গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর – সচেতনতার কাণ্ডারি সঞ্জিত দাস

পরিবেশ বাঁচাতে গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত নিরলস প্রচার করে চলেছেন তিনি

কদিকে রাজ্য যখন গঙ্গাসাগর মেলায় সমস্ত কোভিড বিধি মেনে চলা নিয়ে তৎপর, ঠিক তখনই আমাদের নজর কাড়ে এক ব্যক্তির অনন্য কর্মকান্ড। পরিবেশ বাঁচাতে গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত নিরলস প্রচার করে চলেছেন তিনি। সিঙ্গল-ইউস প্লাস্টিক প্রোডাক্টস (SUPPs) বা  একবার ব্যাবহার যোগ্য প্লাস্টিক পণ্যসামগ্রী নিত্যদিন আমাদের প্রয়োজনে লাগে ঠিকই, কিন্তু এর উৎপাদন, বিতরণ এবং বর্জন পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটা বড়োসড়ো হুমকি। প্লাস্টিক বর্জ্যের অধিকাংশই ভূমি থেকে অপসারিত হয়ে প্রবেশ করে আন্তঃসীমান্ত নদীতে। আর এভাবেই প্লাস্টিক দূষণ স্থানীয় থেকে আঞ্চলিক, উভয় ক্ষেত্রেই সংকট ডেকে আনে।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই বিপদের হাত থেকে পরিবেশ তথা নিজেদেরকে বাঁচানোর সব দায়ই মানুষের নিজের হাতে। তাই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য মানুষকেই হয়ে উঠতে হবে যথেষ্ট সংবেদনশীল। আর তার জন্য প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর সচেতনতার যথাযথ প্রচার। হুগলির জেলার ত্রিবেণীর বাসিন্দা বছর ৬৪-র সঞ্জিত দাস, মনে প্রাণে একজন প্রকৃতিপ্রেমী। যিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মই পারে এক পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। আর তাই, সেই স্বপ্নের তাগিদেই সঞ্জিতবাবু নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন প্রজন্মকে সংবেদনশীল করে তোলার দায়িত্বও।এই লক্ষ্যেই গত বছর সঞ্জিত দাস প্লাস্টিক মুক্ত পরিবেশের জন্য একটি প্রচারাভিযানের সংকল্প করেছিলেন এবং মনস্থির করেন গঙ্গানদীকে সঙ্গী করেই শুরু করবেন এই যাত্রা। সেই মতো উত্তরাখণ্ডের গোমুখ উত্স থেকে গঙ্গাসাগরের বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গা নদীর এই দীর্ঘ ২৪৩৯ কিলোমিটার যাত্রাপথটি অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নেন। গঙ্গা নদীকে পাশে রেখে ভারতের একাধিক শহরের ওপর দিয়ে হেঁটে এসেছিলেন তিনি। লক্ষ্য ছিল একটাই, পবিত্র গঙ্গা নদী কিভাবে মাইক্রো-প্লাস্টিকের দ্বারা প্রচণ্ডভাবে দূষিত হচ্ছে, তা সন্ধান করা। এবং ভারতে জল দূষণের প্রধান উৎসটিকেও স্বচেষ্টায় প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিলেন তিনি।

তিনি মনে মনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যাতে ভারতের প্রাচীন এবং পবিত্রতম নদীগুলির ক্ষতি সাধনকে প্রতিহত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে পারেন। আর সেই ইচ্ছেপূরণের লক্ষেই তিনি পাহাড় এবং সমতল ঘেরা এই দীর্ঘ বিপজ্জনক যাত্রার প্রতি অগ্রসর হন। না, মোটেই এটা কোন সহজ কাজ ছিল না! কাজটা সঞ্জিতবাবু করেছিলেন ঠিকই, তবে সঙ্গে ছিল তাঁর পরিবারও। সঞ্জিতবাবুর পায়ে হেঁটে যাত্রার এই মহৎ উদ্যমে প্রতিনিয়ত সাহস আর সমর্থন জুগিয়েছিলেন তাঁরাও। চার বছর হল অবসর নিয়েছেন সঞ্জিত বাবু, এর আগে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। তবে তিনি চিরকালই ভ্রমণপিপাসু মানুষ। তাঁর কাছে পাহাড়ের ডাক এমনই যা তিনি কোনদিনই উপেক্ষা করতে পারেননি নির্ভীক সঞ্জিত দাস। ইতিমধ্যেই হিমালয়ের বিভিন্ন পর্বতশৃঙ্গে পা রেখেছেন তিনি, যার মধ্যে রয়েছে বালজৌরি, এম-থার্টি এবং কেদারডম পিট ইত্যাদি।প্রায় ছয় মাস আগে এই যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। কাঁধে ছিল সবসময়ের সঙ্গী একটি পিঠব্যাগ। ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে তিনি দিনে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতেন। সঞ্জিতবাবু উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে শুরু করেছিলেন তাঁর ৯৮ দিনের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ। অবশেষে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি গঙ্গাসাগরে এসে পৌঁছান তিনি। তিনি প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ হাঁটতেন বলে জানা যায়।

কেমন ছিল তাঁর এই দীর্ঘ সফরের অভিজ্ঞতা? সেই স্মৃতিচারণে সঞ্জিতবাবুর গলায় লেগে থাকে উচ্ছ্বাসের রেশ। তিনি দাবি করেন, তাঁর এই দীর্ঘ হাঁটাপথে তিনি প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। অনুরোধ জানিয়েছেন তাদের সবধরনের প্লাস্টিক পরিত্যাগের জন্য। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পরিবেশ বাঁচানোর চেষ্টায় তিনি তাদের আরও সক্রিয় হতে বলেছেন এবং সুন্দর আগামীর লক্ষ্যে গাছ লাগানোর কথাও বলেছেন তিনি।এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সঞ্জিতবাবু সবসময় নিজস্ব তাঁবু বহন করেছিলেন। মূলত জল এবং বিদ্যুৎ পাওয়া যায় এমন একাধিক জায়গায় তিনি তাঁবু খাটিয়ে থেকেছেন এই জার্নিতে। সাধারণ মানুষের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সঞ্জিত বাবু জানান, বিভিন্ন জায়গার স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে সব সময় সহযোগিতা করেছেন এই কাজে। এছাড়াও তিনি থানা, বাসস্ট্যান্ড, ধাবা, মন্দির ইত্যাদি সংলগ্ন খোলা জায়গায় থেকেছেন বিভিন্ন সময়ে। তাঁর যাত্রাসঙ্গী ছিল আরও একটি জিনিস, সেটি হল জাতীয় পতাকা। তিনি পরম গর্বে বহন করতেন সেটি। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজ্যের অনেক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর কথা হয়, সকলেই এই কাজে তাঁকে উত্সাহিত করেন। নিজের পরিচিত ঘর ফেলে পথকে সঙ্গী করে বেরিয়েছিলেন সঞ্জিতবাবু। আর এই যাত্রাপথে পাওয়া বন্ধুদের উৎসাহ, সহযোগিতাই প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে বছর ৬৪-র এই ‘যুবককে’, পৌঁছে দিয়েছে তাঁর লক্ষ্য পূরণের ঠিকানায়। তিনি তাঁর এই সচেতনতার যাত্রাপথ গঙ্গাসাগরে এসে শেষ করেন কারণ তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে এটিই তার সচেতনতামূলক কর্মকান্ডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয় এখানেই। তাই এখানেই তাঁর এই সচেতনতার মিশন শেষ করেন তিনি। তাঁর একটাই আশা, পবিত্র গঙ্গা নদী কলুষিত না হয়। গঙ্গার দূষণ প্রতিরোধে এটাই ছিল তাঁর অনন্য পদক্ষেপ।

 

প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে

Developed by DXDasia