরী ‘আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ’ বইতে লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করিবার জন্য সেই সময়কার নৈতিক শুচিবাই -এর  সহায়তা লইতে গিয়া দ্বিজেন্দ্রলাল সেই শুচিবাই-এর কবলে পড়িয়া গেলেন।’ 

সত্যিই তাই! রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যে দুর্নীতি দেখিয়ে, তিনি বললেন, কাব্যটি দগ্ধ করে দেওয়া উচিত। কেন? কারণ দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নারী পুরুষের কোর্টশিপের বিরুদ্ধে ছিলেন। আগেও বলেছিলেন, নবীন কবিদের কবিতায় আছে টপ্পার প্রেম নয় বিলাতি কোর্টশিপ। এই প্রেম ‘দুর্নীতিমূলক’। আদিত্য ওহদেদার ভালো বলেছিলেন, ‘নীতির ঘোড়ায় চড়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্র-দূষণে তলোয়ার উঁচিয়ে চিত্রাঙ্গদা সম্পর্কে শেষ রায় দিলেন, ‘এ পুস্তকখানি দগ্ধ করা উচিত।’ এবার তর্জা জমে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে অনেকে সওয়াল করেন। প্রিয়নাথ সেন, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচি, ফনীন্দ্র রায়, প্রমথ চৌধুরী ইত্যাদি গুণীজন। দ্বিজেন্দ্রলাল নিজের পক্ষে বলতেন, সাহিত্যের আদর্শ রক্ষার জন্য তাঁর এই প্রতিবাদ। কিন্তু ধীরে ধীরে দ্বিজেন্দ্রলাল ব্যক্তিগত আক্রমণের দিকেই এগোলেন। ১৩১৯ সালে প্রকাশিত হল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্যারোডি নাটক ‘আনন্দ বিদায়’। নাটকের ভূমিকায় দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন, ‘এ নাটিকায় কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নাই। ‘মি’-র প্রতি আক্রমণ আছে। ন্যাকামি, জ্যেঠামি, ভণ্ডামি ও বোকামি লইয়া যথেষ্ট ব্যঙ্গ করা হইয়াছে। তাহাতে যদি কারো অন্তর্দাহ হয় তো তাহার জন্য তিনি দায়ী, আমি দায়ী নহি।’ দ্বিজেন্দ্রলাল যা বলেছিলেন তার সারকথা হল এই যে কোনো কবি কোনো কাব্যকে সাহিত্যের পক্ষে অমঙ্গলকর বিবেচনা করলে সেই কাব্যকে সাহিত্য ক্ষেত্র হতে ‘চাবকাইয়া দেওয়া’ কর্তব্য। ব্রাউনিং ওয়ার্ডসওয়ার্থকে আর ওয়ার্ডসওয়ার্থ শেলি আর বায়রনকে এইরূপই কশাঘাত করেছিলেন।

দ্বিজেন্দ্রলাল যাই বলুন, ব্যক্তিগত আক্রমণ  হয়েছিল। স্টার থিয়েটারের দর্শক সেদিন ধরে ফেলেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল কাকে ‘চাবকাইতে’ চান। এই ঘটনার সাক্ষ্য রয়ে যায় প্রমথ চৌধুরীর লেখা ‘সাহিত্যের চাবুক’ প্রবন্ধে— ‘সেদিন স্টার থিয়েটারে ‘আনন্দ বিদায়’-এর অভিনয় শেষে দক্ষযজ্ঞের অভিনয়ে পরিণত হয়েছিল শুনে দুঃখিত ও লজ্জিত হলুম। তার প্রথম কারণ এই যে, শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মতো লোককে দর্শকমণ্ডলী লাঞ্ছিত করেছেন, এবং তার দ্বিতীয় কারণ এই যে শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছনা দেবার উদ্দেশ্যেই আনন্দ বিদায়ের রঙ্গমঞ্চে অবতারণা করেছিলেন।’ দ্বিজেন্দ্রলাল অস্বীকার করলেও এটাই সত্যি যে ‘আনন্দ বিদায়’ রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ করেই লেখা—

‘একাধারে কবি, অধিকারী, ঋষি, কিবা ত্যাগ কিবা দান,/ পরিষৎ জল ছিটায়ে দিলেই (কবিবর) স্বর্গে উঠিয়া যান।’ (আনন্দ বিদায়, ২য় অঙ্ক, ১ম দৃশ্য)। 

এই লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথ মৌন ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলালের সরব ব্যঙ্গ তাঁকে স্পর্শ করেছিল ঠিকই! কিন্তু রবি ঠাকুর সৌজন্যমূলক দূরত্ব রেখেছিলেন এই বিষয়ে। একটা সময় রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলালের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। দ্বিজেন্দ্রলাল নিজের ‘বিরহ’ বইটি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। ‘গোরা’ উপন্যাসকে বলেছিলেন ‘ধর্মগ্রন্থ’। জীবনের পরবর্তী পর্বে রবীন্দ্রনাথের প্রতি দ্বিজেন্দ্রলালের আচরণে অসংযম দেখা গেলেও  শেষদিকে এর জন্য তিনি দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ছেলে দিলীপকুমার রায়ের স্মৃতিচারণা থেকে একথা জানা যায়। দ্বিজেন্দ্রলাল মারা যান ১৯১৩ সালের ১৭ মে। তার আগে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় লিখে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ‘নাইট’ উপাধি পাওয়ার সম্ভাবনার কথা। রবীন্দ্রনাথও দ্বিজেন্দ্রলালের গুণমুগ্ধই ছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর লিখেছিলেন, তিনি আন্তরিকভাবে দ্বিজেন্দ্রলালের সাহিত্যকে শ্রদ্ধা করেন। সত্যিই রবীন্দ্রনাথ কখনও দ্বিজেন্দ্রলাল ও তাঁর সাহিত্যের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেননি। তাঁদের মধ্যে যা ঘটেছে রবীন্দ্রনাথ তাকে ‘অঘটন’ বলেই মনে করতেন।

সত্যিই, সময়ের হলদে হয়ে যাওয়া প্রাচীন পাতায় কত গল্প লেখা আছে। এইসব জীবনের কাহিনি  এখন আবছা হয়ে গেছে। জেগে আছে শুধু সৃষ্টি। সৃজনের সেই দীপ্তলোকে এখনো হয়তো সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে সাহিত্যিক আড্ডা জমেছে। রবি ঠাকুরের কবিতার ছন্দে উতল হচ্ছে দশদিক আর  দ্বিজুবাবুর গানে শিহরণ জাগছে শ্রোতাদের মনে। এই ছবিটুকুই সত্যি। বাকিসব ওই লড়াই, তর্জা, বিচার? ‘অঘটন’ মাত্র!

সহায়ক গ্রন্থঃ

১. রবীন্দ্রবিদূষণ ইতিবৃত্ত, আদিত্য ওহদেদার
২. রবীন্দ্রসাহিত্য সমালোচনার ধারা, আদিত্য ওহদেদার
৩. আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ, নীরদচন্দ্র চৌধুরী।

Developed by DXDasia