ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল! বাঙালি চলেছে বেড়াতে

“দাদা, বাঙালি নাকি?” সবচেয়ে দুর্গম জায়গাতেও এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়

সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’ মনে পড়তে বাধ্য গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের ছবিটা পাশাপাশি রাখলে। কোভিডের চোখরাঙানিতে গত বছরে রাজ্যের প্রাক-পুজো পর্যটন-চিত্রে আশঙ্কার ঠিকানাই লেখা ছিল পুবে-পশ্চিমে, উত্তর-দক্ষিণে। লকডাউন সবে আংশিক শিথিল হয়েছে তখন। ভ্যাক্সিন কবে আসবে, কারা কখন পাবে, স্পষ্ট নয় তখনও। আতঙ্ক-আশঙ্কা-উৎকণ্ঠার ত্র্যহস্পর্শ তখন এতটাই, ‘পায়ের তলায় সর্ষে’-র আপ্তবাক্য ভুলে গিয়ে ভ্ৰমণবিলাসী বেশিরভাগ বাঙালি গত পুজোয় একরকম ঘরবন্দিই। শুধু মাস্ক দিয়ে যায় চেনা! 

সেই ‘ছিল রুমাল’ অবস্থা থেকে রাতারাতি ভোলবদল বারো মাসের মধ্যেই। বকখালি থেকে বিষ্ণুপুর, গাদিয়ারা থেকে গরুমারা, রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের চোখ-জুড়নো ৩৩টি অতিথিনিবাসে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী', অর্থাৎ কাছাকাছি ১০০ শতাংশ বুকিং। বাঙালি চলেছে বেড়াতে।

বেশ মনে পড়ছে, গত বছর অতিমারীর প্রকোপে বিধ্বস্ত পর্যটন ক্ষেত্রকে চাগিয়ে তুলতে সারা দেশ পরিভ্রমণ করেছিলেন ভারতের ছ’জন ট্যুর অপারেটর। উদ্দেশ্য, দেশবাসীর কাছে নিজেদের দেশ আরও বেশি করে ঘুরে দেখার আবেদন জানানো। কলকাতায়ও এসেছিলেন তাঁরা এবং প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, “বাঙালিরা যতদিন আবার ভ্রমণ না করবেন, ততদিন দেশে পর্যটনের উন্নতি হবে না।” 

সেই ভয় আপাতত আর নেই, অন্তত রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের আধিকারিকরা তাই বলছেন। আসলে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে গত বছরের শেষদিক থেকেই। ডিসেম্বর মাসে উন্নয়ন নিগমের ১৬৯তম বোর্ড মিটিংয়ে প্রকাশ পায়, নভেম্বর মাসে বছরে প্রথমবার লাভের মুখ দেখে রাজ্য সরকারের এই সংস্থা, লাভের অঙ্ক খুব বেশি না হলেও। হতাশা কাটিয়ে ওঠার সেই শুরু। 

করোনা আবহের মধ্যেই কীভাবে কেন ফের ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ছেন রাজ্যবাসী? চলতি বছরে পর্যটনের ক্ষেত্রে দুটি শব্দবন্ধ বেশ চালু হয়েছে – ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজম’ এবং ‘ফ্রাস্ট্রেটেড ট্যুরিজম’। অর্থাৎ, করোনার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা এবং ‘কী করবি করে নে’ গোছের মনোভাব নিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ছেন একদল। আবার অন্য আরেক দল স্রেফ হতাশার বশে কাছেপিঠে ঘুরতে যাচ্ছেন, যেহেতু দূরপাল্লার ভ্রমণ সম্পর্কে এখনও আশঙ্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। “দূরে গেলে আবার হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা হলে বাড়ি ফেরা মুশকিল হবে, এটাও ভাবছেন অনেকেই।” বলেন পর্যটন উন্নয়ন নিগমের এক আধিকারিক। 

যদি ধরেও নেওয়া যায় যে বাংলায় এই দুটি কারণই প্রযোজ্য, একবার গন্তব্যে পৌঁছে গেলে কিন্তু অভিজ্ঞতা মোটেই ফেলে দেওয়ার মতো হচ্ছে না। “অনেক বাঙালিই বাংলাকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন বলা যায়,” বলছেন নিগমের ওই আধিকারিক। “এবং আমাদের ইদানীং নেওয়া বেশ কিছু উদ্যোগের ফলে বাংলায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও সর্বাত্মক হয়ে উঠছে। আমরা চাই না, পর্যটকরা স্রেফ কোনও একটি জায়গায় গিয়ে চারদিন কাটিয়ে ফিরে চলে আসুন। আমরা চাই, সেই চারদিন ধরে তাঁরা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশুন, স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতির স্বাদ পান, সেখানকার জীবনযাত্রা উপলব্ধি করুন, স্থানীয় খাবার খান।”

উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি বাঙালির অতি প্রিয় আদি অকৃত্রিম দীঘা বেড়াতে যান, এমন হতেই পারে যে আপনাকে একটি কাজুবাদামের বাগানে নিয়ে যাওয়া হলো, অথবা বিষ্ণুপুরে গিয়ে আপনি কাছাকাছি তাঁতিদের কারখানা ঘুরে এলেন। সেই উদ্দেশ্যে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে স্থানীয় ট্যুর গাইডদের। উন্নয়ন নিগমের আরও পরিকল্পনা, ক্রমে ক্রমে রাজ্যের প্রতিটি অতিথিনিবাসে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের স্বার্থে বিপণন কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে আপনি সরাসরি জিনিস কিনতে পারবেন উৎপাদকের কাছ থেকেই। 

এছাড়াও রয়েছে কিছু প্যাকেজের পরিকল্পনা, যেমনটা দিয়ে থাকে বেসরকারি পর্যটন সংস্থাগুলি। ইতিমধ্যেই চালু হয়ে গিয়েছে উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় গন্তব্য হলংয়ের সঙ্গে বাতাবাড়ি ও মূর্তি অতিথিনিবাসকে জুড়ে একটি প্যাকেজ। এর ফলে কিছু অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় গন্তব্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে পর্যটন উন্নয়ন নিগম। এবং এই আশা যে বাস্তবে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে, তা জোরের সঙ্গে জানালেন ওই আধিকারিক। একই ধরনের প্যাকেজের পরিকল্পনা রয়েছে ঝাড়গ্রাম এবং ডুয়ার্সের ক্ষেত্রেও, যদিও সেগুলি এখনও চালু হয়নি।

এছাড়াও রয়েছে উন্নয়ন নিগমের নিজস্ব জলযান ও স্থলযানে হুগলি নদী বেয়ে বাংলার বিভিন্ন ইউরোপীয় উপনিবেশ পরিভ্রমণ – যেমন চন্দননগর (ফরাসি), শ্রীরামপুর (ডেনিশ), চুঁচুড়া (ওলন্দাজ বা ডাচ) এবং হুগলি (পর্তুগিজ)। সঙ্গে থাকছে বেলুড় এবং দক্ষিণেশ্বরের সন্ধ্যারতি এবং চন্দননগরের ‘জলশ্রী’ বোট রেস্তোরাঁয় ভোজন।

বলা বাহুল্য, পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে থাকলে প্রয়োজন হবে আরও বেশি এবং আরও প্রশিক্ষিত কর্মীর। সেই উদ্দেশ্যে রয়েছে ‘আহরণ’, দুর্গাপুরে অবস্থিত রাজ্য সরকারের হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট। তা ছাড়াও রাজ্য সরকারের উদ্যোগ ‘উৎকর্ষ বাংলা’-র মাধ্যমে চলছে ‘রি-স্কিলিং’ বা পুনঃপ্রশিক্ষণ। 

প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কথা ভাবলে ভারতের আর কোনও রাজ্যই সম্ভবত পাল্লা দিতে পারবে না বাংলার সঙ্গে। উত্তরে হিমালয়, মাঝে বিস্তারিত অরণ্যভূমি, পশ্চিমে মালভূমি, দক্ষিণে সমুদ্র এবং পৃথিবীর বৃহত্তম ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ অর্থাৎ সুন্দরবন। তার সঙ্গে রয়েছে অগুন্তি সুপ্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, মন্দির, মসজিদ, বিশাল বিশাল রাজবাড়ি। এছাড়া ঔপনিবেশিক ইতিহাসের নিদর্শন তো আছেই। আর কী চাই?

ক’জন জানেন, মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি প্যালেসে রয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝাড়লন্ঠন? অথবা ভারতের বৃহত্তম সোপান? দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (টয় ট্রেন) এবং সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টের মতো দুটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট রয়েছে এই রাজ্যে। আমের বা ইলিশের মরশুমে স্রেফ আম বা ইলিশের সূত্র ধরেই তৈরি করে নিতে পারেন নিজের সফরসূচি। পাঁচদিন কাটাতে পারেন শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন চা বাগানে ঘুরে, যেখানে থাকার ব্যবস্থা চমৎকার, সঙ্গে থাকবে চা উৎপাদনের শুরু থেকে শেষ অবধি সমস্ত প্রক্রিয়া নিজের চোখে দেখার সুযোগ। এবং উন্নয়ন নিগমের ওই আধিকারিক যেমন বললেন, সবটাই করতে পারেন নিজস্ব যানবাহনে, গণ পরিবহণের সাহায্য না নিয়েই। আপনার সঙ্গে থাকবে ‘পথের সাথী’ প্রকল্পের অধীনস্থ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় চালু করা ‘মোটেল’ বা পান্থশালা, যেখানে লং ড্রাইভের ক্লান্তি কাটাতে কিছুক্ষণ থেমে খাওয়াদাওয়া সেরে, হাতমুখ ধুয়ে ফের রওনা দিতে পারেন।

রাজ্য সরকারের ১৪টি অতিথিনিবাসে (দক্ষিণ ২৪ পরগনা, জলপাইগুড়ি, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ার, বীরভূম, হাওড়া এবং পশ্চিম বর্ধমান) আপনি দেখা পাবেন সরকারের ‘লোক প্রসার প্রকল্প’ উদ্যোগের অন্তর্গত শিল্পীদের, যাঁরা স্থানীয় সংস্কৃতির অনন্য পরিবেশনে সমৃদ্ধ করবেন আপনার সফর। 

পরিতাপ একটাই – বাংলার নানা অভিনবত্বকে দেশবিদেশের পর্যটকদের কাছে এর আগে সেভাবে তুলে ধরা হয়নি কখনোই। ভারতেই এমন বেশ কিছু রাজ্য রয়েছে, যারা মুষ্টিমেয় কিছু আকর্ষণের ভিত্তিতেই পর্যটন থেকে আয় করে চলেছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। সেই ক্ষমতা যে বাংলার রয়েছে, তা বলা বাহুল্য। বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগের মধ্যে পর্যটন ক্ষেত্রে উন্নয়ন অন্যতম। সেই উদ্দেশ্য যে ইতিমধ্যেই সফল হতে শুরু করেছে, তাতে খুশি ছাড়া আর কী হতে পারে?

 

Developed by DXDasia