
পৃথিবীর অন্যতম সেরা সৈকত খাজানা
যেন চোখের সামনে একটা লুমিনিস্ট পেইন্টিং বসিয়ে রাখা আছে। তুলির টানে টানে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে তৈরি হচ্ছে রহস্য, মায়াবী হয়ে উঠছে জলে ঠিকরে পড়া সূর্যের লাল আলো। এরকমই সুন্দর গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত। বাউল গানের মতো উদাস এই বিচে এখনও লোক সমাগম খুবই কম। লোকজন বলে থাকেন, এই সৈকত এতটাই নির্জন যে সামান্য পিন পড়ার শব্দও শোনা যায় এখানে। সাধারণভাবে সমুদ্রসৈকত বলতে আমরা যা বুঝি, তার থেকে গুলিয়াখালি বিচ অনেকটাই আলাদা। অন্য সব সৈকতে ধু ধু করে বালি, আর গুলিয়াখালিতে সমুদ্রের তীরে মাদুরের মতো ঘাস বেছানো। তাই সবুজ রংটা এখানে মাস্ট। নইলে পেইন্টিং সম্পূর্ণ হবে না। যদি কখনও এই বিচে যান, একবার সেই ঘাসে শুয়ে পড়তে আপনার মন চাইবেই চাইবে। তবে ঘাসগুলি কিন্তু খুবই ধারলো। বসলে পেছন দিকে ফোটার সম্ভাবনা থেকে যায়। খালি পায়ে হাঁটলে পায়েও ঘাস ফুটতে পারে।

অন্যান্য বিচের থেকে গুলিয়াখালির আরেকটা পার্থক্য এখানকার ভূমিরূপ। মাটি কিন্তু এখানে মোটেই সমতল নয়। বরং মাটির এপাশ ওপাশ দিয়ে খালের মতো ঢুকে গেছে সমুদ্র। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এইসব খালে জোয়ারের সময় জল ভরে ওঠে। সবুজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে স্রোতের জল ঢুকে গোটা পরিবেশকে অপরূপ করে দেয়। গুলিয়াখালির আরেকটা আকর্ষণ কেওড়ার বন। বনের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা খালের চারদিকে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল বেরিয়ে থাকে। এই বন সমুদ্রের অনেকটা ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। সোয়াম্প ফরেস্ট আর ম্যানগ্রোভ বনের আমেজ মাতিয়ে দেবে যে কোনো মানুষকেই। বিচে ঢোকার আগে একবার জঙ্গলে ঘুরে নেওয়া ভালো। সেখানে অনেক সময় হরিণেরও দেখা পাওয়া যায়।
প্রকৃতি যেন আলাদা খামখেয়ালি রকমের যত্ন নিয়ে এই বিচ তৈরি করেছে। তবে বিকেলবেলা গুলিয়াখালির সৌন্দর্য ট্যুরিস্টদের মুগ্ধ করে সবচেয়ে বেশি। ওই সময়ে সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে বসে থাকার মজাই আলাদা। অনেকে বিচে ফুটবল নিয়ে যায়। তবে বিচে নামার আগে জোয়ারের সময়টা জেনে নেওয়া দরকার। জল বাড়লে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় নইলে। আরেকটু মজার স্বাদ পেতে হলে নৌকো ভাড়া করে সমুদ্র আর ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে ঘুরে বেরানো যেতে পারে। যখন ঢেউ এসে নৌকোয় ধাক্কা দেয় আর নৌকোর মাথাটা প্রচণ্ডভাবে দুলে ওঠে, তার অনুভূতি কিন্তু দারুণ রোমাঞ্চ এনে দেয়। নৌকোর বদলে মাছ ধরার ছোটো জাহাজে উঠে চলে যেতে পারেন সন্দ্বীপ।

স্থানীয় মানুষের কাছে গুলিয়াখালি বিচের একটা ডাকনাম আছে। তাঁরা বলেন ‘মুরাদপুর বিচ’। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় এই সৈকত রয়েছে। পাহাড়ি খরস্রোতা ঝরনার জন্য নামডাক আছে সীতাকুণ্ডের। চট্টগ্রাম শহর থেকে সীতাকুণ্ডের বাস পাওয়া যায়। গুলিয়াখালি বিচে যেতে হলে সীতাকুণ্ড বাজার থেকে সিএনজি বা অটোরিক্সা ধরতে হবে। আর ঢাকা থেকে যেতে হলে চট্টগ্রামগামী কোনো বাস ধরে নামতে হবে বড়োদারোগার হাটে। সেখান থেকে সিএনজি করে মহানগর হয়ে পৌঁছে যাবেন সৈয়দপুর গুলিয়াখালি বিচে। বিচটা এখনও যেহেতু অনেকের কাছে অপরিচিত, তাই নিরিবিলি হওয়ার কারণেই পরিবেশ দূষণের কবলে এখনও গুলিয়াখালি পড়েনি। পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর সি বিচগুলোর মধ্যেও জায়গা করে নিয়েছে এই সৈকত।
ছবি সূত্র – মহম্মদ নাঈম
