বাঙালির চৈত্র সেল : অনলাইনের যুগেও অমলিন ফুটপাথ

চৈত্র শেষের তপ্ত দুপুরে বাঙালির কেনাকাটা

১০০ টাকায় চারটে হাফ 
২০০ টাকায় দুটো ফুল!
দাদুও কুল নাতিও কুল!!

কাল সকাল সরগরম ফুটপাথ, তবে এমন ডাকে চমকাচ্ছেন না কেউ! কাঁধে বিগশপার ঝুলিয়ে সকলেই ব্যস্ত নিজের নিজের নিশানায়। নিশানাই বটে! গামছা, তোয়ালে, বালিশের কভার দিয়ে শুরু আর শেষ শাড়ির অনন্ত সমুদ্রে। এ ছবি চৈত্র মাসের মঙ্গলা হাটের। ১০০ টাকায় চারটে হাফ প্যান্ট, ২০০ টাকায় দুটো ফুল প্যান্ট। ফি মঙ্গলবার হাট বসে। সোমবার রাত থেকেই শুরু হয়ে যায় পাইকারি বাজারের বেচাকেনা, মঙ্গলবার ভোর থেকে সাধারণ ক্রেতাদের আনাগোনা। সারাবছর একই নিয়ম। তবে এই ছবি খানিকটা বদলে যায় চৈত্র আর আশ্বিন মাস এলে। (বাঙালির চৈত্র সেল)

এখন মেট্রোপথ চালু হয়ে যাওয়ায় অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা ক্রেতার ভিড় বেড়েছে। ভোরের হাওয়া মেখে চৈত্রের কেনাকাটার মহাযজ্ঞ চলে। অনেকেই এই সময় সারা বছরের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কেনাকাটা করে নেন। হাওড়ার বেলগাছিয়া থেকে এসেছেন অনুরাধা মণ্ডল। বয়স ষাটের কোঠায়। দিব্যি হাটের ভিড় ঠেলে চলতে পারেন। দরদামে তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া মুশকিল। হাঁটুর ব্যথা কাহিল করলেও ভালোবাসেন সেলের বাজার। কেন ভালো লাগে ভিড় ঠেলে দরদাম? এক গাল হেসে তাঁর উত্তর, “এ যে বড়ো নেশা! দরাদরি করে দোকানিকে হার মানালে মনে হয় ফুটবল মাঠে গোল দিলাম!” তাঁর সঙ্গিনী প্রৌঢ়া মিনতি মান্নার কথায়, “ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি বছরে দুবার কেনাকাটা হত। আশ্বিন আর চৈত্রে। বড়ো সংসারে মাথা অনেক, নাহলে সামাল দেওয়া যেত না। এখনও তাই না এসে থাকতে পারি না।” এক সময় দুই বন্ধুতে হাতিবাগান-শ্যামবাজার-গড়িয়াহাটের চৈত্র সেলের বাজারেও ঢুঁ মারতেন। এখন শরীরে কুলায় না তাই ঘরের কাছের হাওড়া ময়দানই বিকল্প। পুজোর কেনাকাটাও শুরু করে দিয়েছেন ওঁরা। (বাঙালির চৈত্র সেল)

দুপুরের ভাতঘুম কুরবান করে চৈত্রের রোদ গায়ে মেখে বেরিয়ে পড়া। তাপমাত্রা ৩৫ হোক বা ৩৭ তাতে কী! গন্তব্য গড়িয়াহাট! বাসন্তী দেবী কলেজের ফুটপাথ ধরে চলতে চলতে চোখে ঝিলমিল লেগে যায় গৃহিনীর। জামদানি নয়, বালুচরি নয়, চোখ খোঁজে শুধু মনের মতো ছাপা শাড়ি।

বাংলা বছরের শেষ মানে মহাছাড়। দুর্গাপুজো আর পয়লা বৈশাখ বাঙালির নতুন জামা পরার পরব। মূলত পয়লা বৈশাখের কারণেই চৈত্রের কেনাকাটার হিড়িক লাগে। নগদ দামে বড়ো ছাড় পাওয়া যায়, এছাড়াও থাকে নানারকম অফার। বড়ো দোকানের ক্ষেত্রে চৈত্র সেল মূলত স্টক ক্লিয়ারেন্স। হালখাতার প্রাক্কালে পুরোনো স্টক খালি করে বছরের হিসাব মেটানো। এই সব স্টোরের সামনেও অনেকসময় স্টকের পণ্য বিশেষ ছাড়ে ফুটপাথে বিক্রি করা হয়। মলের সামনেও ৫০ শতাংশ ছাড়ের হ্যাঙ্গার ঝোলে। ভিড় ঠেলে যারা ভিতরে ঢুকতে চান না, তাঁরা অনেকেই এখান থেকে কিনে নেন। তবে সবই যে পুরোনো স্টক এমন নয়। বহু ছোটো ও মাঝারি ব্যবসায়ী নতুন স্টক তোলেন। অনলাইনের দৌলতে ৫০-৬০ শতাংশ ছাড় ক্রেতাদের মনে আলাদা চমক না জাগালেও পুরোনো হয়নি সস্তায় কেনাকাটার আকর্ষণ। এখানেও ফুটপাথের টান অপ্রতিরোধ্য। (বাঙালির চৈত্র সেল)

দুপুরের ভাতঘুম কুরবান করে চৈত্রের রোদ গায়ে মেখে বেরিয়ে পড়া। তাপমাত্রা ৩৫ হোক বা ৩৭ তাতে কী! গন্তব্য গড়িয়াহাট! বাসন্তী দেবী কলেজের ফুটপাথ ধরে চলতে চলতে চোখে ঝিলমিল লেগে যায় গৃহিনীর। জামদানি নয়, বালুচরি নয়, চোখ খোঁজে শুধু মনের মতো ছাপা শাড়ি। বাটিকের কাফতান, কলমকারীর প্লাজো, খেসের ৱ্যাপ এ রাউন্ড এ সবও চোখ টানছে। ব্লক প্রিন্টের স্লিভলেস কুর্তা, মানানসই ঝুমকো, ব্যাগ, রানার, বেডশিট, কুশন কভার, পাপোষ থেকে সেরামিকসের বাটি, স্টিলের চামচ- বাড়তেই থাকে লিস্টটা। গরমে ফ্রিজে রাখার জন্য বাড়তি জলের বোতল এমনকী কাপড় শুকোতে দেওয়ার দড়ি আর ক্লিপগুলোও যেন এখনই কিনে ফেলতে হবে। দরদামের শেষ নেই! মধ্যবিত্তের সংসার সেজে ওঠে নতুন বছরের সাজে। হয়তো নগণ্যই, তবুও যেন মায়া লেগে থাকে। গ্রীষ্মের দুপুরে হঠাৎ আসা অতিথিকে এগিয়ে দেওয়া বাতাসা জলের মতো। (বাঙালির চৈত্র সেল)

ঘরে বসে অনলাইনে শপিং আর আধঘণ্টায় ডেলিভারির সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই জায়গাতেই চৈত্র সেলের বাজার এক আরাম। ব্যাপারটা কেমন? কালীঘাটের বাসিন্দা গৃহবধূ মন্দার ভৌমিকের কথায়, “নতুন জিনিস নেড়েচেড়ে বেছে দেখে কেনার একটা আনন্দ আছে, এমন কেনাকাটির গল্পগুলো অনেক বেশি আপন হয়। বাড়ি ফিরে বলতে ভালো লাগে। মনে হয় নিজের চেনা ঘর, ঘরের মানুষদের নতুন করে ভালোবাসছি।” কেনাকাটার ফাঁকে মহানন্দে লেবুজল, শরবতের দিকে চোখ চলে যায়। মন কেড়ে নেয় পেয়ারা মাখা, কুলফি। জীবন যেন নতুন করে স্বাদ ফিরে পায়, ঘেমে নেয়ে সে এক তুরিয়ো আনন্দ!

হাতে হাতে স্মার্ট ফোন, অনলাইন ব্যাঙ্কিং বদলে দিয়েছে ক্রয় বিক্রয়ের সামগ্রিক চরিত্রটাই। আবার এখন অনলাইনেও চলে চৈত্র সেলের উৎসব। কিন্তু সেখানে বৈশাখী গরমে বাড়ির খুকুমনির নরম ছিটের ফ্রক কি পাওয়া যায় কিংবা ছোট্ট সোনার ফতুয়া? মনে হয় না।

মন্দারদেবীর মতো বহুমুখের ভিড় থাকা সত্ত্বেও চৈত্র সেলের সেই রমরমা দিনে ভাটা পড়েছে। উত্তরের হাতিবাগান আর দক্ষিণের গড়িয়াহাট দুই বাজারকেই ধাক্কা দিয়েছিল করোনা। তার ওপর নতুন নতুন শপিং মল আর অনলাইনের দাপটে চৈত্রের ভিড় আজ অনেকটাই ফিকে। হাতিবাগানের ব্যবসায়ী অমর মিত্রর কথায় (নাম পরিবর্তিত), “পাঁচ বছর আগের ছবির সঙ্গে আজকের চৈতি বাজারের ছবিটা মেলাতেই পারি না।” এমনকী মফস্সলেও বাড়ছে অনলাইন শপিং-এর প্রবণতা। অনলাইন স্টোরের কেনাকাটায় সারাবছর ধরে চলতে থাকে ডিসকাউন্ট আর অফারের ধুম। সামার, মনসুন, স্প্রিং ছাড়াও ফেস্টিভ সেল-প্রতি মাসে এন্ড অফ সিজন, প্রতিদিনের ফ্ল্যাশ সেল। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস আর ব্ল্যাক ফ্রাইডে তো আছেই। হাতে হাতে স্মার্ট ফোন, অনলাইন ব্যাঙ্কিং বদলে দিয়েছে ক্রয় বিক্রয়ের সামগ্রিক চরিত্রটাই। আবার এখন অনলাইনেও চলে চৈত্র সেলের উৎসব। কিন্তু সেখানে বৈশাখী গরমে বাড়ির খুকুমনির নরম ছিটের ফ্রক কি পাওয়া যায় কিংবা ছোট্ট সোনার ফতুয়া? মনে হয় না।

টেকস্যাভি জনতার বাইরেও আছে এক বৃহৎ গোষ্ঠী, যাঁরা স্মার্টফোনে সড়গড় নন, অনেকের কাছে আজও স্মার্টফোন অধরা, অনলাইন কেনাকাটায় চৌকস নন বা ভরসা নেই-তেমন মানুষও আছেন, তাঁদের কিন্তু অফলাইনই একমাত্র অবলম্বন।  তাই বাঙালির চৈত্র সেলের গল্প কখনও ‘ব্যাকডেটেড’ হয় না। এ বছর চৈত্র শেষের আগে থেকেই ভোগাচ্ছে কালবৈশাখী, তার ওপর বেজেছে ভোটের বাদ্যি। তাই চৈত্র সেলের উৎসব কেমন জমবে সে নিয়ে চিন্তায় বাজার।
 

Developed by DXDasia