নকশালবাড়িতে আবার সমাজ পরিবর্তনের ডাক, বিনামূল্যে দরিদ্রদের চিকিৎসায় ব্রতী ডাঃ রাই

গ্রামকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন চিকিৎসক এসএস রাই

কশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানের ইতিহাস কমবেশি সকলেরই জানা। ইতিহাস কমবেশি সকলেরই জানা। সমাজ পরিবর্তনের ভাবনায় ষাট-সত্তরের দশকে নকশালবাড়ির ঐতিহাসিক আন্দোলন আজ ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত। কিন্তু নকশালবাড়িরই গা ঘেঁষে অন্ধকার একটি গ্রামে মাত্র পঁচিশ বছর আগে আলো নিয়ে এসেছিল এক আন্দোলন, যা আজও অনেকেরই অজানা। এটাও ছিল অন্যরকম সমাজ পরিবর্তনের এক আন্দোলন। আজও সেখানে চলছে সেই আন্দোলনের ধারা।

নকশালবাড়ির গায়ে রয়েছে লালটং গ্রাম। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশক, সে গ্রামের বেশ দুর্নাম ছিল। আশেপাশে কিছু চা বাগান থাকলেও সেই গ্রাম ছিল খুবই অনগ্রসর। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, সেই গ্রাম ঘিরে বিভিন্ন অসামাজিক কাজকর্ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। মাদক সেবন থেকে মাদক গ্রহণ, ছিনতাই, লুঠপাটের মতো বিভিন্ন অসামাজিক কাজের অভিযোগ উঠছিল গ্রাম ঘিরে। এমনকি পাহাড়ের আন্দোলনে লুঠপাট, অগ্নি সংযোগের পর কিছু দুষ্কৃতি ওই গ্রামে এসে তাদের আস্তানা তৈরি করেছিল। ফলে দিনের আলোতেও অনেকে সেই গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে ইতস্তত করতেন। পুলিশ প্রায়ই হানা দিয়ে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করতেন। 

এইরকম একটি গ্রামকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন চিকিৎসক এসএস রাই। তিনি স্থির করেন, ওই এলাকায় পরিবেশ বদলে দিতে নিজেই দিনরাত পরিশ্রম করবেন। এর জন্য কিছু মানুষের সহযোগিতাও নেন। ১৯৯৬ সালে সেই এলাকাতেই তৈরি হয় হোলি প্যালেস ক্রিশ্চিয়ান সেন্টার ফর হেল্থ এন্ড এডুকেশন। একদিকে শিক্ষা বিস্তার, স্থানীয় কিছু তরুণের কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে এলাকায় পরিবেশ বদলে যেতে থাকে। 

ডাক্তার এসএস রাই বিনামূল্যে রোগী দেখতে থাকেন। তার পাশাপাশি রোগীদের মাধ্যমেই এলাকার সকলকে সচেতন করতে থাকেন— হিংসা বা অপরাধ জীবন থেকে সম্পূর্ণ সরে আসতে হবে। ধীরে ধীরে শুরু হয় কাউন্সেলিংয়ের কাজ। বহু তরুণ সরেও আসেন অপরাধের রাস্তা থেকে। 

পরিস্থিতি বদলায়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে থাকেন ওই মানুষরাই। ডাক্তার রাই সেই সময় নকশালবাড়ির ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি ছিলেন।  সেই গ্রাম ও তার আশপাশের মানুষদের ভালো রাখতে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক কর্মসূচি নেন। তাঁকে হোলি প্যালেস হাসপাতাল তৈরিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন শ্রীমতি এনি মবার্ট, শ্রীমতি এমএস রাই, ডাক্তার এডম রংগোং, রেভারেন্ড লাকি কর্থক। ডাক্তার রাই আজও সেই হাসপাতালে বিনা পয়সায় রোগী দেখেন, যা গোটা এলাকায় নজির। 

স্থানীয় তরুণ শল্য চিকিৎসক ডাঃ শরদ স্যাংদেংও আজ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস এবং এমএস পাশ করে এই হাসপাতালে শুধুমাত্র গরিব মানুষের সেবা করার ভাবনায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। নামীদামী শহরের হাসপাতালে কাজ করে প্রচুর অর্থ রোজগারের প্রস্তাব থাকলেও সেসব গ্রহণ না করে গ্রামের এই হাসপাতালেই  গরিবদের সেবা শুশ্রূষা করেন নিয়মিত।

ডাক্তার এসএস রাইয়ের পুত্র জনি সামপং ওই হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বঙ্গদর্শন-কে জানান, “করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় এখানে আক্রান্তদের চিকিৎসা হয়েছে পুরোদমে। অনেকেই এখান থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। নামমাত্র টাকায় এখানে চিকিৎসা হয়। পাশাপাশি একেবারে হতদরিদ্র মানুষদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা হয় এখানে।” 

স্থানীয় বহু মানুষের কাছে এই হাসপাতাল এখন আশা ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এখন সেখানে বিনামূল্যে করোনার টিকাকরণ শিবির চলছে।

Developed by DXDasia