‘নবান্ন’ নাটকে মুগ্ধ হয়ে বিজন ভট্টাচার্যকে চিঠি লিখলেন ইংরেজ সৈনিক বিল বাটলার

আজ নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্যের ১০৬তম জন্মদিন

প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপ্রতীপে প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে কখনও দাঁড়ান কেউ কেউ। গড্ডালিকার গতি রুদ্ধ হয়ে তাঁদের হাতেই জন্ম হয় ‘নতুন’-এর। আর এই ‘নব’কল্লোল আনতে গিয়ে সেই মানুষটি হয়তো বারবার রক্তাক্ত হন, মুখ থুবড়ে পড়েন, তবু দিনবদলের স্বপ্ন তাঁর চোখ ছাড়ে না। পরাধীন ভারতের এই বাংলায় এমনই এক স্বপ্ন দেখা মানুষের হাতে একদিন এক আবেগময় চিঠি এসে পৌঁছায়। তাঁর সৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে এক ইংরেজ সৈনিক ওই মানুষটিকে সেই চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠির খবর দ্রুত ছড়ালে একে তো ওই চিঠির প্রভাব তারওপর একের পর এক খবরের কাগজে তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেওয়া কথাবার্তা; জনমতের সাঁড়াশি চাপে অবশেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৪৪ সালে ‘দুর্ভিক্ষ তদন্ত কমিশন’ গঠন করলেন এরপর। সময় গড়াল। দীর্ঘ তদন্ত সাপেক্ষে এই কমিশন শেষ পর্যন্ত বাধ্য হল বলতে বাংলার পঞ্চাশের মন্বন্তর ‘ম্যানমেড’, যার জন্য প্রকারন্তরে দায়ী ইংরেজ সরকার। এই ঘটনার পর আর সর্বনামের আড়ালে ওই মানুষটিকে লুকিয়ে রাখা চলে না। ইতিহাস প্রমাণ দাখিল করে মানুষটির নাম বিজন ভট্টাচার্য, তাঁর যে অমূল্য সৃষ্টি বাংলার মন্বন্তরের প্রকৃত কারণকে সর্বসমক্ষে সামনে এনেছিল, সে নাটকের নাম ‘নবান্ন’। আর নিজে ইংরেজ হয়েও যিনি তার স্বজাতের এই বর্বরতা অনুভব করে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে, ‘নবান্ন’-এর ঘ্রাণে মুগ্ধ হয়ে ওই চিঠি লিখেছিলেন তিনি বিল বাটলার। কোনো নাটকের মাধ্যমে সামাজিক বিপর্যয়ের পিছনে ক্ষমতাসীন সরকারের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলার এই নজির পৃথিবীর ইতিহাসে সেই প্রথম।

বিজন ভট্টাচার্য মানেই জীবন জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এমনই নানা নজিরবিহীন ঘটনা, নিজের জন্য নয়, যে মানুষটি সবসময়ই বাঁচতেন অন্যের জন্য। তাই পয়সা রোজগার বা নাম যশ এসবকে পিছনে ঠেলে, অভাব, অভিযোগ, অনটনে চূর্ণ, হতভাগ্য মানুষের কথা বলবেন বলেই যেন তাঁর এ বেঁচে থাকা।

ছোটোবেলায় গ্রামে গ্রামে যাত্রা দেখে বেড়ানো মানুষটি অভিনয়টা ভালোবাসতেন, তাই সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলবার মাধ্যম হিসেবে বিজন ভট্টাচার্য বেছে নিয়েছিলেন এই অভিনয়কেই। নিজেই বলছেন, ‘…আমার ভীষণ ভালো লাগত ঐ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে থাকতে, ওদের সঙ্গে মিশতে। আমি লক্ষ্য করেছিলাম ওদের রিঅ্যাকশন কী হয়, ওরা কেমন করে কথা বলে। অসুখে কেমন করে কষ্ট পায়। …আমাকে যা ভীষণভাবে কষ্ট দিত, কোন্ আটফর্মে আমি এদের উপস্থিত করতে পারব! তারাশঙ্কর বা শরৎ চাটুজ্জের মত আমার কলম ছিল না…’। স্পষ্টতই বোঝা যায় এই কষ্টের প্রকাশই ঘটেছিল বিজন ভট্টাচার্যের লেখায় ও তাঁর অভিনীত চরিত্রে। ফলে পারিবারিক স্বচ্ছলতার মোড়কে দিব্যি যে মানুষটি হেসে খেলে জীবন কাটাতে পারতেন, তিনি জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতায় স্বেচ্ছায় বেছে নিলেন এমন এক জীবন যেখানে, ‘বাঁচতি গেলে খাওয়া জোটে না, খেতি গেল বাঁচা যায় না’ ঠিকঠাক।

বিজন হয়েছিলেন তাঁর বাবা ক্ষীরোদবিহারীর মতো, জমিজমা, সম্পত্তির হিসেব না কষা এক অন্য মানুষ। প্রচলিত গতে যাঁকে বাঁধা যায় না কিছুতে। ১৯১৫ সালের আজকের দিনে অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার খানখানাপুর গ্রামে বিজনের জন্ম। ঠাকুরদা রাসবিহারীর জমিজমা সে সময় গ্রাম্য সমাজে চর্চার বিষয় ছিল, নিজস্ব লেঠেল বাহিনীও ছিল তার। এহেন জমিদারীকে হেলায় ছেড়ে দেশভাগের অনেক আগেই বড় ছেলে বিজনকে নিয়ে অধুনা উত্তর চব্বিশ পরগণার আড়বেলিয়ায় চলে আসেন স্কুল মাস্টার ক্ষীরোদবিহারী। ম্যাট্রিকের পড়ালেখা শেষ করে বিজন প্রথমে আশুতোষ ও পরে রিপন কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি অর্জন আর হয় না, মাঝপথে পড়া ছাড়েন তিনি। কারণ ততদিনে রুশ বিপ্লব পৃথিবীর ‘প্রগতিশীল’ ছেলেমেয়েগুলোর চোখে স্বপ্ন এঁকে দিচ্ছে। পনেরো বছর বয়স থেকেই ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, মহিষবাথান লবণ সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেওয়া বিজনের চিন্তায় ততদিনে ছাপ ফেলছে বাম রাজনীতি। অথচ প্রথম দিকে এমন কোন স্থির উদ্দেশ্য ছিল না, নিজেই বলছেন সে কথা, ‘কলকাতায় এসে বেলুড়মঠে যাতায়াত করতাম। ‘had a very sound health’, লোকে আমাকে ভয় করত। … বাবার সেবক সমিতিতে উদ্যোগী ছিলাম। জনহিতকর কাজ ভালো লাগত। কলকাতায় এসেও গ্রামের লোক আর সাধু সন্ন্যাসীর সঙ্গে মিশতাম। সেবা করতে পারতাম, সেবা করে অনেক রুগী বাঁচিয়েছি।’

কলেজে পড়তে পড়তেই রেবতী বর্মনের লেখা পড়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আসক্ত হলেন বিজন। মুজফ্ফর আহমেদের সংস্পর্শে আসেন এবং ১৯৪২-৪৩ নাগাদ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। এইসময়েই গনতন্ত্রের ক্রম অবনমনে দগ্ধ হয়ে বিজন বাবু ফ্যাসিবাদী বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ এবং গননাট্য আন্দোলনেও জড়িয়ে যান। এরই মধ্যে বাংলার বুকে তার করাল থাবা ফেলে ১৩৫০-এর দুর্ভিক্ষ। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, সামাজিক অবক্ষয়ে জীর্ণ হয়ে এই সময় কলম ধরলেন নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর নাট্যজীবন শুরুই হয় ১৯৪৩-এ। ‘অরণি’ পত্রিকায় বেরলো তাঁর লেখা প্রথম নাটক ‘আগুন’। ১৯৪৪-এ ‘জবানবন্দী’। মনে রাখতে হয় যে, সময় বিজন বাবুরা নাটক লিখতে শুরু করেন তখন কিন্তু বাংলায় কাহিনি ও নায়ক-নায়িকা নির্ভর পেশাদারী থিয়েটার জনপ্রিয়। অথচ ব্যক্তি নয় সমগ্রের কথা তুলে ধরবেন বলেই যে লেখা, বিজন ভট্টাচার্যের সেই নাটকে একক অভিনয় ও মঞ্চসজ্জার আড়ম্বর থেকে বেরিয়ে এসে গোষ্ঠীর সংলাপ উঠে এল। গণনাট্যের হাত ধরে জন্ম নিল গ্রুপ থিয়েটার। শাসকের ভিত নড়িয়ে দেওয়া নাটক ‘নবান্ন’ যখন লিখছেন বিজন, তখন তাঁর বাবার কঠিন অসুখ, পরিবারের দায়ভার বিজনের মাথায়, তিনি ফিরে যেতে পারতেন দাদুর জমিদারির সুখকর ঘেরাটোপে, কিন্তু ফিরলেন না। লেখাও ছাড়লেন না। ওই পরিস্থিতিতেও হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা তাঁর মনে যে গভীর রেখাপাত করেছিল তা নিয়ে লিখলেন কালজয়ী সৃষ্টি ‘জীয়ন কন্যা’। সংসার পাতলেন কবি মনীশ ঘটকের কন্যা মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে। কারণ দু'জনের চোখেই তখন এক চিন্তা, এক স্বপ্ন। কিন্তু সময় বড়ো ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ তাই ভাগ্যের ফেরে গণনাট্য, মহাশ্বেতা একসময় সবাই দূরে চলে গেছে বিজনের। ভাঙাচোরা মন নিয়ে তবু বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন বিজন। সবকিছু ছেড়ে রুজিরোজগারের জন্য বোম্বে গিয়ে হিন্দি সিনেমায় কিছুদিন স্ক্রিপ্ট লেখা ও অভিনয়, জীবনের টানে ফের কলকাতায় ফিরে এসে ১৯৫০-৫১ তে ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’ তৈরি, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্কে চিড়, কুড়ি বছর ক্যালকাটা থিয়েটার চালানোর পর সেখান থেকেও সরে এসে ‘কবচকুণ্ডল’ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা এবং শেষদিন পর্যন্ত নাটকের মধ্যেই বাঁচা; বিজন ভট্টাচার্যের জীবন যেন না লেখা এক বহু অঙ্কের নাটক।

জোতদার শ্রেণির অত্যাচার, জনমজুরদের সংগ্রাম, শাষকের চোখরাঙানিতে মরতে বসা গ্রামের মানুষ, সামাজিক অবক্ষয়ে সম্পর্ক হারানো হতভাগ্য মানুষ বিজন ভট্টাচার্যের উপজীব্য। ‘দেবীগর্জন’, ‘আজ বসন্ত’, ‘হাঁসখালির হাঁস’, ‘লাস ঘুইরা যাউক’, ‘কলঙ্ক’, ‘মাস্টারমশাই’, ‘মরাচাঁদ’-এর মতো নাটক সেই সাক্ষ্যই বহন করে। শুধু মঞ্চের অভিনয়ে নয়, ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা ‘সুবর্ণরেখা’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ বিজন ভট্টাচার্যের সাবলীল অভিনয় দাগ কাটে দর্শকের মনে। ‘নাগিন’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘বসু পরিবার’-এ তাঁর চিত্রনাট্য মুগ্ধ করে রাখে আমাদের। বিজন ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘জনপদ’, ‘রানীপালঙ্ক’, ‘সেনালী মাছ’-এ ঘুরে ফিরে আসে দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যায় যৌথ সংগ্রামের ডাক। যে মানুষের কাছ থেকেই প্রবঞ্চিত হয়েছেন সেই মানুষকে জড়িয়েই দিনের শেষে বাঁচতে চেয়েছেন বিজন। সংঘবদ্ধ বাঁচার আদর্শে তাঁর নাটক অনেক সময় অগোছালো হয়েছে, সাহিত্য মূল্যে শিখর ছুঁতে পারে নি অনেক ক্ষেত্রে, কিন্তু মানুষের ‘ডায়ালেক্টে’ কথা বলে বিজন ভট্টাচার্য সমাজের বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায় বারবার। তাই নাটকের নস্টালজিয়ায় বিজন ভট্টাচার্য যদি এক সুখকর নাম হন, বাস্তবের মাটিতে শাসককে চরম অস্বস্তিতে ফেলা এক না ভুলতে পারা নামও বোধহয় ‘তিনি’ই।

তথ্যঋণঃ গন্ধর্ব/ বিজন ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যা।

Developed by DXDasia