ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : হাফ হাতা জামার দিন

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ১

গত রবিবার USTS (United States Training Ship) কেনেডি (Kennedy) জাহাজে চেপে ‘চল ভাসি সবকিছু তাইগ্যা’ গোছের একটা পরিস্থিতিতে পড়েছি। আজ মোটামুটি চারদিন হল আমি ভাসমান পথচারী। রবিবার সকালে যখন আমাদের জাহাজ নোঙর তুলে, কাছি খুলে, আটলান্টিকে পাড়ি জমালো, তখন বাইরে কনকনে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর হিমেল হাওয়া। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ঝুরঝুরে বরফ পড়ছে। তবু সেই আবহাওয়াতেও সন্তানস্নেহে ব্যাকুল কয়েকজন বাবা-মা তাদের ছানাদের বিদায় জানাতে বন্দরে নানারকম ফেস্টুন নিয়ে হইচই করছিলো, “We will miss you Billy!” “Have a safe voyage Brittany!” নানারকম শুভেচ্ছা আর ঘোলাটে ধূসর সকাল পিছনে ফেলে আমরা এগোলাম উষ্ণতার সন্ধানে। আগামী বন্দর ট্যাম্পা (Tampa), ফ্লোরিডা (Florida)। কথা আছে সেখানে পৌঁছবো আসছে শনিবার। আমি ঠিক করেছি এই মওকায় ডিসনিল্যান্ড (Disneyland) আর ইউনিভার্সাল স্টুডিও (Universal studio) দেখে ফেলবো।

প্রথম তিনদিন আমার ঘরের হিটিং সিস্টেম কাজ করছিল না। তাই ঘরের তাপমান ছিল ৪৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট অথবা ৯.৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল মনে হয় জাহাজের ইঞ্জিনিয়াররা সেটা সারিয়েছে, কারণ রাতে আমাকে আর মাঙ্কি ক্যাপ, দস্তানা, উলের মোজা আর তিনটে সোয়েটার পরে ঘুমোতে হচ্ছে না। এখানে দৈনিক রুটিন মোটামুটি এইরকম – সকাল সাড়ে ছ’টায় ঘুম থেকে উঠে, চটপট ঘরের ইলেকট্রিক কেটলিতে বানানো দার্জিলিং চা সহযোগে দুটো ব্রিটানিয়া মারি বিস্কুট। এসবই বস্টনের ভারতীয় দোকান থেকে কেনা। তারপর সাড়ে সাতটার ভেতরে চান টান করে রেডি হয়ে, অফিসারদের ডাইনিং রুমে গিয়ে একগ্লাস অরেঞ্জ জুস আর হালকা ব্রেকফাস্ট সেরে ঠিক সকাল আটটায় ছাত্র পড়ানো শুরু।

এই কাজে আমাকে সাহায্য করছে আমার তিন জন ছাত্র-ছাত্রী। মাইকেল, হেদার আর বেঞ্জামিন। মাইকেল একটু ছেলেমানুষ গোছের। অল্পেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে… কিন্তু সব কাজ খুব মন প্রাণ দিয়ে করতে চেষ্টা করে। হেদার খুব গুছিয়ে কাজ করে আর বেঞ্জামিন হল একজন পাকাপোক্ত সেলসম্যান। ওর কথা বলার জাদুতে আমরা বোধহয় এস্কিমোদেরও বরফ বিক্রি করতে পারব। আমাদের কাজ হল এই সমুদ্র ভ্রমণে মোট ৬০০ জন ছাত্রছাত্রীকে মেরিটাইম বিজনেস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করা। এই ৬০০ জনকে ছোটো ছোটো ২০ জনের দলে ভাগ করা আছে। প্রতিটি দলকে আমরা ঠিক দুদিনের জন্য পাই। সেই দুই দিনের ভেতরে আমাদের প্রোগ্রাম সম্বন্ধে তথ্য জানিয়ে ওদের আমাদের দলে ভিড়তে উদ্বুদ্ধ করাই হল কাজ। আমার মতোই আর পাঁচটা ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকেরাও একই অভিসন্ধিতে এই জাহাজে এসেছেন। অতএব আমাদের ডিপার্টমেন্টের টিকে থাকা এবং উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধির পক্ষে এই সমুদ্র বিহার নিতান্ত জরুরি।

যাই হোক, সকাল আটটা থেকে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ক্লাস চলে। মাঝে ১০ মিনিটের বিরতি। লাঞ্চের পরে আবার ক্লাস শুরু আর চলে সাড়ে তিনটে পর্যন্ত। পড়ানো শেষ হয়ে গেলে সহকারীদের সঙ্গে বসে পর্যালোচনা করি দিনের ঘটনাবলি। কোন জিনিসটা ভালোভাবেই উতরে গেলো – কোনটা আরেকটু ভালো করা যেত – ইত্যাদি। তখন আমরা বসে সেই সব জিনিস ঠিকঠাক করে নিই।

এখানে সন্ধে ছ’টার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে ফেলতে হয়, কারণ আমরা খেলে সব ধোয়াধুয়ি সেরে রাঁধুনিদের ছুটি। তাই প্রতিদিনই রাত দশটা নাগাদ আমার একটা কী খাই খাই ভাব হয়। এখানকার পাকা রাঁধুনি চমৎকার চকোলেট চিপ কুকিজ, ব্রাউনি ইত্যাদি সাজিয়ে রেখে যায় রাতের স্ন্যাকসের জন্য। সন্ধেবেলা আমি, ক্যাপ্টেন টিম আর ডাক্তার জন স্ক্র্যাবল খেলি। এখনও পর্যন্ত ক্যাপ্টেন টিম রোজ জিতেছে, ডাক্তার জন রোজ হেরেছে আর আমি রোজ সেকেন্ড হয়েছি। আজ দেখব এই র‍্যাঙ্কিং- -এ কোনো হেরফের হয় কিনা!

আমি এই জাহাজের ছোটো-বড়ো সব ঘটনা তোমাদের লিখব আর আশা করবো তোমরা আমার চোখ দিয়ে দেখতে পাবে ঘন নীল সমুদ্র, কমলালেবু রঙের সূর্যাস্ত আর পরিচিত বাসভূমিকে অনেক পেছনে ফেলে আসা যাযাবর গাংচিল। আজকে অনেকদিন পরে হাড় কাঁপানো শীতকে অতিক্রম করে আমরা উষ্ণতার আশ্রয়ে এসেছি… আজ প্রথম বাদামি ওভারকোট আলমারিতে ঝুলিয়ে পরনে চাপিয়েছি হাফ হাতা ঘন নীল জামা। আজ প্রথম খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে চোখ ভরে দেখেছি মাঝ-সমুদ্রের বিস্তার… আর মনে হয়েছে যে ঠিক এমনই একটা মুহূর্তেই হয়তো ভাবা যায়…

“চিত্ত যেথা ভয় শূন্য উচ্চ যেথা শির
জ্ঞান যেথা মুক্ত যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি”

এখনও পর্যন্ত জাহাজের ডাক ব্যবস্থা ঠিক কাজ করছে না। তাই আমি তোমাদের চিঠি লিখতে পারিনি। এই চিঠি যেদিন পাবে, জানবে সেদিন থেকেই ডাক ব্যবস্থার একটা হিল্লে হয়েছে। এই চিঠি পৌঁছে যাবে অনেকগুলি ডাকবাক্সে, যারা ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ঠিকানায়। কলকাতা অথবা কিংস্টন, বস্টন অথবা ব্যারাকপুর, টাটানগর অথবা টরন্টো – যেখানে তুমি থাকো না কেন, এই আবাহন ও বিসর্জন বিহীন ব্যক্তিগত অথচ সার্বজনীন চিঠিগুলি তোমাকে আমার অনুভূতির পোঁটলাপুঁটলি পৌঁছে দেবে। আজকে আমরা ট্যাম্পা এসে পৌঁছেছি। এখানে এক স্টারবাকস ক্যাফে থেকে এই পুরোনো চিঠি পাঠালাম। নতুন চিঠি লিখবো কালকে… নতুন দিনের শেষে।

ভালো থেকো।

 

ক্রমশ…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে।

 

Developed by DXDasia