করোনাকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্প
বাংলার গ্রাম, মফস্সল, শহরের প্রান্ত ঘুরলে এখনও চোখে পড়বে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ সংক্রান্ত দেওয়াল লিখন। অপারেশন বিনামূল্যে হবে- এই শুনে আশার আলো দেখেছিল রাজ্যবাসী। আমাদের দেশের একটা বড়ো অংশের মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা ছিল একেবারেই তলানিতে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য বিমার মতো শব্দগুলি তাঁদের কাছে যেন ছিল অলীক কল্পনা। এখনও কিছু প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ম মেনে স্বাস্থ্যের দেখভাল করার অভ্যেস প্রায় নেই বললেই চলে। হয়তো অনেক সময়ে নিয়মিত চেক-আপ করার সামর্থ্য হয়ে ওঠে না। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের কাছে স্বাস্থ্য এখনও অনেকের কাছে বিলাসিতা। কোথায় গেলে চিকিৎসা হবে, কত টাকা খরচ হবে, এইসব চিন্তায় অস্থির হতে হত একদল মানুষকে। ঠিক এমন সময় স্বাস্থ্য সংকটের এই বিষয়টি মাথায় রেখেই রাজ্যবাসীর একটা বড়ো অংশকে স্বাস্থ্য বিমার আওতায় আনতে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ভবিষ্যতে প্রকল্পের বাস্তবায়নে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নয়া দিগন্ত খুলবে, এই ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশা।
স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল যাঁদের এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি কিংবা বেসরকারি স্বাস্থ্য বিমা নেই তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান করা। সেই পরিকল্পনা মেনেই স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সুচনা করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সরকারিভাবে চালু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই লক্ষ্যপূরণের বাস্তব চাবিকাঠি এখন বাংলার ঘরে ঘরে।
এই প্রকল্পের সূচনার পর থেকেই রাজ্যবাসীর তরফে যথেষ্ট ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সেই প্রতিক্রিয়ার খবর নিয়েছিল ‘বঙ্গদর্শন’। এই প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে বাংলার সাধারণ মানুষের চাহিদা ও কৌতূহল নজর কেড়েছে আমাদের। হুগলির শ্রীরামপুরের বাসিন্দা রমা দাস জানান, “আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই বয়স হয়েছে, দেখার মতো কেউ নেই। একটা বড়ো অসুখ হলে কী হবে, এই ভেবে খুবই চিন্তা হতো। কিন্তু, এখন আমরা স্বাস্থ্য সাথী কার্ড পেয়ে গিয়েছি। আশা করি, আর কোন চিন্তা নেই।”
পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি মেডিক্লেম পলিসির সূচনা করেছেন। তারই নাম দেন ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, রাজ্যের সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে বিনা খরচে আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। মূলত রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের কাউন্সিলরদের তত্ত্বাবধানে সেই এলাকার মানুষদের উদ্যেশে একের পর এক ক্যাম্প করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তাতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান থেকে আরও স্পষ্ট হয়ে যায় এই প্রকল্পের চাহিদার দিকটি।
অন্যদিকে একজন উপকৃত ব্যক্তি চন্দননগরের বাসিন্দা সঞ্জীব সাধুখাঁর স্ত্রী আমাদের জানান, “আমার স্বামী দীর্ঘদিন হার্টের অসুখে ভুগছিলেন। আর্থিক সংগতি ছিল না বলে চিকিৎসা করাতে পারছিলাম না। কিন্তু স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের দৌলতে আমার স্বামীকে আজ ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। বেহালার বিপি পোদ্দার নার্সিংহোমে চিকিৎসার ৪ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার সবটাই সরকার দিয়েছে। সরকারের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।”
পরিবারের বয়োঃজ্যেষ্ঠ মহিলা সদস্যের নামে নথিভুক্ত হয় সেই পরিবারের কার্ডটি। তবে একটি পরিবারের একটি কার্ডের আওতায় ওই পরিবারের সকল সদস্যই, এমনকি ওই পরিবারের ওপর নির্ভরশীল যদি কোনো একক ব্যক্তি থেকে থাকেন তিনিও এই বিমার সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। কোনো পরিবারে যদি মহিলা সদস্য না থাকে, তবে পুরুষ সদস্যের নামেও আবেদন করা যাবে এই কার্ডটি। প্রতি পরিবার পিছু বার্ষিক ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করবে রাজ্য সরকার। অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও করা যাবে আবেদন। ইতিমধ্যেই প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করছেন অনেকেই। আগামীদিনেও রাজ্যের এক বিরাট অংশের মানুষ প্রকল্পের আওতাভুক্ত হবেন এমনটাই আশা করা যায়।
প্রাথমিকভাবে আবেদনকারীকে নিজের নাম, আধার কার্ডের নম্বর, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে ফর্ম ফিল আপ করতে হবে। আর তারপরই হাতে এসে যাবে সেই প্রতিক্ষিত নীলরঙা ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কার্ডটি। এই কার্ডের আওয়াতাধীন রয়েছে সরকারি, বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ১৫০০ হাসপাতাল। শুধু রাজ্যের মধ্যেই নয়, রাজ্যের বাইরেও একাধিক হাসপাতালে মানুষ পেয়ে যাবেন এই বিমার সুবিধা। মূলত সরকারি হেলথ স্কিম থেকে যারা ইতিমধ্যেই চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুদান পান না, তারা প্রত্যেকেই এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারবেন।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সমীক্ষা থেকে জানা যায় শুধু পরিচিত অসুখই নয়, বর্তমান সময়ে আমরা যে মহামারির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, রাজ্যে করোনার গ্রাফ যখন তুঙ্গে তখন সাধারণের সুরক্ষা কার্ড হয়েছে এই স্বাস্থ্য সাথী।
বাংলার ঘরে ঘরে আজ পরিচিত নাম ‘স্বাস্থ্যসাথী’, মানুষের কপালে লেগে থাকা চিরকালীন চিন্তার ভাঁজ থেকে মুক্তির দিশারী সে। হয়তো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অসুখের ভার খানিকটা হলেও কমিয়ে সুখের খোঁজ এনে দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর এই স্বপ্নের প্রকল্প। হয়ে উঠেছে দুঃসময়ের বন্ধু।