৯০ বছর ধরে বাঙালির প্রেমের সংজ্ঞা বদলে যাওয়ার সাক্ষী বসন্ত কেবিন

১৯৩১ সাল নাগাদ বসন্তকুমার রায় কলেজস্ট্রিটে তৈরি করেন এই কেবিন

বইপাড়া এক অদ্ভুত জায়গা। এত জ্ঞান এত পাণ্ডিত্য ওইটুকু এলাকায় ঘুমিয়ে আছে যেন। এক সচল হৃৎপিণ্ড, গ্রামগঞ্জ থেকে শিরা উপশিরা হয়ে রক্ত আসে, যার দুটি অলিন্দে হাওড়া, আরেকটি শিয়ালদা। এরপর দূষিত রক্তের মতো পুরোনো বই ফেলে বইপাড়া থেকে নতুন বই পৌঁছে যায় গোটা বঙ্গের শরীরে। তাদের ফেলে যাওয়া পুরোনো রক্ত নিয়ে বাজার বসে ছুটির দিনের সকালে। এর বাইরে গত কয়েক দশকে বহু প্রেম পুষেছে এই তল্লাট। বহু উপন্যাসও। লাজের আড়ালের সেসব প্রেম যত্নে লালন করেছে বইপাড়ার কেবিনগুলি। যার মধ্যে অন্যতম বসন্ত কেবিন। ৮৯ বছর ধরে যাঁরা প্রেমের সংজ্ঞা বদলে যেতে দেখলেন। এই ৮৯ বছরে লেটার প্রেসের থেকে দায়িত্ব নিল অফসেট, আর অফসেটের উত্তরসূরি হয়ে প্রিন্ট অন ডিমান্ড। তবু সম্পাদক থেকে শব্দশিল্পীদের আড্ডা ছেড়ে গেল না এই কেবিনকে।

লাজের আড়ালের সেসব প্রেম যত্নে লালন করেছে বইপাড়ার কেবিনগুলি। যার মধ্যে অন্যতম বসন্ত কেবিন।

১৯৩১ সাল নাগাদ বসন্তকুমার রায় কলেজস্ট্রিটে তৈরি করেন এই কেবিন। তাঁর অনুপস্থিতিতে দোকানের দায়িত্ব নেন ছোটো ছেলে অম্বর রায়। তিনিও মারা গেলে এখন তাঁর স্ত্রী যমুনা রায় ও তাঁদের পুত্র অমরনাথ রায় দায়িত্ব নিয়েছেন এই দোকানের। একতলায় কোনও জাঁকজমক না এলেও দোতলা পাল্টে ফেলেছেন তাঁরা অনেকাংশে। খাবারের তালিকাও বদলে গেছে আগের চেয়ে। কেবিনের সেই চপ কাটলেট চা আর টোস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুপুরের খাবারও। মেসের ছেলে থেকে দোকানি, কলেজের প্রফেসর থেকে মেডিকেল কলেজের রুগির বাড়ির লোক সকলেরই ভরসা এখন জলখাবারের চা টোস্ট অমলেট পোচ কফি। দুপুর গড়ালে কলেজস্কোয়্যারে বেজে ওঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত। ছাপাখানার শব্দের সঙ্গে মিশে যায় মেডিকেল কলেজের কান্না। নিঃসঙ্গ একা হেঁটে আসা মানুষগুলোকে ফুটপাথ জিজ্ঞাসা করে ‘দাদা কী লাগবে বলুন?’। 

কেবিনের সেই চপ কাটলেট চা আর টোস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুপুরের খাবারও।

একসময় খুব অবাক লেগেছে এসব দুপুর। বইপাড়ার দুপুর, তার এক আলাদা উপস্থিতি। শয়ে শয়ে ছাত্রছাত্রী যারা তাদের আগামী দুবছরের অবস্থানও জানে না কিচ্ছু, অথচ দোকানদার জানতে উদগ্রীব, ‘ভাই কী লাগবে বলো’! ভাইয়ের যদি কিচ্ছু না লাগে? তার যদি খিদে পেয়ে থাকে ভরপুর আর পকেটে টাকা থাকে গোনাগুণতি? সে বসন্ত কেবিনে যাবে… দুপুরের দিকে যেখানে সৃষ্টি হয় ভাত, পরোটা। হ্যাঁ, সৃষ্টিই হয়। এপাড়ায় রাঁধুনিও শিল্পী। তাদের সঙ্গত দেয় মাছ, ডিম, মুরগী, খাঁসি। ছাত্রছাত্রীরা টিউশন বা বাড়ি ফেরার বাস ধরে। বইপোকারা ছেয়ে ফেলে কলেজস্ট্রিট। সূর্য ডুবে গেলে পড়ার বই থেকে গল্প কবিতায় নেমে আসে ভিড়। টেক্সট থেকে ননটেক্সটে ঝুঁকে ডুবে যায় বইপাড়ার সূর্য। প্রেসিডেন্সিতে মায়া জ্বলে ওঠে। সিইউ-এও। পুলের জলে খাবি খায় সেই আলো। লক্ষ লক্ষ বই আসে আর ছড়িয়ে যায় ধমণী দিয়ে। ফিরে যায় গোটা শরীরে, আবার ফিরে আসে পরের দিন। এভাবে একটা শরীর বেঁচে থাকে, এভাবে একটা পশ্চিম বাংলা বেঁচে থাকে। আর এই জীবকোষের মাইটোকন্ড্রিয়া বসন্তকেবিনে তখন উনুনে তেল চাপে আবার। চা হয়, টোস্ট হয়, সঙ্গে হয় ফিসফ্রাই, কাটলেট, কবিরাজি, মোগলাই পরোটাও। বসন্ত কেবিন তখন আড্ডায় জমজমাট। আমরা ঢুকে দেখতে পাই রায় বংশের রাজত্ব শক্ত হাতে সামলাচ্ছেন যমুনাদেবী তাঁর সিংহাসনে বসে।

Developed by DXDasia