
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে জগবন্ধু ভাদুড়ির অপ্রতিরোধ্য কাঠের ব্যবসার সঙ্গে লোকগাথার তুলনা হতে পারে
একসময়ে বনেদিয়ানার অন্যতম মাপকাঠি ছিল কাঠের আসবাব। আটপৌরে জীবনে কাঠের ইজিচেয়ার, টেবিল, পালঙ্ক, বসার জায়গা ইত্যাদি বাঙালির ঘর আলো করে থাকত। অফিস কাছারিতেও কাঠের সরঞ্জামের রমরমা ছিল। স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে পশ্চিমবঙ্গে কাঠের তৈরি সরঞ্জামের ব্যবসায় যে সংস্থাটির সবচেয়ে বেশি নামডাক ছিল, সেই Woodcraft & Construction-এর ঠিকানা ছিল উত্তর চব্বিশ পরগণার সোদপুর স্টেশন রোডে। অনেক কম মানুষই আজ এ বিষয়ে জানেন। যাত্রা শুরু হয় ১৯৫০ সালে। উত্তর কলকাতার বেনিয়াটোলা লেনের নিবাসী শ্রী জগবন্ধু ভাদুড়ি নিজের সীমিত সাধ্য অনুযায়ী ব্যবসার গোড়াপত্তন করেন। কারখানা তৈরি হল সোদপুর স্টেশন রোডে। ৩৬ স্ট্র্যান্ড রোডে কোম্পানির অফিস খোলা হল। প্রায় নিঃস্ব জগবন্ধুবাবুর মনোবল ছিল অটুট। প্রখর বাস্তব বুদ্ধির ওপর ভর করে উনি ক্রমশ নিজের কাঠের ব্যবসার প্রসার করেছিলেন। আমরা গেছিলাম জগবন্ধুবাবুর কনিষ্ঠতম পুত্র অরূপ ভাদুড়ির বাসস্থানে। অশোকবাবু আমাদের জানালেন যে ওনার বাবার মুখের শোনা, শুরুর কয়েকটা বছর ব্যবসা করাটা সহজ ছিল না। তারপর উডক্রাফট কোম্পানি আস্তে-আস্তে অনেক বড় সরকারি আর বেসরকারি ক্রেতা পেতে আরম্ভ করে। তাদের মধ্যে প্রধান ছিল ভারতীয় রেল। দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে, সাধারণ মানুষের চোখে তখন অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। ভারতবর্ষকে গড়ে তোলার জন্যে নতুন সরকারও উদ্যোগী। রেল মন্ত্রক বেশ কয়েকটা দূরপাল্লার ট্রেন আর লোকাল ট্রেনগুলোর বসার জায়গা বানানোর জন্যে টেন্ডার ছাড়ল। রেল মন্ত্রকের আঞ্চলিক দফতরগুলোতেও কাঠের নতুন আসবাবের জন্য টেন্ডার ছাড়া হল। সেই টেন্ডার পেল উডক্রাফট কোম্পানি। ব্যবসায় বিপুল গতি এলো। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে উডক্রাফট কোম্পানি নিজস্ব করাতকলের (saw mill) ব্যবহারিক প্রয়োগ শুরু করল কারখানা লাগোয়া একটি নতুন ঘরে। কাঠ আসত সেন্ট্রাল প্রভিন্স থেকে যা আজকের মধ্যপ্রদেশ। আসামের জঙ্গল থেকেও কাঠ সরবরাহ করা হত। প্রধানত তিন ধরনের কাঠ জিনিস তৈরি করতে ব্যবহার করা হত – সেগুন, টিক, শাল। পূর্ব রেল আর দক্ষিণ-পূর্ব রেলের প্রায় প্রত্যেকটা আঞ্চলিক অফিসের আসবাবপত্র বানাত উডক্রাফট কোম্পানি। রেলমন্ত্রকের শংসাপত্রকে নির্ভর করে ১৯৫৮-৫৯ নাগাদ উডক্রাফট প্রতিরক্ষা মন্ত্রালয় থেকে প্রচুর কাজের বরাত পায়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রালয়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক দফতরেও কাঠের চেয়ার, টেবিল, আলমারি, ডেস্ক ইত্যাদি আসবাব সরবরাহ করে জগবন্ধু ভাদুড়ির উডক্রাফট এ্যান্ড কনস্ট্রাকশন।

কিন্তু ব্যবসা শুধুমাত্র এই অবধি থেমে থাকেনি। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা আর স্বাস্থ্য মন্ত্রকের কার্যালয়গুলোতেও উচ্চ মানের কাঠের আসবাব সরবরাহ করে সোদপুরের উডক্রাফট। বর্তমানে সোদপুর স্টেশন রোডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ হল 'কাঠগোলা'। প্রসঙ্গত, উডক্রাফটের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণেই আঞ্চলিক বাসিন্দাদের মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে কোম্পানির নাম। ক্রমে স্টেশন রোডের যে অঞ্চলে কোম্পানির কারখানা ছিল, সেটাই 'কাঠগোলা' নামে পরিচিতি পায়। সেটা হয় ১৯৬৫ সাল থেকে। ষাটের দশকে কেন্দ্রীয় সরকারের টেলিফোনের অফিসগুলোতেও কাঠের জিনিসপত্র নিয়মিত সরবরাহ করেছে উডক্রাফট। সাফল্যের শিখরে জগবন্ধুবাবু ১৯৬৮ সাল নাগাদ দুর্গাপুরে নিজের কোম্পানির একটি শাখা খোলেন। ওনার ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা ছিল। উনি বুঝেছিলেন যে কলকাতার বাইরেও একটি শাখা থাকলে অন্যান্য জেলাগুলোয় অর্ডার নিতে এবং জিনিসপত্র সরবরাহ করতে সুবিধে হবে। দোকানটি উদ্বোধন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন আইনমন্ত্রী সুলেখক প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র।
অশোক কুমার ভাদুড়ি বঙ্গদর্শনকে জানালেন আরও একটি চিত্তাকর্ষক তথ্য। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে ফাউন্টেন পেনের কালির কোম্পানি কলকাতার 'সুলেখা কালি' তখন বিপুল জনপ্রিয়। প্রায় প্রত্যেকটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্ত বাড়িতে সুলেখা কালির দোয়াত থাকত। ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে সেই পেনের কালি বিপুল পরিমাণে সরবরাহ করা হত। কিন্তু নিম্নমানের প্যাকেজিং-এর কারণে বেশ কিছু ক্ষেত্রে দূরপাল্লার সাপ্লাই ব্যাহত হল। সংস্থার দুই কর্ণধার শঙ্করাচার্য মৈত্র আর ননিগোপাল মৈত্রর কপালে তখন চিন্তার বলিরেখা। সমাধানের জন্যে এগিয়ে আসলো উডক্রাফট। সুকৃত, পোক্ত কাঠের বাক্সে দেশের নানান প্রান্তে সরবরাহ হল সুলেখা কালির দোয়াত। উল্লেখযোগ্য, দিনপ্রতি ৯০০ থেকে ১০০০ বাক্সের অর্ডার ছিল।
কিন্ত এর কয়েক বছর পর একটা বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে। সাফল্য যখন গগনচুম্বী, ১৯৭২ সালে কারখানায় আগুন লাগে। কারখানার বেশিরভাগ অংশ আর সরঞ্জাম পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। আজও অনেকের সন্দেহ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই কোনও ব্যক্তি ওই কাজটা করিয়েছিল। এর পরেও উডক্রাফট একপ্রকার উঠে দাঁড়িয়েছিল। ব্যবসার বেশিরভাগটাই তখন বাঁক নেয় ডমেস্টিক ফার্নিচারের দিকে। কিন্তু আগেকার দিনের সেই প্রতিপত্তি ফেরত আসে না। পরবর্তী দশকে কাঠের বিকল্প হিসেবে বাজারে তখন প্লাইউড ঢুকে পড়েছে। অনেক নতুন কোম্পানিও ব্যবসায় গতি পেয়েছে। সেই তুলনায় উডক্রাফট পিছিয়ে পড়েছিল। বিনিয়োগ আর আধুনিকিকরণের ক্ষেত্রেও ভাবনা আর প্রয়োগের অভাব ছিল। কিছু খুচরো অর্ডারে নির্ভর করে আরও কয়েক দশক কোনোক্রমে ব্যবসা চালানোর পর ২০১৩ সালে উডক্রাফট চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আজ ‘কাঠগোলায়’ কোনও কাঠের কারখানা নেই, আছে শুধু ফ্ল্যাটবাড়ি।
জগবন্ধু ভাদুড়ির এক সময়ের অপ্রতিরোধ্য কাঠের ব্যবসা আজ সোদপুরের স্টেশন রোডের বাতাসে কিছু বিস্মৃত কাঠের গুঁড়ো কেবল।
