চিনাবাদাম চাষ করে বাংলার কৃষি-অর্থনীতিকে পথ দেখাচ্ছেন বেলদার অনিমেষ

বাংলায় ক্রমশ বাড়ছে চিনাবাদাম চাষের অভ্যাস

বেলদার চাষিরা চিনাবাদাম চাষের দিকে ঝুঁকছেন

মূল্যবৃদ্ধির দাপট এখন সমাজের সর্বত্র। তার ঝাপটা এসে লেগেছে কৃষিক্ষেত্রেও। খরচের বাড়বাড়ন্তের জন্য চাষিরা ঝুঁকছেন বিকল্প চাষ ও মিশ্র চাষ-এর দিকে। বিকল্প চাষ অর্থাৎ কম খরচে, লাভদায়ী কৃষিপণ্য উৎপাদন করা, যাতে তাঁদের উপার্জন এবং মুনাফা বৃদ্ধি পায়। এমনই একজন কৃষিজীবী হলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুর সাব-ডিভিশনের অন্তর্গত নারায়ণগড় সিডি ব্লকের বেলদা-২ গ্রামের, জলহারি শঙ্করকদা (Jalahari Shankarkada) এলাকার বাসিন্দা অনিমেষ দাস (Animesh Das)। তিনি আগে একজন ধানচাষী ছিলেন। কিন্তু এখন বোরো মরসুমে বোরো ধান (এই ধান রোপণ করা হয় নভেম্বর-ডিসেম্বরে এবং কাটা হয় মে-জুন মাসে) চাষের জমিতে চিনাবাদাম (Groundnut) ফলিয়েছেন।

চিনাবাদাম চাষ

অনিমেষ এবছর ধানের জায়গায় পরীক্ষামূলক ভাবে চিনাবাদাম চাষ করেছিলেন, কারণ তিনি দেখতে চেয়েছিলেন যে, চিনাবাদাম চাষ তাঁকে অপেক্ষাকৃত কম খরচে অধিক মুনাফা দিচ্ছে কি না। বেশ কিছুদিন ভাবনাচিন্তা করার পর তিনি নারায়ণগড় ব্লক কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেন, উপদেশ এবং সাহায্যের জন্য। এগ্রিকালচার ইনফরমেশন অ্যাডভাইসারি কমিটির আধিকারিকরা তাঁর এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁকে সমস্তরকমের সাহায্য করেছেন। আধিকারিকদের সহায়তায় তিনি চিনাবাদাম চাষ শুরু করেন। ধানচাষের থেকে চিনাবাদামের চাষ অধিক মুনাফাদায়ী। তিনি প্রথম পর্যায়ের ফসল কেটে ফেলেছেন এবং সেগুলিকে ঝাড়া এবং শুকানো করার প্রক্রিয়াও হয়ে গেছে। শুরু করেছেন বিক্রি করাও। কৃষিদপ্তরের আধিকারিকদের মতে, চিনাবাদাম এবং অন্যান্য বীজকোষধারী উদ্ভিদ চাষ করলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। এটি চিনাবাদাম চাষ করার একটি বাড়তি সুবিধা।

চিনাবাদাম হল ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তৈলবীজ

পশ্চিমবঙ্গে চাষের খরচ মুনাফার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। দিনে দিনে ধান চাষের খরচ বাড়ছে। ফলে অনেক কৃষিজীবীই ধানচাষ ছেড়ে অন্য জীবিকার দিকে ঝুঁকছেন। ধানচাষের জমির ভাড়া এবং সারের দামও ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা, জমি জরিপের মাধ্যমে বিভিন্ন আকারের চাষযোগ্য জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন খরচ এবং মুনাফার একটি হিসাব করেছিলেন। জরিপের কাজটি করা হয়েছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রান্তিক জায়গাগুলিতে। তাতে দেখা গেছে, ধানচাষের থেকে সবজি, সরষে, আলু চাষে বর্তমানে মুনাফা বেশি পাওয়া যায়। সরষে, ডাল, তিল চাষ করলে প্রতি হেক্টর জমিতে নেট লাভ প্রতি বছরই বাড়ছে। কিন্তু ধানচাষের ক্ষেত্রে চাষিরা ক্ষতির মুখও দেখছেন। ফলে চাষিরা ধান চাষ করতে চাইছেন না।

চিনাবাদাম ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তৈলবীজ। চিনাবাদামের মোট চাষযোগ্য জমির হিসাবে ভারতের স্থান বিশ্বে প্রথম এবং মোট উৎপন্ন চিনাবাদামের পরিমাণ হিসাবে বিশ্বে দ্বিতীয়। ভারতে চিনাবাদাম চাষের জমি গোটা বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ (২৪.৬ মেগাহেক্টর) এবং এখানে উৎপন্ন চিনাবাদামের পরিমাণ সারা বিশ্বের ২২ শতাংশ (৩৫.৭)। চিনাবাদামের ব্যবহার বহুক্ষেত্রে হয়ে থাকে, যেমন- সাবান তৈরিতে, কসমেটিকস শিল্পে, লুব্রিকেন্ট শিল্পে। চিনাবাদামের কেক, কৃত্রিম ফাইবার তৈরিতে কাজে লাগে। চিনাবাদাম গাছের সবুজ বা শুকনো পাতাকে হাউলমস (Haulms) বলা হয়। এগুলি গৃহপালিত পশুদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়। চিনাবাদামের খোসাগুলি ব্যবহৃত হয় কোর্স ব্রিজ, কর্ক ইত্যাদি তৈরিতে।

তৈলবীজের চাষ ভারতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যদ্রব্যে ভোজ্য তেলের বিপুল ব্যবহার ক্রমশই চিনাবাদাম চাষের ক্ষেত্রকে বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে জনসংখ্যা এবং উপার্জন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই চাহিদা আরও বাড়বে। বর্তমানে ভারতে চাহিদার থেকে কম পরিমাণে ভোজ্য তেল উৎপন্ন হয়। ফলে প্রচুর পরিমাণ ভোজ্যতেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

অনিমেষ দাস তাঁর মুনাফার ব্যাপারে আশাবাদী। তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর রাজ্যের কৃষিদপ্তরও সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। তিনি সম্পূর্ণ সফল হলে তিনি বাকি চাষিদের কাছে প্রেরণা হয়ে উঠবেন, যাঁরা চিনাবাদাম চাষ করে অনেক বেশি মুনাফার মুখ দেখতে পারবেন।   

Developed by DXDasia