হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সাক্ষী কোচবিহার রাজবাড়ি

হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সাক্ষী কোচবিহার রাজবাড়ি

ইতিহাসের বিচারে কোচবিহার রাজবাড়ি খুব বেশি পুরোনো নয়। বয়স মোটামুটি ১৩৫ বছর। তবে যে রাজবংশের এখানে বসবাস, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাসাদের নান্দনিক সৌন্দর্য নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। এই ভিক্টর জুবিলি প্যালেস নিয়ে কোচবিহার হয়ে উঠেছে রাজকীয় ঐতিহ্যে মেদুর উত্তরবঙ্গের একমাত্র পরিকল্পিত শহর। ১৮৮৭ সালে লন্ডনের বাকিংহ্যাম প্যালেসের অনুসরণে এই স্থাপত্য গড়ে তোলা হয়। কোচবিহারে তখন মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের আমল। হেরিটেজ শহর হিসেব কোচবিহার চিহ্নিত হওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ এই প্রাসাদ। কোচ বংশেরই সন্তান মহারানি গায়ত্রী দেবী বিখ্যাত হয়েছিলেন রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যের জন্য।

মহারানি গায়ত্রী দেবী

 

পূর্ব ভারতের বড়ো অংশ জুড়ে ছিল কোচ রাজাদের শাসন। বাংলা এবং আসামে বিস্তৃত ছিল তাঁদের রাজ্য। কামতা রাজ্যে ১২৫৭ সাল নাগাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে কোচ বংশ। প্রথম কোচ রাজা বিশ্ব সিংহ, তাঁর ছেলে নর নারায়ণ এবং সেনাপতি চিলারাই মিলে দখল করে নেন তখনকার কামরূপ রাজ্যের পশ্চিম অংশ এবং দক্ষিণ আসাম। ১৫৮৬ সালে নর নারায়ণের মৃত্যু হলে রাজবংশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক অংশ কোচবিহার শাসন করত। আরেক শাখার অধীনে ছিল কোচ হাজো। 

 

কোচ হাজো দখল করে নিয়েছিলেন অহম শাসকেরা। স্বাধীন রাজ্য হিসেবে কোচবিহার বিকশিত হতে থাকে। এরই মধ্যে মুঘল আগ্রাসনের বিপদ এসে হাজির হয়। তাকে সামলানো গেলেও ভুটানি এবং তিব্বতি আক্রমণের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসে। অনেক যুদ্ধ করে তাদের আটকানো যায়। কিন্তু একজন ভুটানি রাজপ্রতিনিধি জাঁকিয়ে বসেন কোচবিহারের দরবারে। কোচ রাজারা তখন ব্রিটিশদের সাহায্য নেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত উত্তর সীমানার এই বিপদ থেকে কোচবিহার রক্ষা পায়। কিন্তু স্বাধীন রাজ্যের মর্যাদা রইল না আগের মতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তি হয় তাদের। ব্রিটিশ রাজত্ব শেষ হলে ১৯৪৯ সালে কোচবিহার যুক্ত হয় ভারতের সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলায় পরিণত হয়।

আগে কোচবিহার রাজবাড়ি ছিল ৩ তলা। ১৮৯৭ সালে আসামের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ওপরের তলা ভেঙে পড়ে। প্রাসাদের মোট আয়তন ৫১,০০০ বর্গফুট। মূল কাঠামো ৩৯৫ ফুট লম্বা এবং ২৯৬ ফুট চওড়া। একতলা ও দোতলার সামনের দিকে আছে খিলানযুক্ত বারান্দা। মাঝখানের প্রাঙ্গণ দিয়ে দরবার হলে ঢুকতে হয়। সেখানে দেখবেন অসাধারণ সুন্দর ধাতব গম্বুজ। তার ওপর চোঙের মতো আকারের ঘুলঘুলি। গোটা স্থাপত্য জুড়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁস শৈলীর প্রভাব। প্রসাধন ঘর, শোয়ার ঘর, বসার ঘর, খাওয়ার ঘর, বিলিয়ার্ড ঘর, গ্রন্থাগার, তোষাখানা – এগুলোও দেখার মতো।

পশ্চিমবঙ্গে লিস্ট অফ মনুমেন্টস অফ ন্যাশানাল ইমপর্টেন্স-এ স্থান পেয়েছে কোচবিহার রাজবাড়ি। কোচ রাজপরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় স্থাপত্যের যেভাবে সমন্বয় ঘটেছে, তা মুগ্ধ করে পর্যটকদের। ভারতীয় পরম্পরা এখানে বিরাজ করছে সগর্বে। 

কীভাবে যাবেন

রেলপথ, বিমান এবং সড়কপথে খুব সহজেই কোচবিহার পৌঁছনো যায়। কলকাতা থেকে দূরত্ব মোটামুটি ৭০০ কিলোমিটার। অনলাইনেই ট্রেন এবং বিমানের টিকিট কাটা যায়। কোচবিহার শহরেই অনেক থাকার জায়গা আছে। তবে আমরা পরামর্শ দেব জলদাপাড়ায় পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের নিজস্ব অরণ্য ট্যুরিজম প্রপার্টি (পূর্বতন জলদাপাড়া ট্যুরিস্ট লজ)-এ কয়েকদিন থাকতে। কোচবিহার থেকে এক ঘণ্টার পথ। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানও ঘুরে আসতে পারবেন সময় করে। বুকিং এবং অন্যান্য তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন – 

West Bengal Tourism Development Corporation Ltd
DG Block, Sector-II, Salt Lake
Kolkata 700091
Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292
Website: https://www.wbtdcl.com/
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com
 

Developed by DXDasia