
বঙ্গদর্শনে এক্সক্লুসিভ মহম্মদ সাত্তারউদ্দিন আহমেদ
লোকসঙ্গীতের মোট শাখা ৩৩২টি, তার উপশাখা আবার ৪২০টি। এর মধ্যে ৩২০টি সঙ্গীত অনায়াসে গাইতে পারেন মহম্মদ সাত্তারউদ্দিন আহমেদ। গান শেখানও তিনি। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, বাউল, ঝুমুর, মুর্শিদী, বৈষ্ণববাউল, মনসামঙ্গল, বিহু-সহ আরও অনেক লোকসঙ্গীত তাঁর গলায় নিজস্বতার সঙ্গে ফুটে ওঠে। নিজেই দোতারা বাজিয়ে সেইসব গান পরিবেশন করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। রাজ্য সরকারের লোকপ্রসার প্রকল্পের শিল্পী তালিকাতেও সাত্তারউদ্দিনবাবুর স্বীকৃতি রয়েছে। ছোটোবেলা থেকেই লোকসঙ্গীত নিয়ে মজে আছেন বত্রিশ বছর বয়সী এই সঙ্গীতশিল্পীর। আকাশবাণী শিলিগুড়ির নিয়মিত শিল্পী। সঙ্গীত-সাধনার জন্য স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর ডাক এলেই আর ঘরে থাকতে পারেন না, চাকরিরও বেশ সমস্যা হত। শেষমেশ সেই পেশা ছেড়ে ভরপুর মন দিয়েছেন সঙ্গীতে।

মহম্মদ সাত্তারউদ্দিন আহমেদের বাড়ি শিলিগুড়ির ভারতনগরে। বাবা প্রয়াত আজিমুদ্দিন মিঞা ছিলেন আকাশবাণী শিলিগুড়ির প্রবীণ লোকসঙ্গীত শিল্পী। দাদু বাংলাদেশের প্রয়াত বিশ্বখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। সাত্তারউদ্দিনের জন্ম কোচবিহার জেলার চিলকিরহাট অঞ্চলের দীঘিরহাট গ্রামে। বাবা আজিমুদ্দিন মিঞা শুধুমাত্র আকাশবাণীর শিল্পী ছিলেন না, আকাশবাণীতে চাকরিও করতেন। আকাশবাণীর কার্শিয়াং কেন্দ্রে বাবার প্রথম কর্মস্থল স্থির হলে মাত্র চার বছর বয়সে তিনি বাবার হাত ধরে কোচবিহারের গ্রাম থেকে শিলিগুড়ি চলে আসেন। এরপর বাবা যেখানে যেখানে গান করতে যেতেন, সঙ্গে যেতেন তিনিও। সেই অর্থে বাবা-ই তাঁর প্রথম সঙ্গীত শিক্ষাগুরু।
বাবার সঙ্গে বাইরে যেতে যেতেই প্রখ্যাত শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়ার সান্নিধ্য পেয়ে তাঁর কাছে বেশ কিছুদিন থেকে গান শেখেন। এরপর প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকা, অমর পাল, বুদ্ধদেব রায়, প্রহ্লাদ ব্রহ্মচারী, ললিত দাস, ধনেশ্বর রায়-সহ আরও অনেক শিল্পীর সংস্পর্শে আসেন সাত্তারউদ্দিন। বয়স ৩২ পেরিয়েছে। কিন্তু লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের ছোটো শিশু থেকে বয়স্ক মানুষ তাঁর শিলিগুড়ির বাড়িতে লোকসঙ্গীত শিখতে আসেন। বিভিন্নবয়সী ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকায় আছেন ঠেলা চালক, রিকশা চালক, ভ্যান চালক। এইসব পিছিয়ে পড়া মানুষদের থেকে কোনও সান্মানিক নেন না সাত্তারউদ্দিনবাবু।

তিনি আমাদের বলেন, “লোকসঙ্গীতের সঙ্গে মাটির মিশে থাকা মানুষের একটা আলাদা সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তারা গান শিখতে এসে পয়সা না দিতে পারলে তা নিই না।” এই মুহূর্তে তাঁর কাছে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মিন্টু রায় থেকে শুরু করে ডাকবিভাগের অবসরপ্রাপ্ত পোস্টমাস্টার নারায়ণ সরকারও গান শেখেন। নারায়ণবাবুর বয়স প্রায় ৯৫ বছর। কিন্তু এই বয়সেও লোকসঙ্গীত তাঁকে উজ্জীবিত করে রাখে। এদিকে মিন্টুর বাবা-মায়ের কোনও খবর নেই। সে তার দিদিমার কাছে থেকে বড়ো হচ্ছে। মিন্টুর বাড়ি শিলিগুড়ি লাগোয়া রাজগঞ্জ ব্লকের কামাতপাড়ায়। ছেলেটির দিদিমা বাড়ি বাড়ি মুড়ি বিক্রি করেও নাতিকে গান শেখাতে পাঠান। সাত্তারউদ্দিনও মিন্টুর উৎসাহ দেখে তাকে উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া থেকে বাঁকুড়ার ঝুমুর শিখিয়ে চলেছেন। বিনিময়ে কোনও সাম্মানিক নেন না।

সাত্তারউদ্দিন বলেন, “ক্ল্যাসিকালের আগে লোকসঙ্গীতের জন্ম। লোকসঙ্গীত মানুষের মনের কথা, প্রাণের কথা বলে। এখন তো বহু মানুষের মনের অবসাদও ঘুচিয়ে দিচ্ছে এই লোকসঙ্গীত।” যে ক’দিন বাঁচবেন এই সঙ্গীতের সুর ও কথাই দিকে দিকে প্রচার করে যেতে চান তিনি। তবে তাঁর কথায়, খেটে খাওয়া মানুষের এইসব গান আজকাল আধুনিকতার ছোঁয়ায় একটু কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। যারা ক্ল্যাসিকাল গান, তাঁদের গলায় যেন প্রকৃত লোকসঙ্গীতের সুর খানিকটা অন্য মাত্রায় চলে যাচ্ছে। তাছাড়া কিছু বাংলা ব্যান্ড যেভাবে লোকসঙ্গীত বিকৃত করে, তাতেও তিনি দুঃখ পান। তিনি বলেন, “মাটির মানুষদের দিয়ে বেশি বেশি করে লোকসঙ্গীত গাইতে দেওয়া হোক।”
সাত্তারউদ্দিন যে শুধু লোকসঙ্গীত গান তা নয়, সঙ্গীত রচনাও করেন। নিজের লেখা ১৩০টি লোকসঙ্গীত রয়েছে। বাল্য বিবাহ, ভ্রুণ হত্যার বিরুদ্ধেও বারবার সোচ্চার হয়েছেন। উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীতে অনেক কীর্তন আছে। পদাবলীর সুরে কীর্তন গেয়ে অনেক জায়গায় আসর জমিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে এই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকি অসমে গিয়েও তিনি অনেক সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠান করেছেন। বাড়িতেই স্রেফ লোকসঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুলেছেন ‘মেঠো সুর সঙ্গীতালয়’। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেই কেন্দ্রে সঙ্গীত শিখিয়ে চলেছেন।
