‘পশংগড়া’ না ‘পঞ্চকুড়্যা’- পাঁশকুড়া নামের আড়ালে কে?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ সালে এসেছিলেন মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায়। এই ইতিহাস আজও কথা বলে…

পূর্ব মেদিনীপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর পাঁশকুড়া। পাঁশকুড়ার সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর কলকাতা। সংযোগ ব্যবস্থাও ভীষণ উন্নত। ট্রেন ছাড়াও রয়েছে NH6 রোড। খড়গপুর, হলদিয়া এবং দীঘার ট্রেনও এখান থেকে সবসময় পাওয়া যায়। পাঁশকুড়ার নামকরণ নিয়ে ইতিহাস গবেষকদের মধ্যে নানারকম মতামত রয়েছে। বেশ রহস্যময় সেই অজানা ইতিহাসগুলি। 

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ সালে এসেছিলেন মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায়। ডঃ প্রদ্যোত কুমার মাইতির ‘অনন্য মেদিনীপুর’ বইটি থেকে জানা যায়, জনসংযোগের উদ্দেশ্যে ১৯৩৮ সালের ১১ এপ্রিল, তমলুকে একটি জনসভা করার কথা ছিল নেতাজির। ওই দিন সকালে তিনি হাওড়া থেকে রেলের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় যাত্রা শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন বহু কংগ্রেস কর্মী। কোলাঘাট রেল স্টেশনে জেলাবাসীর পক্ষ থেকে সুভাষচন্দ্রকে প্রথম অভিনন্দন জানান জেলার আইনসভার সদস্য গোবিন্দ ভৌমিক। ট্রেন পাঁশকুড়া স্টেশনে পৌঁছোলে সেখানে সুভাষচন্দ্রকে তমলুক মহকুমা কংগ্রেস কমিটির পক্ষ থেকে সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী মাল্যদান করেন। এরপর পাঁশকুড়া থেকে সুভাষচন্দ্রের গাড়ি তমলুকের দিকে এগিয়ে চলে। পথের দুদিকে বিপুল জনসমাগম। জনতার অনুরোধে জনসমাগমে ভাষণ দেন নেতাজি। এরপর তমলুকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। এই ইতিহাস আজও বহন করে চলেছে পাঁশকুড়া।

পাঁশকুড়া নামে কোনো গ্রাম নাকি অতীতে ছিল না। কংসাবতী নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছিল কাশীজোড়া পরগণা। সেই কাশীজোড়া পরগণাই নাকি আজকের পাঁশকুড়া। কাশীজোড়া নাম এসেছে জোড়া কাঁসাই থেকে। খ্রিষ্টীয় আঠারো শতকে বর্তমান কাঁসাই নদীর একটি শাখা গড়-পুরুষোত্তমপুর, প্রতাপপুর, রঘুনাথবাড়ি ইত্যাদি গ্রামের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রূপনারায়ণে মিশেছে। এখনও এই নদী খাতটির অবস্থান স্পষ্ট বোঝা যায়। এই নদী খাতটিকে ‘ওল্ড বেড অফ কসাই’ বলা হয়। এই নদীটি কপিশা নদী বা গাঙ্গুড়্যা নদী নামে পরিচিত ছিল। এই অঞ্চলে মাটির কয়েক ফুট নিচেই রসালো বালির স্তর দেখা যায়। জোড়া কাঁসাই বিবর্তনের ধারায় হয়ে গিয়েছে কাঁসাইজোড়া – কাঁসিজোড়া – কাশীজোড়া। 

বর্তমান পাঁশকুড়ার সুন্দরনগর, চাঁচিয়াড়া, রঘুনাথবাড়ি, আটবেড়িয়া প্রভৃতি গ্রামগুলি কাশীজোড়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। এই অঞ্চলগুলি যুক্ত ছিল তৎকালীন তাম্রলিপ্তের সঙ্গে। মধ্যযুগে কাশীজোড়া রাজবংশের গড় ও প্রাসাদ ছিল হরশঙ্করগড়ে। এরপর, মোঘল আমলে টোডরমলের কর পরিকল্পনায় কাশীজোড়া ওড়িশার সরকার জলেশ্বরের অন্তর্গত ছিল। আকবরের আমলে কাশীজোড়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন গঙ্গানারায়ণ রায়। তিনি ১৫৭৩ সালে চাঁপাডালিতে গড়বাড়ি নির্মাণ করেন। মুঘল আমলের শেষ দিকে বাংলার নবাব মীরকাশিমের হাত থেকে ১৭৬০ সালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের শাসন ভার চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যাবে, পাঁশকুড়ার নাম এসেছে পশংগড়া থেকে। কারণ অতীতে জলসেচের সুবিধার্থে মেদিনীপুর ক্যানেলের এই এলাকায় লকগেট বা পশং তৈরি করা হয়েছিল। লকগেট সংলগ্ন স্থানকে বলা হত পশংগড়া। বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তীকালে তা পাঁশকুড়া হয়ে গেছে। এর আবার একটি ভিন্নমতও রয়েছে। কোনো ইতিহাসবিদের মতে, পাঁশকুড়া নামটি এসেছে ‘পঞ্চকুড়্যা’ শব্দ থেকে। কাশীজোড়ার রাজা একবার কোলাঘাটের কানাইচকের কবি নিত্যানন্দ চক্রবর্তীকে দীক্ষার সময় কিছু জমি দান করেছিলেন। ‘শীতলা মঙ্গলে’ তার প্রমাণ পাওয়া যায়- ‘পঞ্চকুড়্যা জমি দিল কর্যা ব্রহ্মোত্তর।’ এই ‘পঞ্চ’ শব্দের অর্থ পাঁচ আর ‘কুড়্যা’ শব্দের অর্থ জমির পরিমাণ। তাই এই ‘পঞ্চকুড়্যা’ থেকেই কালক্রমে বিবর্তনের ধারায় পাঁশকুড়া নামটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।

পাঁশকুড়ার সদরঘাটে ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাঁশকুড়া মিডল ইংলিশ স্কুল। পরবর্তীকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ব্রাডলি বার্ট হাইস্কুল। ইতিহাসের পাতায় ‘Punchcoora School’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া, ব্রিটিশ আমলে মেদিনীপুরের কালেক্টর বেইলি সাহেব ১৮৫২ সালে তাঁর লিখিত ‘মেমোরান্ডা অফ মিডনাপুর’-এ কংসাবতী তীরবর্তী এলাকার কথা বলেছেন। এই এলাকাকে ‘পাঁচকুড়া ঘাট’ (Panchkoora Ghat) বলে উল্লেখ করেছেন। পরে সমগ্র কাশীজোড়া পরগণার নাম পরিবর্তিত হয়ে পাঁশকুড়া নাম হয়। পাঁশকুড়া ঘাট-এর অস্তিত্ব এখন আর নেই। তবে এখনও পাঁশকুড়া থানার অফিস সংলগ্ন সেচ দফতরের তৈরি মেদিনীপুর ক্যানেলের মুখে ১৮৯৬ সালে তৈরি লকগেট ও তাঁর সংলগ্ন এলাকা এখনও সদরঘাট নামেই পরিচিত। সেই সদরঘাট এলাকাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল বর্তমানের পাঁশকুড়া পুরোনো বাজার।

ইতিহাস কথা বলে। হ্যাঁ, বলে। কংসাবতীর দ্বারে আমরা ঠাঁই বসে আছি। নিবিড় সহাবস্থান আমাদের। ইতিহাসের খুব কাছে চলে এলে সবকিছু কেমন শান্ত মনে হয়। কাশীজোড়া কিংবা পশংগোড়া থেকে হাওয়া আসছে ভীষণ– দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। যে হাওয়া দেখার নয়, উপলব্ধির।

তথ্যসূত্র- ‘মেদিনীকথা’- অরিন্দম ভৌমিক, অনন্য মেদিনীপুর- ডঃ প্রদ্যোৎ কুমার মাইতি, প্রবন্ধ ‘পাঁশকুড়ার ইতিউতি’- রূপেশ কুমার সামন্ত

Developed by DXDasia