উৎকৃষ্ট মানের কাপড় দিয়ে পতাকা বানিয়ে অল্পদিনেই ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেললেন
সাল ১৯৪৭। তার কিছু মাস পরের অবস্থা। দেশ তখন সদ্য স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। দেশের প্রত্যেকটা কোণায় কোণায় তেরঙা পতাকা উড়ছে পতপত করে। বাংলার ছবিও ছিল একইরকম। তেরঙার চাহিদা তখন তুঙ্গে। আর সেই চাহিদার সুযোগ কাজে লাগিয়েই হাওড়ার উনসানির বাসিন্দা নুর জামান হালদার পেতে বসলেন ব্যবসা। উৎকৃষ্ট মানের কাপড় দিয়ে পতাকা বানিয়ে অল্পদিনেই ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেললেন। চাহিদা বাড়ল। গ্রাম-শহর ছাড়িয়ে জেলা, তারপর ধীরে ধীরে রাজ্য – ছড়িয়ে পড়ল বাঙালির তৈরি করা ভারতীয় পতাকা। শোনা যায়, বাংলা ছাড়াও আরও পাঁচ রাজ্যে এখনও জমজমাট তাঁদের এই ব্যবসা।
ছবিঃ সংগৃহীত
প্রায় তিন প্রজন্ম ধরে হাওড়া উনসানি দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা নুর জামান পরিবারের সদস্যরা পতাকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে ব্যবসা দ্যাখেন ছেলে রাজু হালদার। এখন আর শুধুমাত্র তেরঙাই নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পতাকাও তৈরি করেন তাঁরা। সারা বছরই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন। বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম, ওড়িশা ত্রিপুরা থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম হলেও নুর জামানদের মুখের হাসির রেখা ম্লান হয়নি। ২৩-২৬ জানুয়ারি থেকে ১৫ অগাস্ট – এটাই ব্যবসার সেরা সময়।
স্বাধীনতার পর থেকেই এই ব্যবসা। এরকম কত কত নুর জামান, রাজুদের মতো শিল্পীরা নিষ্ঠা ভরে পতাকা বানিয়ে যাচ্ছেন। আর আমাদের উন্মাদনায় এই শিল্পীদের কথা চাপা পড়ে যায়।
ভারতীয় পতাকার ইতিহাস
ভারতের পতাকায় তেরঙাকে স্থান দেওয়ার কথা প্রথম মহাত্মা গান্ধিকে জানান পিঙ্গালি বেঙ্কায়া। যিনি ভারতের স্বাধীনতা যোদ্ধা ছিলেন। সাল ১৮৯৯-১৯০২। মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। তখন পিঙ্গালি সেখানে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে উপস্থিত ছিলেন। ১৯১৬ সালে ভারতের পতাকার নকশা রেখে একটি বইও প্রকাশ করেন তিনি। ১৯২১ সালে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভায় বাপুকে তিনি কয়েকটি পতাকার নকশা এঁকেও দেন। যেখানে লাল এবং সবুজ এই দুই রং ছিল হিন্দু এবং মুসলিম এই দুই ধর্মকে বোঝানোর জন্য। তবে গান্ধিজি জানান, যে এই দুই রঙের মধ্যে সাদাও রাখতে হবে। কারণ ভারতে এই দুই ধর্মাবলম্বীরা ছাড়াও আরও অনেক ধর্মের লোক বসবাস করেন। দেশের উন্নতির প্রতীক হিসেবে চরকা রাখার কথা বলেন তিনি।
তবে পরবর্তীতে লাল রংকে সরিয়ে গেরুয়া নিয়ে আসা হয় ‘শক্তি এবং সাহসীকতার’ প্রতীক অর্থে। সাদা রাখা হয় ‘শান্তি এবং সত্যর’ অর্থে এবং সবুজ রাখা হয় কৃষিপ্রধান দেশ ভারতের ‘জমির উর্বরতা, বৃদ্ধি এবং শুভ’ কামনার্থে। পরবর্তীতে পতাকাটির কোনও ধর্মীয় ব্যাখ্যা যেন না থাকে সেদিকেই নজর দেওয়া হয়েছিল।
