কলিকেতার কালি-কলম : বুকপকেটে বিদ্যাসাগর আর খাতায় শ্রী কাক্কেশ্বর কুচকুচে

ব্র্যান্ডের নাম ‘কলিকেতা’, নস্টালজিয়ায় ব্যবসা দুই তরুণের

“ও মন কখন শুরু, কখন যে শেষ, কে জানে/ এ যে বাজিকরের খেলারে মন, যার খেলা হয় সে জানে।”

ব্র্যান্ডের নাম কলিকেতা। ঝর্ণা কলম ও কালি প্রস্তুতকারক। হাতে তাঁদের কলম ও কালি নিয়ে লিখতে লিখতে অনেকেরই এই গানের লাইনগুলো মনে পড়তে পারে। বাজিকরের খেলার মতোই সুগন্ধি ঝর্ণাকালি আপনার মন মাতিয়ে দেবে। ফিরে যাবেন পু্রোনো কলকাতার নস্টালজিয়ায়। বেলফুলের গন্ধে ভরা কালি আপনাকে পৌঁছে দেবে সেকেলে বাবু কালচারের কলকাতায়। কলিকেতার কালির নামগুলিও বেশ চমকপ্রদ। কালো কালির নাম ‘শ্রী কাক্বেশ্বর কুচকুচে’। (হযবরল-র গেছোদাদার কথা মনে পড়ে গেল তো?) আবার লাল কালির নাম ‘রক্তকরবী’, নীল কালির নাম ‘নীলদর্পণ’, গেরুয়া কালির নাম ‘স্বামীজী’। কালির ঝুলিতে রয়েছে আরো অনেক অনেক নাম- গোলাপি মুক্তা রহস্য, রক্তমুখী নীলা, অরণ্যের দিনরাত্রি, সবুজ দ্বীপের রাজা, আকাশ কুসুম, নীললোহিত, নীল নির্জনে ইত্যাদি।

কলিকেতার ট্যাগলাইন হল- বাঙালির জন্য, বাঙালির দ্বারা, বাংলায় প্রস্তুত। বোঝাই যাচ্ছে যে এই কালি ও কলম পুরোটাই বাঙালির আবেগ, জাত্যাভিমান, স্বদেশিয়ানাকে জাগিয়ে তুলছে।

এখানেই শেষ নয়, বাংলা হরফে বিদ্যাসাগর, আশুতোষ, মধুসূদন, কাদম্বিনী, অরবিন্দ নাম লেখা ঝর্ণা কলমগুলি আপনাকে নিয়ে যাবে উনিশ শতকের কলকাতায়। দেখবেন, বুকপকেটে দেশবন্ধু, দীনবন্ধু, চারুলতা নামের কলমগুলি রাখলেই দেশপ্রেমের রোমাঞ্চ জেগে উঠছে। 

বাজিকরের এই খেলার নেপথ্যে থাকা কলিকেতার ট্যাগলাইন হল- বাঙালির জন্য, বাঙালির দ্বারা, বাংলায় প্রস্তুত।

বোঝাই যাচ্ছে যে এই কালি ও কলম পুরোটাই বাঙালির আবেগ, জাত্যাভিমান, স্বদেশিয়ানাকে জাগিয়ে তুলছে। তাই ক্রেতারাও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। হৈ হৈ করে বিক্রি হচ্ছে কলিকেতার কালি ও কলম। 

ব্যাপারটা কী? বাঙালি আজকাল যখন কেবলই এগিয়ে যাচ্ছে, ল্যাপটপ-মোবাইলে লিখে লিখে অভ্যস্ত, তখন কোন ভোজবাজিতে ঝর্ণা কলম আর কালি বাজার মাত করছে? প্রশ্ন করেছিলাম কলিকেতার অন্যতম বাজিকর সম্রাট হুইকে। বারাসাতের বাসিন্দা সম্রাট হুই একটি প্রকাশনী সংস্থার কর্ণধার। তার আগে তিনি ব্যাংককর্মী ছিলেন। কালি ও কলমের ব্যবসায় তাঁর এসে পড়া নেহাত দৈব ঘটনা বা দুর্ঘটনা। সম্রাট বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “আমরা একদম ঘরোয়া পদ্ধতিতে কালি তৈরি করেছি, এফ এন গুপ্ত (ফনীন্দ্রনাথ গুপ্ত) যেভাবে আদিকালে কালি বানাতেন। শুরু থেকেই বাঙালিয়ানাকে গুরুত্ব দিয়েছি। আমাদের ভাবনাটা সেকেলে। তাই আমাদের প্যাকেজিংও আগেকার দিনের মতো। কালির দোয়াত দেখলে মনে হবে, স্বদেশি যুগের।”

কলিকেতার কালি তৈরির নেপথ্যে বাজিকর সায়ন ভট্টাচার্য্য। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশুনো মাঝখানে থামিয়ে বেলেঘাটার সায়ন মাস কমিউনিকেশনে ভর্তি হন। স্কুল পালিয়ে পুরোনো কলকাতা আবিষ্কার করা ছিল তাঁর এককালের নেশা। তারপর সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে সায়ন প্রকাশক হয়ে ওঠেন। সেই সুবাদেই তিনি প্রথমে নিজের হাতে শুধুমাত্র লেখকদের উপহারের জন্য সুগন্ধি কালি তৈরি করেন এ বছরের বইমেলায়।

উপহারের জন্য রাখা কালি অচিরেই বিক্রি হয়ে যায়। সায়নের তৈরি সুগন্ধি কালি ক্রেতাদের কাছে পরম সমাদৃত হয়। সায়ন বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “বইমেলায় আমার বই বিক্রি হয়েছিল দু-চারটে। কিন্তু ২০০ বোতল সুগন্ধি কালি বিক্রি হয়ে গেল নিমেষে। বাংলা হরফে বিদ্যাসাগর নাম লেখা কলমও সব বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।” 

এটাই সায়নদের কালি ও কলম ব্যবসার সলতে পাকানোর পর্ব ছিল। বাঙালি যে ব্যবসাবিমুখ নয়, তার প্রমাণ রেখেছেন বহু খ্যাতনামা বাঙালি। প্রথম থেকে সে পথেই হাঁটতে চেয়েছিলেন সম্রাট ও সায়ন। গত ১১মার্চ বাণিজ্যিকভাবে সায়ন ও সম্রাটের কোম্পানি কলিকেতা-পত্তন হয়। তাঁদের এই কয়েক মাসে ১০ হাজারের বেশি কালির দোয়াত বিক্রি হয়েছে, সাড়ে তিন হাজারের বেশি ঝর্ণা কলম বিক্রি হয়েছে। ৩৬ বছরের সম্রাট নিজেদের সাফল্যে খুশি। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, “আমরা তিন , চার হাজার এমন ক্রেতাকে কালি ও কলম বিক্রি করেছি, যারা অতীতে কখনো ঝরনা কলম বা কালি ব্যবহার করেননি। যারা ঝর্ণা কলম ব্যবহার করেন নিয়মিত, তাদের বাইরে বিপুল সংখ্যক মানুষের হাতে এই কলম তুলে দিতে পেরে ভালো লেগেছে।” 

ফাউন্টেন পেন তো সভ্যতার পিছনে পড়ে যাওয়া একটা সামগ্রী। ১৯৯৫ সালের পর থেকে এর ব্যবহার কমতে কমতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সেটাকে বাজারে আবার ফিরিয়ে আনলেন কী ভাবে?

ফাউন্টেন পেন তো সভ্যতার পিছনে পড়ে যাওয়া একটা সামগ্রী। ১৯৯৫ সালের পর থেকে এর ব্যবহার কমতে কমতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সেটাকে বাজারে আবার ফিরিয়ে আনলেন কী ভাবে? সম্রাট বলেন, “আমরা সারাদিনে খুব কম লিখি। মূলত আমাদের লেখালেখি কমে গেছে। চিঠির বদলে এখন আমরা ইমেল করি। তাই হাতে লেখাটাই এখন শৌখিনতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। যতটুক লেখা হয় সেটা সুন্দর করে মানুষ লিখতে চেষ্টা করে। সেজন্যই ঝরনা কলমের আবার দর উঠেছে। ২০১৫ এর পর থেকে ধীরে ধীরে সুলেখা কোম্পানি নতুন যাত্রা শুরু করেছে। করোনাকালীন সময়ে মানুষ ফাউন্টেন পেনের প্রতি আবার আগ্রহ পেয়েছে।”

কলিকেতার দাবি, এমনিতে সুগন্ধি কালি বাজারে পাওয়া যায় না। সেখানে তিন রকমের সুগন্ধযুক্ত কালি তারা বাজারে এনেছেন। বেল ফুলের গন্ধ ছাড়াও ক্যাপুচিনো কফির গন্ধযুক্ত কফিহাউস নামের কালি এবং অরণ্যের দিনরাত্রি নামক কালির ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ মানুষকে আকর্ষিত করেছে। 

বাংলায় নাম লেখা কলম বুকের পকেটে গুঁজে রাখার গৌরব, একজন মধ্যবিত্তের জাত্যাভিমান উস্কে দিতে পারে। তাই কলিকেতা তাদের কলম ও কালির দাম রেখেছে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। 

সম্রাট হাসতে হাসতে বলেন, “বনলতা কলমের ছবি কিন্তু আমাদের কাছে নেই। যেদিন বনলতা আমরা প্রকাশ্যে আনি, সেদিনই এই কলম সব বিক্রি হয়ে যায়। ফলে আমরা ছবি তুলতে পারিনি।”

দিল্লি, মুম্বাই সহ দাক্ষিণাত্যে কলিকেতার সুগন্ধি কালির চাহিদা রয়েছে। প্রচুর অর্ডারও আসছে। কিন্তু বাংলার বাইরে ইংরেজি হরফে প্যাকেজিং করে সুগন্ধি কালি বেচতে নারাজ কলিকেতা। এই বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার হাওয়াতেই বেড়ে উঠতে চান তাঁরা।

পুরোনো কলকাতাকে নব নব রূপে প্রত্যক্ষ করার অদম্য ইচ্ছে থেকেই সায়ন আজ এই পথের পথিক। হিন্দু স্কুলের সেই স্কুল পালানো ছেলেটির মাথায় এখনও গিজগিজ করছে পুরোনো কলকাতার নানা সামগ্রী। তাই অদূর ভবিষ্যতে কলিকেতা ব্র্যান্ড আরো এমন কিছু বাজারে আনবে, যা আবার নস্টালজিয়া জাগিয়ে তুলবে। আপাতত সেসব রহস্যই রাখতে চান তাঁরা।
 

Developed by DXDasia