আজও কলমের চিকিৎসা হয় কলকাতার এই হাসপাতালে

পহার পাওয়া সাধের ফাউন্টেন পেনটার নিব ভেঙে ফেলে সে কী মন খারাপ! মনে ব্যথা পুষে না রেখে এর-ওর কাছে বলে হালকা হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। ভাগ্যিস করেছিলাম, নাহলে কি আর এরকম একটা বিষয়ের হদিশ পেতাম! একদিন প্রায় কেঁদে ফেলে এক বন্ধুর কাছে দুঃখের কথা পাড়তেই খানিক ভেবে সে আমায় যা বললো, তাতে কান্না-ফান্না ভ্যানিশ তো হলোই উপরন্তু নতুন তথ্য আবিষ্কারের আনন্দে আমার একই অঙ্গে আর্কিমিডিস ও আলেকজান্ডার! প্রথম জন আবিষ্কার করেছিলেন প্লবতার সূত্র, দ্বিতীয় জন ‘বিচিত্র এই দেশ’; আর আমার আবিষ্কার কলকাতার পেন-হসপিটাল (Pen Hospital)!

কলম মোটেই নির্জীব বস্তু নয়, তা বারবার প্রমাণ করেন কলম-প্রেমীরা। দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা এ ব্যাপারে বরাবরই এগিয়ে। মহম্মদ ইমতিয়াজ। বর্তমানে তিনিই সত্তরোর্ধ্ব পেন হসপিটালটির একমাত্র ‘চিকিৎসক’।

পেন হাসপাতালে মহম্মদ ইমতিয়াজ

শেফার্স, পার্কার, পাইলট, ভিসকন্টি, কাওয়েকো, মঁ ব্লাঁ, ওয়াটারম্যান, পাইলট, সেইলর, অরোরা, পেলিকান — নানা ধরনের বিদেশি কলমের সঙ্গে ক্লিক, আসা, ম্যা গনা কার্টা, গামা, রঙ্গা, কানরাইট ইত্যাদি দেশি কলম বাজারে এখন অচল বললে ভুল বলা হবে না। অথচ এক সময় তো এগুলোই ছিল সচল। দৈনন্দিন ব্যবহারে ধীরে ধীরে বাতিলের দলে চলে গিয়েছে ফাউন্টেন কালি-কলম। কলমেরও তো বয়স বাড়ে, বার্ধক্যজনিত অসুখ, বিরল কোনও অসুখ তাদেরও তো হয়। পুরোনো, অকেজো হয়ে যাওয়া কলম যাঁরা নিজেদের কাছে গুছিয়ে রাখেন, ব্যবহার করেন, যত্ন করেন, মর্যাদা দেন, তাঁরা বাদে কলমের খবর রাখে কজন?

তিন প্রজন্ম ধরে সেই খবর রাখছেন ইমতিয়াজবাবুরা। তাঁর দাদু সামসুদ্দিন শুরু করেন এই হাসপাতাল। এর পরে তাঁর বাবা মহম্মদ সুলতানের হাত ধরে মহম্মদ ইমতিয়াজ ও তাঁর ভাই মহম্মদ রিয়াজ এর দেখাশোনা করতেন। ইমতিয়াজবাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “বাবার কাছেই এ কাজ শেখা। তবে আমার অন্য ব্যবসাও ছিল, পুরোপুরি সময় দিতে পারতাম না। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার ভাই আর আমি মিলেই হাল ধরি। কিছুদিন আগেই ভাই মারা গেছে, এখন আমিই সামলাচ্ছি। সম্প্রতি যে ‘পেন উৎসব’ হয়ে গেল, আমাদেরও সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। আমরা শুধু পেন-চিকিৎসা করি না, দুষ্প্রাপ্য পেনও থাকে আমাদের সংগ্রহে। একা সবদিক গুছিয়ে উঠতে না পারায় উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।”    

মেরামতের সঙ্গে সঙ্গে পেন হসপিটালে পাওয়া যায় দেশি, বিদেশি, নিউ মডেল, রেয়ার কালেকশন, ভিন্টেজ, নতুন, পুরোনো, নিব, বল –সব ধরনের কলমই। ৩০’, ৪০’ অথবা ৫০’, ৬০’ দশকে যে কলমের দাম ছিল ১০০-২০০ টাকা, সেগুলোর দাম এখন ২০০০-৩০০০ তারও বেশি। দাম বেশি তবু এখনও রয়েছে চাহিদা। দেশ বিদেশ থেকে সেসব কলম কিনতে চেয়ে ঘন ঘন খরিদ্দারদের মেসেজ ঢোকে ইমতিয়াজবাবুর ফোনে। দিনের বেশিরভাগ সময় দোকানে বসেই কলম মেরামত করেন, অনেক সময় আবার ফোনে ডাক পড়ে, “বাড়িতে এসে কলমটা একটু দেখে যেতে পারবেন?” ইমতিয়াজবাবুও দিব্যি চলে যান রোগী দেখতে। কলমের ভিতরে অনেক ছোটো ছোটো পার্টস থাকে, এক সময় সেগুলো বিকল হয়ে পড়ে এবং পাল্টাতে হয়। অনেক সময় কালি পড়ে না, পুরো খুলে ওয়াশ করতে হয়। এরকম আরও বিভিন্ন সমস্যা।

এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনের ৪ নম্বর গেট থেকে বেরোলে বাঁ হাতেই যে গলি পড়ে, সেখানেই রয়েছে প্রবীণ হাসপাতালটি। যাঁরা এখানে ঢুঁ মেরেছেন তাঁরা জানবেন কতরকম বিচিত্র কর্মকান্ড এখানে চলে। হাসপাতালের কাঁচের আলমারিতে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে বা শুয়ে থাকে রোগীরা। চিকিৎসার জন্য হরেকরকম যন্ত্রপাতি তো আছেই, আছে আইসিইউ—কালি-জলে ডুবিয়ে রেখে অসুস্থ কলম পর্যবেক্ষণ। কোনও কোনও কলমের বয়স ইমতিয়াজবাবুর থেকেও বেশি, সেসবের জন্য বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। “অনেক রকম রোগ নিয়েই আমাদের দারস্থ হন কলমের মালিকরা। কোনওটা খুব জটিল রোগ, কোনওটা অল্প চিকিৎসাতেই সেরে ওঠে। কোনও কালি-কলমের নিব নষ্ট হয়েছে, তো কোনও কলমের চ্যানেল খারাপ হয়ে গিয়েছে, অথবা কলমের টিউব বদলাতে হবে, কোনও কলমে ওয়াশার পাল্টাতে হবে অথবা কোনও কলম এমন জ্যাম হয়েছে যে খোলাই যাচ্ছে না। সবের ওষুধ মেলে এখানে।” বলছিলেন ইমতিয়াজ।

“কেউ কেউ এখনও কলমের কদর করে বলে আমরা এখনও টিকে থাকতে পারছি। আগেকার কলকাতায় আমদের মতো আরও অনেকেই কলম মেরামত করতেন। আমরা যেমন তিন প্রজন্ম ধরে এই কাজ করছি, তেমন এরকম অনেকেই আছেন যাঁরা আমার দাদুর আমলে আসতো, এখন তাঁর নাতি-নাতনিরা আমার কাছে আসে।” ইমতিয়াজবাবুর বাচন ভঙ্গিমায় অনুরণিত হচ্ছিল কলমের প্রতি ভালোবাসা, যা তাঁর রক্তে মিশে আছে। ভালোবাসা না থাকলে এভাবে এই পেশায় টিকে থাকা যায় না, তা অল্প সময়েই বুঝিয়ে দেন বর্ষীয়ান এই কলম-চিকিৎসকক; তাঁর কালি মাখা হাত। আমরা হাজার প্রচেষ্টাতেও এই অনুভূতি ছুঁতে পারবো না। টাইপ ছাড়া গতি নেই তাই কলমের সঙ্গে দুরত্ব ক্রমশ বেড়েছে, একথা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। কলমের সঙ্গে মানসিক দুরত্বের জন্যই বোধহয় ব্যস্ততম মধ্য কলকাতায় ‘ভুত’-এর মতো অবস্থান ‘পেন হসপিটাল’-এর। এই দুরত্বের কারণেই যেন আমরা আজ বিশেষ ভাবে চিনছি-জানছি-বুঝছি কলমের কদর।

কলকাতায় আশ্চর্য হওয়ার অনেক কিছুই আছে, শুধু আমরাই খোঁজ রাখি না। আমার মতো এই প্রথম যাঁরা পেন হাসপাতাল আবিষ্কার করলেন তাঁদের আর একটা কথা জানিয়ে রাখি, এ শহরে কিন্তু একসময় জুতোর হাসপাতালও ছিল। সেকথা পরে কখনও বলা যেতে পারে।

_________ 

সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত

Written by