ব্রিটিশ সরকারও আকৃষ্ট হয়েছিলেন স্বদেশি পণ্যে, নেপথ্যে ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তর তৈরি ঝর্ণা কলম

১৯০৫ সালে তৈরি হয় তাঁর স্বদেশি কলমের কোম্পানি এফ. এন. গুপ্ত অ্যান্ড কোং

র্ণা কলম (Fountain Pen), অতীতে যার হাত ধরে কিনা বিবর্তন এসেছিল, আজ পাড়ার মোড়ের ওই খাতা-পেনের দোকানে গেলে কি সহজেই খোঁজ মেলে তার? নাকি বাজার চলতি সস্তার বল পেন আর জেল পেনের চাপে অচিরেই হারিয়ে গিয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঝর্ণা কলম। ঐতিহ্যবাহীই বটে! আজও যদি বইয়ের তাকে ধুলো পড়া কোনো কোণে হঠাৎ দেখা মেলে একটি ঝর্ণা কলমের, গর্ব হয় বাঙালির। ফাউন্টেন পেন আছে বলে কথা!

বাঙালির ব্যবসা জমে না, এই চলতি কথাটা আজ অবশ্য আর খাটে না। অতীতেও খাটতো কি? প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর অথবা মতিলাল শীল (Prince Dwarakanath Tagore and Motilal Seal) তো সেযুগেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছিলেন এবং ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এ অতীত আমাদের সকলেরই কমবেশি জানা। তবে আজকের গল্পটা অন্য এক বাঙালি ব্যবসায়ীর। তথাকথিত পরিচিতির আলো কোনোদিনই জোটেনি যাঁর। ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত। একাধারে দেশপ্রেমিক এবং শিল্পপতি। ঔপনিবেশিক শাসনকালে বিশাল এক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত অবশ্য কোনোদিনই সরাসরি যোগ দেননি স্বদেশি আন্দোলনে। বরং দেশকে স্বাবলম্বী করতে দেশীয় শিল্প স্থাপনের গুরুত্ব তিনি বেশি উপলব্ধি করেছিলেন।

ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত (Fanindranath Gupta), এফ.এন নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কলকাতার বিশিষ্ট গুপ্ত পরিবারে জন্ম হয় ফণীন্দ্রনাথের। তাঁর পিতা গোপাল চন্দ্র গুপ্তও ছিলেন বিশিষ্ট একজন শিল্পপতি। অন্যদিকে ফনীন্দ্রনাথের দাদা, ডঃ দ্বারকানাথ গুপ্ত ছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। ১৮৩৬ সালে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভারতের প্রথম মানব ব্যবচ্ছেদ করতে প্রফেসর মধুসূদন গুপ্তকে সহায়তা করেছিলেন এবং আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন গোঁড়া হিন্দু সমাজে।

ফণীন্দ্রনাথ বি.এ পাশ করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ (Presidency College) থেকে। এই সময়ে দেশে জোরদার হয়ে ওঠে স্বদেশি আন্দোলন। একদিকে স্বদেশি (Swadeshi) প্রচার ও অনুশীলন এবং অন্যদিকে বিদেশি পণ্য বয়কট, দোকানে দোকানে পিকেটিং শুরু করে ছাত্ররা। ছাত্ররা যোগ দেয় স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ারে। ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত অবশ্য কোনোদিনই সরাসরি যোগ দেননি স্বদেশি আন্দোলনে। বরং দেশকে স্বাবলম্বী করতে দেশীয় শিল্প স্থাপনের গুরুত্ব তিনি বেশি উপলব্ধি করেছিলেন।

১৯০৫ সালে, মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তৈরি করেন তাঁর নিজস্ব কোম্পানি এফ. এন. গুপ্ত অ্যান্ড কোং। ক্রমেই ঔপনিবেশিক ভারতে দেশিয় ঝর্ণা কলম এবং পেন্সিল তৈরির পথপ্রদর্শক হয়ে ফণীন্দ্রনাথ। শুরুর দিনগুলিতে, পাঁচ নম্বর মিডলটন স্ট্রিটের বাড়িতেই চলতে থাকে তাঁর অফিসের যাবতীয় কাজ। এই সময় তৎকালীন আইসিএস কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের কমিশনার কে.সি.ডি এবং ভারতের মুদ্রণ ও স্ট্যাম্প নিয়ন্ত্রক, এম. জে. কগসওয়েল, ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তর সততা এবং কাজের নীতি দেখে খুবই আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁরা দুজনেই ব্রিটিশ সরকারের কাছে সুপারিশ করেন ফণীন্দ্রনাথের নাম এবং তাঁর তৈরি পণ্যের। সমস্ত প্রমাণপত্রাদি যাচাই করার পর, ব্রিটিশ সরকার (British government) তাঁর কোম্পানির সঙ্গে স্টেশনারী সামগ্রী বিক্রির জন্য একটি বার্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ফণীন্দ্রনাথকে। ক্রমেই আরও প্রসারিত হতে থাকে তাঁর ব্যবসা। কম দিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, ব্যবসা বাড়াতে হলে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সাযুজ্য রাখতে হলে শীঘ্রই আরও বড়ো জায়গা দরকার।

১৯১০ সালে, তিনি পূর্ব কলকাতার ১২ নম্বর বেলেঘাটা রোডে (12 Beliaghata Road, in East Kolkata) অবস্থিত ছয় বিঘা জমিতে স্থাপন করেন একটি বড়োসড়ো কারখানা। জমিটি কিনতে তৎকালীন সময়ে খরচ হয় প্রায় আড়াই লাখ টাকারও বেশি! ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর পণ্যের গুণগত মান উন্নত করতে গ্রেট ব্রিটেন থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করতে থাকেন। এদিকে ব্রিটিশ সরকার তার প্রতিনিধি জে.এ.এল সোয়ানকে ফণীন্দ্রনাথের কারখানা পরিদর্শনের জন্য পাঠায়। সোয়ান সাহেব কারখানার যন্ত্রপাতি, উৎপাদন পদ্ধতি, পণ্যের গুণগত মান এবং ব্যবস্থাপনা দেখে খুবই খুশি হন। এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে একটি অনুকূল প্রতিবেদন জমা দেন। তখনকার দিনে ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে স্টেশনারি জিনিসপত্র আমদানি করা ছিল দুঃসাধ্য কাজ। তাই এদেশে ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তর একচেটিয়া আধিপত্য তাঁর শিকড়কে সহজেই আরও মজবুত করে তোলে।

সময়ের সঙ্গে ফণীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনেন এবং স্থানীয় ধনী অভিজাত গ্রাহকদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত স্টেশনারি আইটেম তৈরি করতে শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে এক্সক্লুসিভ ‘দ্য পারফেকশন ফাউন্টেন পেন’ সিরিজ। এই সিরিজের ফাউন্টেন পেনগুলির নিব ১৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি করা হতো। শুধু তাই নয়, পেনটির বাইরের খোলসটি ছিল মাদার অফ পার্লের তৈরি। এসময়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ (Rai Bahadur) উপাধিতে ভূষিত করে। যদিও ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদীদের কাছেও সমান জনপ্রিয় ছিলেন ফণীন্দ্রনাথ।

১৯২৫ সালের ২৮ অগাস্ট, ফণীন্দ্রনাথের কারখানা পরিদর্শন করতে আসেন মহাত্মা গান্ধি (Mahatma Gandhi)। তাঁর ব্যবসায়িক উদ্যোগে মুগ্ধ হয়ে পড়েন গান্ধিজি। বলেন, “আমি এফ.এন কোম্পানির সফরে খুবই খুশি। পাশাপাশি জেনে আনন্দিত যে, ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তর কারখানায় কলম এবং কলম ধারক তৈরির জন্য নানান সরঞ্জাম তৈরি করা হয়। আমি আন্তরিকভাবে এই কোম্পানির শুভকামনা করি।” গান্ধিজির কথায় ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তর মধ্যে জাতীয়তাবাদী উচ্ছ্বাস বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও তাঁর কাজে সেই উচ্ছ্বাস স্পষ্ট দেখা যায়। পণ্যের গুণগতমান সম্পর্কে খুবই খুঁতখুঁতে ছিলেন ফণীন্দ্রনাথ। আর তাই অন্য কোনও ইউরোপীয় সংস্থা এফ. এন. গুপ্তর স্টেশনারি সামগ্রীর ধারে কাছে আসতে পারেনি কোনোদিনই।

 

মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia