সদ্য প্রয়াত ভারতীয় শিল্পীদের সম্মান জানাতে চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ

সাতজন সদ্য প্রয়াত শিল্পীদের উল্লেখযোগ্য কাজ চলচ্চিত্র উৎসবে

যাঁরা মারা যান, তাঁরা আর ফেরেন না। কথাটি কি ঠিক? তাঁদের শরীর ফেরে না ঠিকই। কিন্তু মনে-প্রাণে প্রত্যেকেই নিজের নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে থেকে আজীবন। এই থেকে যাওয়ার মধ্যে কোনো মৃত্যু নেই। অসম্ভব এক একটি দীর্ঘ রাস্তা দেখার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন তাঁরা। তাঁরা শিল্পী – আর শিল্পীদের মৃত্যু নেই। প্রতিদিন তাঁদের কাজের বিস্ময়ের মধ্যে জন্মান একটু একটু করে। প্রতিদিন আবিষ্কৃত হয় তাঁদের অসামান্য কাজগুলি। গত একবছরে প্রয়াত হয়েছেন চলচ্চিত্র জগতের মণিমুক্তরা। তাঁদের নিয়েই ২৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ বিভাগ ‘হোমেজ’। ভারতবর্ষের সাতজন শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাবে চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষ। 

১৭ মার্চ, ৭৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন অভিনেতা চিন্ময় রায়। কৌতুকাভিনেতা হিসেবে জনসমাদর লাভ করেছিলেন চিন্ময়। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে উপহার দিয়েছেন একের পর এক হিট-সুপারহিট ছবি। তপন সিন্‌হার হাত ধরে ১৯৬৬ সালে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। ‘গল্প হলেও সত্যি’ তাঁর প্রথম অভিনীত ছবি। তারপর ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘মৌচাক’, ‘চারমূর্তি’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শককেও করে তুলেছিল প্রাণবন্ত।

পরিচালক-অভিনেতা-নাট্যকার গিরিশ কারনাডকে আমরা হারালাম ১০ জুন। থিয়েটার ছাড়াও নিজের হাত পাকিয়েছিলেন চলচ্চিত্রেও। কন্নড় চলচ্চিত্র পেয়েছিল এক নতুন ভাষা। ভারতের জাতীয় পুরস্কার ছাড়াও পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, জ্ঞানপীঠ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।

মোহাম্মদ জাহুর খৈয়াম একজন প্রবাদপ্রতিম সংগীত পরিচালক। ‘কভি কভি’ ও ‘উমরাও জান’-এর মতো ছবির প্রত্যেকটি সংগীত তাঁর হাতেই তৈরি। মোহাম্মদ জাহুর হাশমিকে খৈয়াম নামেই সবাই চেনেন। ১৭ বছর বয়সে লুধিয়ানাতে থাকার সময় সঙ্গীত নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথম সুযোগই পেয়েছিলেন ‘উমরাও জান’-এ কাজ করার। সেই থেকেই বলিউডে পাকা জায়গা তৈরি করে ফেলেছিলেন।

মৃণাল সেন দেহত্যাগ করেন ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘রাত-ভোর’। সাফল্য পায়নি। ‘নীল আকাশের নিচে’ স্থানীয় পরিচিতি এনে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ‘বাইশে শ্রাবণ’ থাকে তিনি পান একের পর এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল উৎপল দত্ত অভিনীত ‘ভুবন সোম’। মৃণাল সেনের নিজের খুব কাছের ছবি ছিল এটি। মৃণালবাবুর ছবির টেকনিক্যাল ইস্যু যেকোনো চলচ্চিত্রবোদ্ধার আলোচনার বিষয়। সিনেমার সমস্ত ব্যাকরণকে অস্বীকার করে সৃষ্টি করেছিলেন নতুন একটা পথ। যে পথে একসময় হাঁটতে চেয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকেই। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমস্যা, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের হয়ে বারবার সোচ্চার, মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে বারবার প্রশ্ন করা ছিল তাঁর অভ্যাস।

রুমা গুহঠাকুরতার পরিচয় অভিনেত্রী এবং গায়িকা। ১৯৫২ সালে  কিশোর কুমারকে বিয়ে করেন।  ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার। সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’ ও ‘গণশত্রু’ ছবিতে অভিনয় করেন রুমা। এমনকি ‘তিনকন্যা’র ‘মণিহারা’ গল্পে অভিনেত্রী কণিকা মজুমদারের লিপে ‘বাজে করুণ সুরে’ গানটি গান রুমা।

অভিনেতা স্বরূপ দত্তের নাম শুনেছেন খুব কম দর্শক। উৎপল দত্তের হাত ধরে একসময় অভিনয় জীবনে প্রবেশ করেছিলেন স্বরূপ। তপন সিন্‌হার ‘আপনজন’ তাঁর প্রথম অভিনীত ছবি। ষাট ও সত্তরের দশকে অভিনয় করেছেন প্রধান চরিত্রে। ১৭ জুলাই ২০১৯-এ তাঁকে হারাল বাংলা চলচ্চিত্র।

১৮ বছর বয়সে মিস বম্বে হয়েছিলেন বিদ্যা সিনহা। বিখ্যাত পরিচালক বসু চ্যাটার্জীর হাত ধরে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করলেন বিদ্যা। তৎকালীন বলিউড সিনেমাকে উপহার দিয়েছেন একের পর এক হিট ছবি। ‘রজনীগন্ধা’, ‘ছোটি সি বাত’, ‘ইনকার’-এর মতো ছবির হিরোইন ছিলেন তিনি। তাঁর রূপের ছটা পাগল করেছিল সত্তরের উত্তাল ভারতবর্ষকে। ১৫ অগাস্ট চলচ্চিত্রকে টাটা করে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ভাবলে অবাক লাগে, তিনি জন্মান ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময়। আর প্রয়াত হন ১৫ অগাস্ট। শিল্পীদের রহস্য হয়তো এখানেই। 

এই সাতজন প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতেই ২৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ বিভাগ ‘হোমেজ’। তাঁদের স্মরণে কোন কোন ছবি দেখানো হবে জেনে নিন –

চারমূর্তি (১৯৭৮) – ১১ নভেম্বর – রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন – সন্ধে ৬-০০
সংস্কার (১৯৭০) – ৯ নভেম্বর – রবীন্দ্র সদন – সকাল ৯-১৫
বাজার (১৯৬৯) – ১৩ নভেম্বর – চলচ্চিত্র শতবর্ষ ভবন – বিকেল ৪-০০
ভুবন সোম (১৯৬৯) – ১৩ নভেম্বর – চলচ্চিত্র শতবর্ষ ভবন – সন্ধে ৬-০০
বানারসি (১৯৬২) – ১৪ নভেম্বর – রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন – সন্ধে ৬-০০
আপনজন (১৯৬৮) – ১৫ নভেম্বর – রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন – সন্ধে ৬-০০
রজনীগন্ধা (১৯৭৪) – ১২ নভেম্বর – চলচ্চিত্র শতবর্ষ ভবন – বিকেল ৪-০০

Developed by DXDasia