
‘নীহারিকা’ ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য লিখছেন এ ছবির শুরুর দিনগুলোর কথা
প্রথম সপ্তাহে সিনেমাহল পাওয়া-না পাওয়ার দোলাচল কাটিয়ে শহরে এখন বেশ রমরমিয়েই চলছে ইন্দ্রাশিস আচার্যর ছবি নীহারিকা (Indrasis Acharya Niharika)। নন্দন, রাধা স্টুডিও এবং কিছু মাল্টিপ্লেক্সে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল তৃতীয় সপ্তাহেও বেশ ভালো চলছে এ ছবি। পরিচালক আগে বলেছিলেন, এ ছবির জন্য শহরে কোনো ব্যানার বা ফ্লেক্স লাগাতে পারেননি। মিডিয়ার প্রচারও তেমনভাবে চোখে পড়েনি। শুধু দর্শক পাশে থেকেছে। তাঁরা এ ছবি দেখে নিজেরাই বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করেছেন। একবার নয়, একাধিকবার এ ছবি দেখতে গিয়েছেন সিনেমাহলে। শিমূলতলার মায়াবী ল্যান্ডস্কেপে মেয়ে শরীর ও মনের যাতনা বুনেছেন ইন্দ্রাশিস। এ ছবির চরিত্রদের যেন কোনো তাড়া নেই। শিমূলতলার ওই রুক্ষ প্রকৃতির মতোই। এই প্রথম কোনো অনলাইন/অফলাইন প্ল্যাটফর্মে এ ছবি তৈরি করা এবং শুরুর দিনগুলো নিয়ে কলম ধরলেন পরিচালক ইন্দ্রাশিস নিজেই। বঙ্গদর্শন.কম-এ পড়ুন পরিচালকের সেই এক্সক্লুসিভ বয়ান।
__________

নীহারিকায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতে শুরুর দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে চোখে খানিক নীহারিকাই দেখতে পাই।
পিউপা পরবর্তী সে এক সময়, যখন আমার কাছে নারীকেন্দ্রিক চিত্রনাট্য নিয়ে বেশ কিছু ডাক এসেছিল। শংকরের একটা উপন্যাসের রাইট কিনে সুরিন্দর ফিল্মস বেশ খানিকদূর অবধি এগিয়েও ছিল, অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। কিন্তু ওই যা হয়, আচানো হয়নি সেগুলো। পিউপা তখনও ফেস্টিভ্যালে অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছে, আমার হঠাৎই মনে পড়ে যে, ভয়ের রাইট তো আমার নেওয়া আছে, এটা নিয়ে কোনো চিত্রনাট্য তো তৈরি করিনি। সেই-ই শুরু আমার নীহারিকা নিয়ে যাত্রা। সালটা ২০১৮, চাকরি সূত্র ছাড়া শুধু সিনেমা নিয়ে বহু জায়গায় ফেস্টিভালে যাওয়ার কারণে নতুন জায়গা, অপরিচিত সমাজ, দেশ-বিদেশ মিলিয়েই, সে এক ট্রাভেলার লাইফ। নতুন প্রযোজক পাইনি, শুরু করলাম ভয় উপন্যাসের চিত্রনাট্য লেখা। এত জায়গায় ঘোরা, এত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, মেয়ে, বলা ভালো নারী চরিত্রকে একটা অন্যজগতে দেখতে পাওয়া, এদিকে সমাজেও নানান দিকবদলের হাতছানি, সবটা মিলিয়ে আমি দীপা তৈরি করলাম নীহারিকায়। কিন্তু মজা হল এই সবকিছুর মাঝে একটা ফেস্টিভ্যালেই অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর সঙ্গে পরিচয় এবং ওঁর আশ্বাসে একটা স্ক্রিপ্ট লেখা, পার্সেল তৈরি হওয়া, সবই হয়ে গেলো। অন্য দিকে আমি দীপাকে বড়ো পর্দায় তৈরি করার জন্য পাগল হয়ে উঠলাম।

পার্সেলের সময় থেকেই লকডাউন, বন্দি জীবন, মানুষের একলা বেঁচে থাকার লড়াই আর বাস্তবতা আমাকে উদ্বেল করে তুলল নীহারিকার জন্য। বেশ কিছু প্রযোজক এলেন, কথা দিলেন নীহারিকায় হারিয়ে যাওয়ার, কিন্তু নানান কারণে কিছুই হল না। শুধু তো দীপা চরিত্র নয়, আমরা এখন এআই, চ্যাটজিপিটি, গুগুল ম্যাপ, সবকিছুর মধ্যেই জড়িয়ে গেছি। এইসব কিছুর আগের জীবন কেমন ছিল ভুলে গেছি। বলা উচিত, গুলিয়ে গেছে সব কিছু আমাদের। তারপর কিছু প্রযোজক একের পর এক যোগাযোগ করলেন, আমরাও সাড়া দিলাম, কিন্তু পর পর প্রায় তিনবার শুটিং এর কিছুদিন আগে থেকে সেই প্রযোজকরা আর ফোন ধরলেন না। তখন ঠিক করলাম আমরা নিজেরাই করব, দেখা যাক না কী হয়।
এসবের মধ্যে একবার সুযোগ ঘটল আমার শিমূলতলা যাওয়ার। উফফফ, কী প্রশান্ত সেই অভিজ্ঞতা! ধূ-ধূ প্রান্তর, হুস-হুস করে এক-একটা গাড়ি রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে, একটা বাড়ির থেকে অন্তত ১০ মিনিট হাঁটার পরে আরেকটা বাড়ি, সন্ধে নামছে মায়াবী আলো ছড়িয়ে দিয়ে, বহু দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো সুর, বাড়িতে শুধু দেখভাল করার কেউ আছে, মালিক পরবাসী, টুপটাপ আলো জ্বলে উঠছে আনাচে-কানাচে, মুড়ি মাখা আর চপ নিয়ে ঝুপড়ি দোকানী বসে আছে। আমার মাথায় নীহারিকা গেঁথে গেলো। না করতে পারলে যেন আর কোনো সিনেমা করতে পারবো না।

কলকাতায় ফিরে যোগাযোগ হল প্যাস্টেলের সঙ্গে। ওরা বলল শুরু করে দেওয়াটুকু ওরা আছে, বাকিটা সবাই মিলে দেখা যাক যদি করে ওঠা যায়। তখন মনে হচ্ছিল কিছু করে নিতেই হবে, নাহলে যেন নিস্তার নেই নিজের থেকে নিজের। এতকাল শুনেছিলাম আর্টিস্টিক পেইন, নীহারিকা নিয়ে নিজে অনুভব করেছি যাতনা। শিল্পীর গর্ভ যন্ত্রণা। বৈশাখের তীব্র গরমে রোল- সাউন্ড-ক্যামেরা-অ্যাকশন বললাম নীহারিকার জন্য।
স্বল্প পুঁজি তাই নিয়েই যা তুলে আনলাম ক্যামেরায় সেটুকুই ছোটো করে একটা টিজার বানিয়ে পাঠালাম যত মানুষকে চিনি জানি, আত্মীয়তা আছে সবার কাছে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দেখেছি দেশ-বিদেশের মানুষের নীহারিকার জন্য সাড়া ফেলে দেওয়া। আত্মীয়, বন্ধু, পরিজন সবাই দু-হাত তুলে এগিয়ে এসেছে নীহারিকার জন্য। একটাই কথা সবার থেকে শুনেছিলাম সেদিন এই সিনেমা বানাতেই হবে, এতখানি সাহস আর ভরসা জানি না কখনও কোনো প্রযোজক দেন কিনা। অদ্ভুত এক স্বপ্নের সময় মনে হচ্ছিল এইসব কিছুকে।

পার্সেলের সময় থেকেই লকডাউন, বন্দি জীবন, মানুষের একলা বেঁচে থাকার লড়াই আর বাস্তবতা আমাকে উদ্বেল করে তুলল নীহারিকার জন্য। বেশ কিছু প্রযোজক এলেন, কথা দিলেন নীহারিকায় হারিয়ে যাওয়ার, কিন্তু নানান কারণে কিছুই হল না। শুধু তো দীপা চরিত্র নয়, আমরা এখন এআই, চ্যাটজিপিটি, গুগুল ম্যাপ, সবকিছুর মধ্যেই জড়িয়ে গেছি।
হ্যাঁ, এখানে বলতে হবেই, এই এত মানুষের এত সহায়তা প্যাস্টেল ছাড়া কী করে সামলাতাম! প্রতিটা মানুষের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কন্ট্র্যাক্ট করা, কে কত টাকা দিয়েছেন তার নিখুঁত হিসেব রাখা, ওরা ছাড়া পেরে উঠতাম না। তেমনি আমার টিম, সবাই নিজের সবটুকু নিয়ে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা নীহারিকা তৈরি করবে বলে। তীব্র গরম থেকে প্রবল বর্ষা পেরিয়ে ৬ ডিগ্রির ঠান্ডা, নীহারিকা সব ঋতুর সমাহারে গাঁথা হল। লুব্ধক নিজেই বলল এডিট করবে, সুকান্ত রাশ দেখে নিজের মনের মতো সাউন্ড করল, জয় তো আজও নীহারিকার মধ্যেই হারিয়ে আছে। অভিনেতা থেকে ক্রিউ এবং অফিস, একদিন কীভাবে যেন ভেসে গেলাম সবাই নীহারিকায়। বাহ্যিক কোনো বাধাই রুখতে পারল না আমাদের। তা সে গিল্ড হোক বা শ্যুটিং কস্ট, গোটা টিম যেন একে অপরের পরিপূরক। শুধু তাই নয় রিলিজ করতে পারব কিনা ঠিক ছিল না। বহু ভালো ফেস্টিভ্যাল থেকে প্রশংসা পাবার পর শহরে বা রাজ্যে ছবি না দেখানোর একটা যন্ত্রণা আছে। সেই সময় ছবি দেখে এগিয়ে এলেন অভিজিৎ নন্দী, শ্রীমা ক্রিয়েশন।

বাধা কম আসেনি, তবু সব পেরিয়ে আসলে বুঝেছি মনের কাছাকাছি কাজ সবাই বোধহয় করতে চায়, শুধু সময় আর সুযোগের অভাব থেকে যায় হয়তো। ক্রাউড ফান্ডিং প্রজেক্ট উইথ প্রপার ডকুমেন্টস, যেখানে প্রফিটের লাভ ক্ষতি একার নয় সবার, তাও আবার মুখের কথায় নয়, রীতিমতো খাতায়কলমে, তা এই প্রথম হয়তো করে ফেললাম। এবং সেটাও কোনো বড়ো ব্যানার এবং আলোচনা ছাড়াই। কেউ জানতেও চায়নি এত বড়ো কর্মযজ্ঞের কথা। কারা কীভাবে এতকিছু করলেন নীহারিকার জন্য, অলক্ষ্যেই থেকে গেলো সেই সব। এই সিনেমাটার মেকিং আসলে একটা পথের দিশা এবং তার ইতিবৃত্ত সব নিয়েই একটা আস্ত রূপকথা যেন।
হয়তো ভবিষ্যৎ কথা বলবে বাকিটা… দেখা যাক…
