
জটার দেউল কে তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক…
রহস্যে ঘেরা সুন্দরবন। তার জঙ্গলে যে আদিমতা, তা যেমন গভীর প্রহেলিকায় ভরা, তেমনি সুন্দরবনের মানুষজন, তাদের সমাজ, জীবনযাপন ইতিহাসও কম রহস্যময় নয়। ইতিহাসের প্রসঙ্গেই উঠে আসে জটার দেউল নামের এক প্রাচীন সৌধের কথা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় কঙ্কনদীঘি প্রত্নক্ষেত্রের পুব দিকে রায়দীঘি থানা এলাকায় মণি নদীর মোহনাতে পূর্ব জটা গ্রামে রয়েছে এই স্থাপত্য। সুন্দরবনের জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় ১৮৬৮ সালে খুঁজে পাওয়া গেছিল এই জটার দেউল। মিনারের আকারের প্রায় ১০০ ফুট উঁচু এই ইটের তৈরি সৌধটি কীভাবে কখন তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে।
১৮৭৫ সালে ডায়মন্ড হারবারের ডেপুটি কমিশনার জানিয়েছিলেন যে জটার দেউলের কাছাকাছি পাওয়া গেছে সংস্কৃত ভাষার একটি তাম্রশাসন, অর্থাৎ তামার পাতে খোদাই করা রাজকীয় নির্দেশনামা। তাম্রশাসনে লেখা ছিল যে ওটি প্রকাশ করেছিলেন রাজা জয়ন্তচন্দ্র বা জয়চন্দ্র ৮৯৭ শকাব্দ বা ৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে। তিনি সম্ভবত বিক্রমপুরের চন্দ্র বংশের রাজা ছিলেন। তাম্রশাসনটি এখন কোথায় আছে তা অবশ্য জানা যায় না। অনেকে মনে করেন, এই জয়ন্তচন্দ্রই তৈরি করিয়েছেন জটার দেউল। আবার কেঁদুলির পাশে অজয় নদীর দক্ষিণে প্রাচীন বাংলার পাল বংশের শাসক দেবপালের সময়ে তৈরি যে ইছাই ঘোষের দেউল রয়েছে, জটার দেউল অনেকটা তার মতো দেখতে। সেই কারণে অনেক গবেষকের ধারণা, ওই সময়েই জটার দেউল বানানো হয়েছিল। দেবপাল রাজত্ব করতেন খ্রিস্টীয় নবম শতকে। আবার কিছু লোকের বিশ্বাস, এটি যশোরের শাসক প্রতাপাদিত্যের বিজয়স্তম্ভ। মন্দিরটি কে তৈরি করেছিলেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও একটা প্রচলিত মত হল, জটার দেউল মোটামুটি এক হাজার বছরের পুরোনো।

২০১১ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের তরফে জটার দেউলে শুরু হয় উৎখননের কাজ। একটা বড়ো ঢিবির ওপর দেউলটি রয়েছে। পুব দিকে মুখ করা চৌকো এই সৌধের একটি মাত্র দরজা। গোটা কাঠামো নিচ থেকে ওপরে সরু হয়ে গেছে। ইটের সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয় গর্ভগৃহে। পঞ্চরথ ভিত্তির একটি মাত্র শিখরের কাঠামো উত্তর ভারতের অনেক মন্দিরেই দেখা যায়। আবার দেউলের সামনে মাটির নিচ থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে কিছু ইটের কাঠামো। যার থেকে কেউ কেউ ধারণা করেন, ওড়িশার রেখ দেউলের মতো এরও সামনে জগমোহন শৈলীর কাঠামো ছিল। দেউলের আশেপাশে খনন করে পাথর ও ধাতুর কিছু মূর্তি পাওয়া গেছে, তবে গর্ভগৃহে কোনো বিগ্রহ নেই। আছে মানতের কিছু দেবদেবীর পোড়ামাটির মূর্তি। কাছেপিঠে শুঙ্গ-কুষাণ, পর্তুগিজদের মুদ্রা, হাতির দাঁতও পাওয়া গেছে। জটার দেউল বৌদ্ধ মন্দির না হিন্দু মন্দির না নিয়ে এখনও মেটেনি বিতর্ক। কেউ কেউ মনে করেন, পর্তুগিজ দস্যুরা এটিকে টাওয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।
তথ্যসূত্র – নাজিমউদ্দিন আহমেদ, সংবাদ Today, Dailyhunt
