
অতি সাধারণ স্তর থেকে চিন্তাশীল মানুষ, সকলের কাছে পৌঁছে গিয়েছে উৎপলের ‘প্রোপাগান্ডা’
পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত। ‘টিনের তলোয়ার’-এ সময়ের মরচে ধরেনি এখনও। একটি পর্বচিত্র কীভাবে কালজয়ী হয়ে উঠতে পারে তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নাট্য-ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের এই বহুল চর্চিত এবং যুগান্তকারী নাট্য ‘টিনের তলোয়ার’। শুধু মঞ্চ নয়, বাংলা সাহিত্যেরও এক অমূল্য সম্পদ এটি। বাংলা রঙ্গমঞ্চের শতবর্ষ পূর্তিতে ১৯৭০ সালে রচিত এবং পিপলস্ থিয়েটারের প্রযোজনায় ১৯৭১ সালে প্রথম অভিনীত এই মহান সৃষ্টির সুবর্ণ জয়ন্তীতে একবার দেখে নেওয়া যাক একালেও কতখানি প্রাসঙ্গিক এ নাটক।
‘টিনের তলোয়ার’-এর মুখবন্ধে, উৎপল দত্ত লিখেছিলেন, “বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের শতবার্ষিকীতে প্রণাম করি সেই আশ্চর্য মানুষগুলিকে- যাহারা কুষ্ঠগ্রস্থ সমাজের কোন নিয়ম মানেন নাই, সমাজও যাহাদের দিয়াছিল অপমান ও লাঞ্ছনা। যাহারা মুৎসুদ্দীদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকিয়াও ধনীদের মুখোশ টানিয়া খুলিয়া দিতে ছাড়েন নাই। যাহারা পশুশক্তির ব্যাদিত মুখগহ্বরের সম্মুখে টিনের তলোয়ার নাড়িয়া পরাধীন জাতির হৃদয়বেদনাকে দিয়াছিল বিদ্রোহ-মূর্তি। …যাহারা সৃষ্টিছাড়া, বেপরোয়া, বাঁধনহারা। যাহারা মাতাল, উদ্দাম, সৃষ্টির নেশায় উন্মাদ। যাহাদের উল্লসিত প্রতিভায় সৃষ্টি হইল বাঙালির নাট্যশালা, জাতির দর্পণ, বিদ্রোহের মুখপত্র। যাহারা আমাদের শৈলেন্দ্রসদৃশ পূর্বসূরী।”
ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়কে এবং সেই সময়ের দ্বন্দ্ব-বাস্তবতাকে শিল্পের আঙ্গিকে তুলে ধরেছিলেন উৎপল দত্ত। ঔপনিবেশিক শাসন, পুঁজিবাদ, বাবু-সংস্কৃতি, নবজাগরণ এবং স্বদেশ-চেতনার প্রেক্ষিতে শ্রেণি ও ব্যক্তির স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষ এই নাটকের বিষয়বস্তু। নাটকের কুশীলবেরা মূলত একটি পেশাদারি থিয়েটার দল (গ্রেট বেঙ্গল থিয়েটার)-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত। উনিশ শতকের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক সময়ে ঘটে চলা সাংস্কৃতিক বিপর্যয় চিনিয়ে দেয় একটি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান। প্রকৃত শিল্পের সঙ্গে জীবনের যোগ কত গভীর, বা অন্যভাবে বলা যায় জীবনবোধ বর্জিত শিল্প কতখানি ঠুনকো, তা পরিস্ফুট হয় ‘টিনের তলোয়ার’-এর নির্ঘোষে।
বামপন্থী দর্শনে বিশ্বাসী নাটককার উনিশ শতকের সংকটকে মার্ক্সীয় বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এ নাটকের একেকটি চরিত্র তাই একেকটি বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধি, এবং তারা শ্রেণি-কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে থেকে একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। যেমন:
‘কলকাতার তলায়’ থাকা মেথর মাথুর আসলে প্রলেতারিয়েৎ। তার কাছে মুৎসুদ্দি বীরকৃষ্ণ দাঁ এবং থিয়েটারওয়ালা বেণিমাধবের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। তার কাছে দুর্বোধ্য মধুসূদনের কাব্যের চেয়ে বাইজির খ্যামটা কিংবা বস্তির রামলীলা বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলার গ্যারিককে সে অবলীলায় বলতে পারে, “…মুখে রং মেখে চক্রবেড় ধুতি পরে, লাল-নীল জোড়া আর ছত্রি পরে রাজা উজির সাজো কেন? এত নেকাপড়া করে টিনের তলোয়ার বেঁধে ছেলেমানুষী করো কেন? …যা আছে তাই সাজো না! গায়ে বিষ্ঠা আর কাদা লেগে আছে দেখছো? …সেটা দেখাতে নজ্জা হয় বুঝি? …হেঁ:, চাটুজ্যে বামুনের জাত যাবে তাতে।”
মাথুরের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় বাবু-বংশোদ্ভূত কিন্তু ডিরোজিও পন্থী প্রিয়নাথের মুখে, “আমি বহুদিন যাবৎ লক্ষ্য করেছি আপনাদের কদর্য জীবনবোধ বর্জিত নাটকের মিথ্যা আড়ম্বর। বাইরে পুরাতন সমাজ বিধ্বস্ত হচ্ছে আর নাট্যশালায় আপনারা কাশ্মীরের যুবরাজের মূর্খ প্রেমের অলীক স্বর্গ রচনা করে চলেছেন।” প্রিয়নাথ এখানে উচ্চ-শিক্ষিত, আদর্শবাদী, সংস্কারপন্থীদের প্রতিনিধি। পুঁজিপতি এবং নারীদেহ-লোলুপ নিজের বাবাকে সে ঘৃণা করে। আপাদমস্তক বিলেতি পোশাক এবং অনর্গল ইংরেজি বাক্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে তার স্বদেশী মন। দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ প্রিয়নাথ লিখে ফেলে ‘পলাশীর যুদ্ধ’ এবং ‘তিতুমীর’-এর মতো নাটক। বেণিমাধবের কথায়, “শালা! রক্তের মধ্যে ঢুকে যায় এমন সব চোখা চোখা কথা!” কিন্তু এহেন প্রিয়নাথের প্রগতিশীলতাও প্রশ্নাতীত নয়; সে-ও বিশ্বাস করে নারীর ‘সতীত্বে’।
বীরকৃষ্ণ দাঁ উনিশ শতকের পুঁজিবাদি, বৃটিশের দালাল, মুৎসুদ্দি ‘বাবু’ শ্রেণির প্রতিনিধি; যার সামাজিক সম্মান নির্ধারিত হয় রক্ষিতার সংখ্যার ওপর। বিদ্যা ও শিল্পবোধ বর্জিত এই বাবুটি টাকার জোরে কিনতে চায় বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য প্রতিভাকেও। ক্ষমতার আস্ফালন ঝরে পড়ে তার কদর্য মুখ থেকে, “টাকার সামনে অমন অনেক বন্দুকের নল মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, কাপ্তেনবাবু! দু’হাতে আটটা জড়োয়ার আংটি। এর যেকোনো একটা দিয়ে আপনাদের ওই সাহিত্য-ফাহিত্যকে কিনে রাখতে পারি।” গ্রেট বেঙ্গল নাট্যদলের স্বত্বাধিকারী সে। তাই তার পছন্দমতই নির্ধারিত হয় নাটক। তার মতে দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘সধবার একাদশী’ “চূড়ান্ত রকমের অশ্লীল। পাশে রাঁড় নিয়ে বসে দেখা যায় না।” উপরন্তু, “কলকাতার বাবুদের ব্যঙ্গ করেছে ও পালায়। আমাদের গাল দেবে আমরাই টাকা ঢালবো, এমন মামাবাড়ির আব্দার চলতে পারে না।” শুধু তাই নয়, ‘তিতুমীর’-এর মতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নাটকও মঞ্চস্থ করা যাবে না। আবার একজন রক্ষিতা (ময়না)-র বিনিময়ে সে নাট্যদলের স্বত্বাধিকারও বিক্রি করতে রাজি।
নাটকের ময়না চরিত্রটি বার্ণার্ড শ’-এর ‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকের ক্যামেলিয়া এবং উনিশ শতকের প্রখ্যাত অভিনেত্রী বিনোদিনীর আদলে নির্মিত। নাট্যপরিচালক বেণিমাধবের যত্নে সবজিওয়ালি ময়না রূপান্তরিত হয় অভিনেত্রী শংকরীদেবী-তে। তার পক্ষে কোনো মূল্যেই আর পুরোনো জীবনে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ সে এখন দারিদ্র্যকে ঘৃণা করে। অর্থাৎ তথাকথিত ‘এলিট’ শ্রেণির প্রতিনিধি শংকরী এখন ‘প্রলেতারিয়েৎ’ ময়না-মাথুরের শ্রেণির শত্রু। একাধারে শিল্পী সত্তা এবং আভিজাত্য -এ দুটির কোনোটিকেই উপেক্ষা করতে না পেরে সে ঘৃণাভাজন বীরকৃষ্ণের শয্যাসঙ্গিনী হতেও প্রস্তুত, অথচ, প্রেমিক প্রিয়নাথকেও সে আগলে রাখে মনে। সমাজ-বাস্তবতার শিকার শংকরীর মর্মস্পর্শী উক্তি: “পারবো না। থিয়েটার ছাড়া বাঁচবো না। এরাই পিতামাতা, ভাইবোন, সব। এদের পথে বসিয়ে চলে যেতে পারবো না। আবার গরিব হয়ে যেতেও আমি পারবো না। দারিদ্র্যকে আমি ঘৃণা করি। সোপাণ বেয়ে ধীরে ধীরে উঠেছি এখানে… আবার ধাপে ধাপে নেমে গিয়ে গেরস্ত ঘরে ঝি-গিরি আমি করতে পারবো না।” মঞ্চের আলো ও সজ্জার মায়ালোকে রক্তমাংসের ময়না হারিয়ে যায়। এবং এই আপোষ যেন বসুন্ধরারও হেরে যাওয়া, যে ময়নার মধ্যেই খুঁজে পেতে চেয়েছিলো নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের বাস্তবায়নকে।
উনিশ শতকের গিরিশ চন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নাট্যব্যক্তিত্বের আদলে গড়া বেণিমাধবকে কোনো স্টেরিওটাইপ শ্রেণিতে রাখা সম্ভব নয়, আসলেই সে যেন একটি সফর, এক বিবর্তন, যেমন ‘টিনের তলোয়ার’ও একটি জার্নি। সে ‘বামুন’ হলেও ‘বাবু’ নয়, ‘কাপ্তেনবাবু’ অর্থাৎ নাবিক। সে বাবু-পদলেহনকারী হয়েও, বাবু-বিদ্বেষী। শিল্পের জন্য সে ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করতেও রাজি, আবার সেই শিল্পকেও আপোষ করতে পিছপা নয়। যেমন, নিজেদের থিয়েটার করার জন্য সে ময়নাকে বাঁধা দেয় বীরকৃষ্ণের কাছে, পলিটিক্যাল কারেক্টনেসকে প্রমাণ করতে তথাকথিত হিন্দুয়ানির মুখে ঝামা ঘসে বলেন, “সতীত্ব? সেটা একটা কুসংস্কার।” আবার ‘নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর ভয়ে সে ‘তিতুমীর’-এর বদলে ‘সধবার একাদশী’ নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়, “…দেশপ্রেমিকরা যেন ঐ গ্রেট নেশনেলের ভাঙা হাটে গিয়ে পসরা সাজান। এখানে দেশসেবকের ঠাঁই নেই। দেশপ্রেম! ইঃ! টিনের তলোয়ার নিয়ে গোরা সৈন্যের সঙ্গে লড়বেন?” এই বেণিমাধবই আবার মদ্যপ অবস্থায় ‘সধবার একাদশী’র মঞ্চে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠে ‘তিতুমীর’-এর সংলাপ। টিনের তলোয়ার এক লহমায় পরিণত হয় ইস্পাতের তলোয়ারে। সুবিধাবাদের জায়গা থেকে সরে এসে বেণিমাধব পরিণত হয় এক আপোষহীন প্রতিবাদী চরিত্রে।
মার্ক্সিজমের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং শেক্সপিরিয়ান ধারা একত্রে মিশেছে এ নাটকে। সমসময়ে একদিকে যখন গিরিশ কারনাড, হাবিব তানভির-এর মতো নাটককাররা উপনিবেশবাদ-বিরোধী অ্যান্টি-মডার্ন বা অল্টারনেটিভ মডার্নিটির থিয়েটার আঙ্গিক হিসেবে আদি সংস্কৃত বা লোকনাট্যের মধ্যে নাট্য-উপকরণ সন্ধান করেছেন, তখন উৎপল দত্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় যাত্রাপালার উপাদানগুলিকে থিয়েটারের মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন। এমনকি ‘যাত্রা করে ফাত্রা লোকে’ এই প্রবাদকে ভেঙে তিনি বেশকিছু উৎকৃষ্ট মানের যাত্রাপালাও পরিচালনা করেন। আসলে তাঁর লক্ষ্য ছিলো সমাজের অতি সাধারণ স্তর থেকে চিন্তাশীল সকল পর্যায়ের মানুষের কাছে তাঁর ‘প্রোপাগান্ডা’ পৌঁছে দেওয়া। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রোপাগান্ডার স্বার্থে তিনি শিল্প আঙ্গিকের সঙ্গে আপোষ করেননি, বরং চালিয়ে গেছেন আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা।
দুঃখের বিষয় যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং দেশীয় পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর যোগসাজশে উনিশ শতকে বাংলা থিয়েটারের ওপর যে আঘাত আসে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বাধীনতা-উত্তর এ রাজনৈতিক নাটকটিকে তদানীন্তন রাষ্ট্রীয় শক্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ কি শুধুমাত্রই আদর্শগত বিরোধ, নাকি সকল শাসনযন্ত্রের চরিত্রই এক! বর্তমানেও দেখি রাষ্ট্রযন্ত্র শিল্প-সংস্কৃতির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে উন্মুখ। এ প্রবণতা সর্বকালীন। আমাদের প্রতিবেশী একটি দেশে সম্প্রতি তালিবানি শাসনের কায়েম বর্তমান সময়ের অনিশ্চয়তাকেই আরও একবার প্রকট করে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝেমধ্যেই শান্তিপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের ভাষাকেও অবদমিত করার চেষ্টা বুঝিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রশক্তির কাছে ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন একটি মিথ মাত্র। তাই এসময়ে দাঁড়িয়েও মনে হয় ‘টিনের তলোয়ার’-এর ধার ভোঁতা হয়ে যায়নি। তাকে কোষমুক্ত রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
